ক্রিয়ার কাল কাকে বলে, কত প্রকার ও কী কী?

ক্রিয়া সংঘটিত হওয়ার সময়কে ক্রিয়ার কাল বলে। ক্রিয়া বা কাজ কোনো না কোনো একটা সময়েই সংঘটিত হয়, সেই সময়টাই মূলত ক্রিয়ার কাল। ক্রিয়ার কাল ৩ প্রকার—বর্তমান, অতীত, ভবিষ্যৎ।

বর্তমান কাল

যে ক্রিয়া এখন সম্পন্ন হচ্ছে তাকে বর্তমান কাল বলে। মূলত চলমান কালই বর্তমান কাল। বর্তমান কাল আবার ৩  প্রকার :
সাধারণ বর্তমান : যে ক্রিয়ার কাজটি সাধারণভাবে বর্তমানে ঘটে তাকে সাধারণ বর্তমান কাল বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. সূর্য পূর্ব দিকে ওঠে।
২. আমি প্রতিদিন মাঠে খেলতে যাই।
৩. পৃথিবী সূর্যের চারিদিকে ঘোরে।

ঘটমান বর্তমান : যে ক্রিয়ার কাজ শুরু হয়ে এখনও চলছে অর্থাৎ শেষ হয়নি তাকে ঘটমান বর্তমান কাল বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. আমি এখন বই পড়ছি।
২. শিশুটি কাঁদছে।
৩. মা নামাজ পড়ছে।

পুরাঘটিত বর্তমান : যে ক্রিয়া কাজ কিছুক্ষণ আগে শেষ হয়েছে কিন্তু তার ফল এখনও বিদ্যমান তাকে পুরাঘটিত বর্তমান কাল বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. আমি লেখা শেষ করেছি।
২. রাতুল ইশকুল থেকে বাড়ি ফিরেছে।
৩. পড়া না পারায় শিক্ষক মোহনকে পিটিয়েছেন।

অতীত কাল

যে ক্রিয়া আগেই সম্পন্ন হয়েছে তাকে অতীত কাল বলে। অতীত কাল আবার ৪ প্রকার :
সাধারণ অতীত : যে ক্রিয়া অতীত কালে সাধারণভাবে সংঘটিত হয়েছে তাকে সাধারণ অতীত কাল বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. আমি খেলা শেষ করে বাড়ি ফিরলাম।
২. তিনি আমাকে দেখে অনেক খুশি হলেন।
৩. তিনি আমাকে না বলেই চলে গেলেন।

পুরাঘটিত অতীত : যে ক্রিয়া অনেক আগেই শেষ হয়ে গিয়েছে তাকে পুরাঘটিত অতীত কাল বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. আমি তাকে আমার বাসায় ডেকেছিলাম।
২. আমি তার বিয়েতে গিয়েছিলাম।
৩. তুমি কি তার খোঁজ নিয়েছিলে?

ঘটমান অতীত : যে ক্রিয়া অতীতে শুরু হয়ে অতীতেই চলছিল তাকে ঘটমান অতীত কাল বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. আমি তার জন্যে অপেক্ষা করছিলাম।
২. রিয়াদ তখন খেলা দেখছিল।
৩. আমি তোমার কথা ভাবছিলাম।

নিত্যবৃত্ত অতীত : যে ক্রিয়া অতীতে প্রায়ই ঘটত এমন বোঝায় তাকে নিত্যবৃত্ত অতীত কাল বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. আমি রোজ বিকেলে মাঠে খেলতে যেতাম।
২. বিন্দু প্রতি মাসেই আমাদের বাড়িতে আসত।
৩. বড়দা প্রতিদিন বিলে মাছ ধরতে যেতেন।

ভবিষ্যৎ কাল

যে ক্রিয়া ভবিষ্যতে সম্পন্ন হবে, অর্থাৎ যা এখনও সম্পন্ন হয়নি তাকে ভবিষ্যৎ কাল বলে। ভবিষ্যৎ কাল আবার ৩ প্রকার :
সাধারণ ভবিষ্যৎ : যে ক্রিয়া ভবিষ্যতে সাধারণভাবে সংঘটিত হবে তাকে সাধারণ ভবিষ্যৎ কাল বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. আমি তোমাকে ডাকব।
২. রিহান বাজারে যাবে।
৩. আমি বেহুলা হব বারবার।

ঘটমান ভবিষ্যৎ : যে ক্রিয়ার কাজ ভবিষ্যতে শুরু হয়ে চলতে থাকবে তাকে ঘটমান ভবিষ্যৎ কাল বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. আমি তার সঙ্গে কথা বলতে থাকব।
২. পীযুষ তখন ব্যায়াম করতে থাকবে।
৩. সে তখন খেলতে থাকবে।

পুরাঘটিত ভবিষ্যৎ : যে ক্রিয়ার কাজ ভবিষ্যতে শুরু হয়ে শেষ হবে তাকে পুরাঘটিত ভবিষ্যৎ কাল বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. মনে হয় সে ব্যাপারটা বুঝে থাকবে।
২. সে হয়তো তোমাকে সাহায্য করে থাকবে।
৩. মনীষা অঙ্কটা বুঝে থাকবে।

হ্রস্ব ই/অন্তঃস্থ য়-এর ব্যবহার

আমরা অনেকেই হ্রস্ব ই ও অন্তঃস্থ য়-এর ব্যবহার নিয়ে দ্বিধায় পড়ে যাই। মূলত উচ্চারণের ভুল থেকে ভুল বানানের সৃষ্টি হয়। লেখাটি তাদের জন্য।

উত্তম পুরুষের ক্ষেত্রে সবসময় ক্রিয়ায় হ্রস্ব ই ব্যবহৃত হয়।
আমি, আমরা উত্তম পুরুষের অন্তর্ভুক্ত।
দৃষ্টান্ত :
১. এখন আমি যাই।
২. আমরা সন্ন্যাসীরা আমিষ খাই না।

নাম পুরুষের ক্ষেত্রে সবসময় ক্রিয়ায় অন্তঃস্থ য় ব্যবহৃত হয়।
আমি, আমরা, তুমি, তোমরা বাদে বাকি সব হচ্ছে নাম পুরুষের অন্তর্ভুক্ত।
দৃষ্টান্ত :
১. স্নিগ্ধা বিদ্যালয়ে যায়।
২. সে ধীর পায়ে যায়।

তবে শরীরের কোনো অঙ্গ (বাহ্যিক অথবা মানবীয়) দ্বারা কোনো কাজ সম্পাদিত হলে ক্রিয়ায় অন্তঃস্থ য় বসে।
দৃষ্টান্ত :
১. আমার জিহ্বা স্বাদ পায় না।
২. একসময় ঢুলতে ঢুলতে আমাদের দেহ যেন শয্যায় যেতে চায়।
৩. তার মন আর ঘরে রয় না

কিন্তু উত্তম পুরুষের কোনো অঙ্গের (বাহ্যিক বা মানবীয়) সাথে ‘য়ে’, এ-কার (ে) যোগ হলে ক্রিয়ায় হ্রস্ব ই বসবে।
দৃষ্টান্ত :
১. আমি আর আগের মতো চোখে দেখতে পাই না।
২. আমার পায়ে আর আগের মতো বল পাই না।
৩. আমি মনে মনে এটাই চাই।

তবে কিছু ক্ষেত্রে ‘য়ে’, ‘এ-কার’ যোগ হলেও ক্রিয়ায় অন্তঃস্থ য় বসতে পারে।
দৃষ্টান্ত :
১. আমার আর তাকে মনে চায় না।

সুুপ্রিয় পাঠক,কখন কোথায় হ্রস্ব ই ও অন্তঃস্থ য় ব্যবহার করতে হবে সেটা নিয়ে আর সমস্যা নেই আশা করি।

উঠা/ওঠা, উঠে/ওঠে

উঠা/ওঠা, উঠে/ওঠে ইত্যাদি শব্দগুলো আমরা প্রায়ই ব্যবহৃত হতে দেখি কিন্তু এগুলোর যথাযথ ব্যবহার ও পার্থক্য সম্পর্কে জানি না।
চলুন উপরিউক্ত শব্দগুলোর পার্থক্য ও ব্যবহার জেনে নিই।

উঠা—উঠা হচ্ছে সাধু শব্দ। সাধু বাক্যে উঠা ব্যবহৃত হবে।
দৃষ্টান্ত :
১. তাহার পক্ষে সূর্যোদয়ের পূর্বে  নিদ্রা হইতে উঠা সম্ভব নহে।
২. আমার দ্বারা আর উন্নতির স্বর্ণ শিখরে আরোহণ করা হইল না।

ওঠা—ওঠা হচ্ছে চলিত শব্দ। চলিত বাক্যে ওঠা ব্যবহৃত হবে।
দৃষ্টান্ত :
১. তোমার আর জাতে ওঠার দরকার নেই।
২. হিমালয়ের চূড়ায় ওঠা বেশ কষ্টকর হবে

উঠে—উঠে হচ্ছে অসমাপিকা ক্রিয়া। যার অর্থ—ওঠার পর।
দৃষ্টান্ত :
১. ঘুম থেকে উঠে আমি দৌড়াতে যাই।
২. গাছে উঠে তার ভয়ভয় করতে লাগল।

উঠে হচ্ছে চলিত অসমাপিকা ক্রিয়া।

ওঠে—ওঠে হচ্ছে সমাপিকা ক্রিয়া অর্থাৎ যে ক্রিয়া পূর্ণ অর্থ প্রকাশ করে, বাক্যে আকাঙ্ক্ষার অভাব থাকে না।
দৃষ্টান্ত :
১. সূর্য পূর্ব দিকে ওঠে
২. সে কখন ঘুম থেকে ওঠে তা আমি জানি না
ওঠে চলিত সমাপিকা ক্রিয়া।  

না/নি-এর ব্যবহার

লিখতে গিয়ে আমাদেরকে প্রায়ই নি, না শব্দ দুটি ব্যবহার করতে হয়। এগুলো একই অর্থ প্রকাশ করলেও প্রয়োগে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। চলুন এগুলোর প্রয়োগ জেনে নিই।

‘নি’ সবসময় শব্দের সাথে বসে।
দৃষ্টান্ত :
১. আমি সেখানে যাইনি।
২. রাতুল আমাকে কিছু বলেনি।

‘না’ শব্দের শেষে বসলে আলাদাভাবে বসে।
দৃষ্টান্ত :
১. সুদীপ্ত আজ বিদ্যালয়ে যাবে না।
২. আমি আজ অফিসে যাব না।

‘না’ শব্দের শুরুতে উপসর্গ হিসেবে বসলে একসাথে বসে।
দৃষ্টান্ত :
১. অমন নাহক কথা বলবে না।
২. নাবালকের কথায় কান দিও না।

সমাসবদ্ধ পদে ‘না’ থাকলে তা হাইফেনযোগে লেখা যায়।
দৃষ্টান্ত :
১. না-বলা কথা।
২. না-গোনা পাখি।

বিদেশি শব্দের বানান

বিদেশি শব্দে মূর্ধন্য ণ, মূর্ধন্য ষ, দীর্ঘ ঈ, দীর্ঘ ঈ-কার, দীর্ঘ ঊ, দীর্ঘ ঊ-কার, ঋ, ঋ-কার, ব-ফলা ব্যবহৃত হবে না।
দৃষ্টান্ত :
আরবি, ইংরেজি, দোকানি, কাহিনি, ফারসি, ফরাসি, ব্রিটিশ, স্টেশন, রেজিস্ট্রেশন, স্টোর, ইমান, ইগল,
ফার্নিচার, হর্ন, কর্নার, ইন্টার্ন, ইস্টার্ন, মাস্টার, হজ, জিন, শিকারি, শাদি,দুরবিন, গরিব, মিস্ত্রি, জিনিস, আলহাজ, জি, পোস্ট, আইনি, বেআইনি, ফরিয়াদি, আসামি, আমদানি।

বিদেশি শব্দে ক্ষেত্র অনুযায়ী অ্যা বা ্যা ব্যবহার করতে হবে। যেমন—অ্যাকাউন্ট, অ্যান্টিবায়োটিক, অ্যান্ড, অ্যাডমিন, ম্যানেজার, অ্যাসিড, ক্যাশ, ব্যাংক, ট্যাংক, অ্যাসোসিয়েশন, অ্যালামনাই, ফ্ল্যাট, ফ্ল্যাশ।

ইংরেজি শব্দকে বাংলায় লিখতে হলে যথাসম্ভব উচ্চারণ অনুযায়ী লিখতে হবে।

সুখ ও শান্তি : মিল ও অমিলের তুলনামূলক পর্যালোচনা

সুখশান্তি : এই দুটি অনেকটা কাছাকাছি হলেও একটিকে অন্যটির জায়গায় বসানো চলে না। সুখ ও শান্তির মধ্যে কিছু সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে।
যদিও সুখ ও শান্তি একে অপরের সঙ্গে জড়িত  তবুও উভয়ই বাহ্যিক ঘটনা থেকে স্বতন্ত্র।

সুখ

সুখ শব্দটি কয়েকটি বিষয়কে কেন্দ্র করে যেমন— জীবনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব থাকা, ভালোলাগা ও খারাপ না লাগা। সুখের কোনো নির্দিষ্ট অর্থ নেই, কারণ এটি জীবনের মানের সঙ্গে সম্পর্কিত।

অনেক মানুষ সুখকে একটি অস্থায়ী সন্তুষ্টি হিসেবে বিবেচনা করে। সুখ দীর্ঘ সময় ধরে ক্রোধ ও উত্তেজনা হিসেবে স্থান ধরে রাখতে পারে না এবং এ কারণেই এটি অস্থায়ী হিসেবে বিবেচিত হয়। আপনার জীবনে যখন আকর্ষণীয় কিছু ঘটে তখনই আপনি সুখ অনুভব করতে পারেন।

সুখ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর নির্ভর করে যেমন—অর্জন, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, পুরস্কার প্রভৃতি। একইভাবে, বেশ কয়েকটি বাহ্যিক ঘটনা দ্বারা সুখকে নষ্ট করা যেতে পারে। পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষদের কাছে সর্বোত্তম জিনিস নেই, তবে তারা যা কিছু আছে তার সেরা ব্যবহার করেন।

এটি (সুখ) চূড়ান্ত গন্তব্য নয়, কারণ জীবনের বেশিরভাগ ঘটনা স্বল্প সময়ের জন্য আমাদেরকে আনন্দিত করে। যেমন— পদোন্নতি হওয়া, বিয়ে করা, বিশাল আয় করা প্রভৃতি জিনিসগুলো স্বল্পমেয়াদি সুখ দেয় যা সময়ের সাথে ম্লান হয়ে যেতে পারে। আপনার যখন সমস্ত চাহিদা সন্তুষ্ট হয়, আপনি তখন নিখুঁত সুখ পাবেন।

সুখ আপনাকে অভ্যন্তরীণ প্রশান্তি নাও দিতে পারে। আপনি যদি অভ্যন্তরীণ শান্তি খুঁজে পান তবে আপনার সুখ স্থায়ী হতে পারে।

শান্তি

শান্তি হলো আপনার ভেতরে থাকা নিস্তব্ধতা যা সমস্ত আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করে অর্জন করা যায়। জীবনে আপনার ইচ্ছে ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণ করে আপনি সুখী হতে পারেন। তবে আপনি জীবনের সমস্ত আকাঙ্ক্ষা ছেড়ে জীবনে শান্তি অর্জন করতে পারেন।

একটি ভুল ধারণা রয়েছে যে, শান্তি জীবনকে নিস্তেজ করে তোলে। সত্যটি হলো—শান্তি নিস্তেজতার অবস্থা নয়, শান্ত হওয়া। এটি আপনাকে আরও সুখী, সচেতন ও জীবিত করে তোলে। অন্তর্নিহিত শান্তি আবিষ্কার করা লোকেরা তাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করতে পারে।

অভ্যন্তরীণ প্রশান্তিযুক্ত লোকেরা প্রতিটি পরিস্থিতিকে উড়িয়ে দেয় না—আবার বিশ্লেষণও করে না। শান্তি নষ্ট করে এমন অনেক কিছুই রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ—অতীতের ঘটনাগুলো সম্পর্কে চিন্তাভাবনা, লোকেরা কে কী বলেছিল বা কী করেছে ইত্যাদি অর্থহীন চিন্তাভাবনা হওয়ায় এগুলো সময় ও শক্তি অপচয় করে।

মানুষের মন অনেক কিছু ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ঘরের মতো। আপনি যদি ঘরটি পছন্দ না করেন, আপনি যা করতে পারেন তা হলো আপনার ইচ্ছেমতো জিনিসগুলো সাজানো। একইভাবে, যদি আপনার মন চিন্তা, উদ্‌বেগ, ভয় ও অন্তহীন চিন্তাভাবনায় আবদ্ধ হয়। উত্তেজনা ও মানসিক চাপের এই অবস্থাটি জীবনকে নেতিবাচক উপায়ে প্রভাবিত করতে পারে।

সুখ ও শান্তির তুলনামূলক মিল-অমিল

সুখ ও শান্তি একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত এবং একে অপরের থেকে পৃথক করা কঠিন। তবে, এমন কিছু পরিস্থিতি রয়েছে যখন আপনি সুখ ও শান্তি আলাদা করে বুঝতে পারবেন। সুখ ও শান্তির অনুভূতি আলাদা। সুখ ও শান্তির মধ্যে প্রধান পার্থক্য হলো—সুখ শর্তাধীন, যদিও শান্তি নিঃশর্ত।

আপনি যখন শান্তি ও সুখের তুলনা করেন, আপনি যা দেখতে পাবেন তা হলো—শান্তি হলো সুখের চেয়ে শক্তিশালী অনুভূতি। সুখ একটি অনুভূতি যা সন্তুষ্টি থেকে পরিতৃপ্তিতে আনন্দিত করতে পারে। শান্তি চূড়ান্ত অনুভূতি যা সংজ্ঞায়িত করা যায় না।

হল নাকি হলো : কোনটি সঠিক বানান এবং কেন?

হল নাকি হলো, কোনটি শুদ্ধ তা নিয়ে অনেকের কাছে যথেষ্ট দ্বিধা আছে। যদিও অনেকেই বহুদিন ধরে হল লিখে আসছি। দুটিকে অনেকটা একইরকম মনে হলেও প্রয়োগে কিছুটা ভিন্নতা আছে।

যদিও একসময় নিম্নোক্ত দুটি অর্থেই হল বানানটি ব্যবহৃত হতো। তবে উচ্চারণ ও অর্থের পার্থক্য থাকায় বাংলা একাডেমি দুটির বানানকে পৃথক করেছে।
আসুন জেনে নিই এদের প্রয়োগ।

হল—হল শব্দটির উচ্চারণ হচ্ছে ‘হল্’।
হল শব্দের অর্থ হচ্ছে—লাঙল, বৈঠক বা সভার জন্য নির্মিত বড়ো ঘর, আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস, সোনার প্রলেপ, সমাধান।
উল্লিখিত অর্থের সমার্থক শব্দ হিসেবে হল শব্দটি ব্যবহৃত হবে।
দৃষ্টান্ত :
১. করোনার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল বন্ধ।
২. হলঘরে সভা আহ্বান করা হয়েছে।
৩. সিনেমা হলে নতুন সিনেমা চলছে।
৪. পরীক্ষার হলে কেউ কাউকে সাহায্য করে না।

হলো—হলো শব্দটির উচ্চারণ হচ্ছে ‘হোলো’।
হলো শব্দের অর্থ—হয়েছে এমন।
হয়েছে এমন অর্থে হলো শব্দটি ব্যবহৃত হবে।
দৃষ্টান্ত :
১. স্বপ্ন আমার সত্যি হলো।
২. অবশেষে কাজটা শেষ হলো।
৩. দেশে কী যে শুরু হলো!
৪. রোহিঙ্গাদের সকল সাহায্য বন্ধ হলো।

সুপ্রিয় পাঠক, হল নাকি হলো লিখবেন সেটা বুঝতে আর সমস্যা নেই আশা করি।

মূর্তি ও ভাস্কর্য : দুটির ব্যাবহারিক পার্থক্য ও মিল

গত কয়েকদিনে আমাদের দেশের সবচেয়ে আলোচিত ও সমালোচিত বিষয় হচ্ছে মূর্তি ও ভাস্কর্য। অনেকের মতে মূর্তি ও ভাস্কর্যের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই; আবার অনেকের মতে মূর্তি ও ভাস্কর্য দুটি আলাদা জিনিস।

আমি ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে মূর্তি ও ভাস্কর্যের পার্থক্য নিরূপণ করছি না বা ধর্মীয় দিক দিয়ে তা বৈধ না অবৈধ তাও যাচাই করছি না। আমি শুধু বাংলায় শব্দ দুটির প্রয়োগ ও অর্থগত পার্থক্য দেখানোর চেষ্টা করছি।

মূর্তি—মূর্তি শব্দের উৎপত্তি সংস্কৃত থেকে। √মূর্ছ্+তি = মূর্তি। মূর্তি শব্দের কতগুলো অর্থ আছে—দেহ, আকৃতি, রূপ, প্রতিমা। এদের মধ্যে বহুল ব্যবহৃত অর্থ হচ্ছে প্রতিমা। মূর্তি হচ্ছে দেব-দেবী বা অন্য পূজ্য কোনোকিছুর প্রাণহীন অবয়ব। অর্থাৎ মূর্তি সাধারণত পুজোর উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়।

স্থায়িত্বের দিক দিয়ে মূর্তি স্থায়ী ও অস্থায়ী উভয়ই হতে পারে। মাটির তৈরি মূর্তিগুলো সাধারণত অস্থায়ী হয়। অধিকাংশ মূর্তিই মাটি দিয়ে তৈরি করা হয়, তবে সোনা, ব্রোঞ্জ, মোম প্রভৃতির তৈরি মূর্তিও দেখা যায়। মূর্তি ধর্মীয় প্রার্থনার কাজে ব্যবহৃত হয়।

ভাস্কর্য—ভাস্কর্য শব্দটির উৎপত্তিও সংস্কৃত থেকে। ভাস্+ √কৃ+য = ভাস্কর্য। ভাস্কর্য হচ্ছে পাথর, কাঠ বা ধাতু প্রভৃতি খোদাই করে নির্মিত শিল্পকর্ম। কোনো বিখ্যাত ব্যক্তি বা বস্তুর অবয়ব জনসমক্ষে প্রদশর্নের জন্যে ভাস্কর্য তৈরি করা হয়।

প্রচুর জনসমাগম হয় এমন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়। ভাস্কর্য দীর্ঘস্থায়ী হয়ে থাকে। সাধারণত ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে সবার সামনে উপস্থাপনই ভাস্কর্যের উদ্দেশ্য। এখানে ধর্মীয় কোনো উদ্দেশ্য থাকে না বললেই চলে।

মূর্তি ও ভাস্কর্য আকৃতিগত দিক দিয়ে অনেকটা কাছাকাছি হলেও তাদের প্রধান পার্থক্য নির্মাণের উদ্দেশ্যে।

শেখা নাকি শিখা : কোনটি শুদ্ধ ও কেন?

শেখা নাকি শিখা, এই দুইয়ের মধ্যে কোনটি সঠিক বানান সেটা নিয়ে অনেকেই দ্বিধায় পড়ে যান। এই সমস্যার মূল কারণ হচ্ছে মুখের ভাষাকে লেখার ভাষা হিসেবে ব্যবহার করা। আমরা সারাক্ষণ যে শব্দগুলো ব্যবহার করি সেগুলো ভুল হলেও ধীরে ধীরে তা আমাদের কাছে মনের অজান্তেই স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।

এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বানানের যাচ্ছেতাই প্রয়োগের কারণে মানুষ এগুলোকে শুদ্ধ ও স্বাভাবিক বলে মনে করছে এবং নির্বিচারে তার প্রয়োগ করছে। ফলে দিনদিন এগুলোতে অভ্যস্ত হয়ে ভুল প্রয়োগ করছে।

এই যে, গেছি, বলসি, খাইসি প্রভৃতি বানানগুলোর কথা-ই ধরুন না। অনেকে রীতিমতো এগুলোকে একরকম প্রচলিত বানান বানিয়ে ফেলেছে। এই শব্দ দুটির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। চলুন শেখা নাকি শিখা—এদের মধ্যে কোনটি শুদ্ধ বা অশুদ্ধ তা জেনে নেওয়া যাক।

শেখা—শেখা হচ্ছে বিশেষ্য হিসেবে চলিত শব্দ। চলিত বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহারের প্রয়োজন হলে ‘শেখা’ শব্দটি ব্যবহার করতে হবে।
দৃষ্টান্ত :
১. আমার পক্ষে গিটার বাজানো শেখা সম্ভব না।
২. নীলাকে চমকে দিতেই রাফসানের বেহালা বাজানো শেখা।
৩. এতটুকু কাজ আমার তিনদিনেই শেখা হয়ে যাবে।
৪. তোমার পক্ষে মান্দারিন ভাষা শেখা কষ্টকর হবে।

তবে ক্রিয়াপদে রূপ পরিবর্তিত হয়ে শ-য়ে হ্রস্ব ই-কার ব্যবহৃত হতে পারে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে অপরিবর্তিত থাকে।
দৃষ্টান্ত :
১. প্রতিদিন দশটি করে শব্দ শেখা সহজ কাজ।
২. আমি প্রতিনিয়তই শিখছি।
৩. রাতুল কম্পিউটার চালানো শিখেছে।
৪. রাফসান গিটার বাজানো শেখে।
৫. আমি এখন তুহিনের কাছে ইংরেজি শিখি।
৬. নতুন কিছু শিখতে হলে ধৈর্যহারা হলে চলবে না।

শিখা—শিখা হচ্ছে বিশেষ্য হিসেবে সাধু শব্দ। সাধু বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে শেখা’র পরিবর্তে ‘শিখা’ বসে।
দৃষ্টান্ত :
১. শিখার অন্ত নাই।
২. তোমার গান শিখা হইবে না।

ক্রিয়াপদে রূপান্তরের সময় শ-য়ে হ্রস্ব ই-কার বজায় থাকে।
দৃষ্টান্ত :
১. তুমি অস্ত্রবিদ্যা শিখিবে ইহা তো মন্দ কথা নহে।
২. আমার পুত্রকে গণিত শিখানোর ভার তোমার উপরেই অর্পণ করিলাম।
৩. তুমিই তাহাকে সংস্কৃত শিখাইবে।

সুপ্রিয় পাঠক, শেখা নাকি শিখা, কোনটি কোথায় ব্যবহার করতে হবে সেটা বুঝতে পেরেছেন আশা করি

হত নাকি হতো : কোনটি সঠিক বানান?

হত নাকি হতো, এই দুটির মধ্যে কোনটি সঠিক বানান সেটা নিয়ে অনেকেই ঝামেলায় পড়ে যান।
অবশ্য একসময় এই দুটির পরিবর্তে একটি বানানই প্রচলিত ছিল। তবে উচ্চারণত পার্থক্য থাকার কারণে বাংলা একাডেমি দুটির বানানকে পৃথক করেছে। চলুন জেনে নিই কোনটি কোথায় লিখতে হবে।

হত—হত শব্দের উচ্চারণ ‘হতো’।
হত শব্দের অর্থ হচ্ছে নিহত, লুপ্ত, বাধাপ্রাপ্ত, অশুভ, মন্দ।
নিহত, লুপ্ত, বাধাপ্রাপ্ত, অশুভ, মন্দ অর্থে হত শব্দটি ব্যবহৃত হবে।
দৃষ্টান্ত :
১. সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহত (হত+আহত) ১০০ জন।
২. পরিবারের হতগৌরব ফিরিয়ে আনার জন্য তোমার সংগ্রাম করা উচিত।
৩. তার মতো হতভাগা কেউ নেই।
৪. তার কথা শুনে আমি হতবুদ্ধি হয়ে গেলাম।
৫. এরকম হতোদ্যম (হত+উদ্যম) হলে উন্নতি করা সম্ভব নয়।

হতো—হতো শব্দের উচ্চারণ ‘হোতো’।
হতো হচ্ছে হওয়ার অতীত নির্দেশক।
হওয়ার অতীত নির্দেশক হিসেবে হতো শব্দটি ব্যবহৃত হবে।
দৃষ্টান্ত :
১. যদি তুমি সেদিন আসতে তাহলে খুব মজা হতো।
২. প্রাচীনকালে এদেশে অনেক ধান হতো।
৩. আগে তার সঙ্গে আমার প্রায়ই কথা হতো।
৪. তুমি সাহায্য না করলে এত বড়ো কাজ আমার দ্বারা সম্ভব হতো না।
৫. সময়তো পরিশ্রম করলে সে এতদিনে কোটিপতি হতো।

সুপ্রিয় পাঠক, হত নাকি হতো, কোনটি কোথায় লিখবেন সেটা বুঝতে পেরেছেন আশা করি।

খোঁজা নাকি খুঁজা : কোনটি সঠিক ও কেন?

খোঁজা নাকি খুঁজা, এই দুইয়ের মধ্যে কোনটি সঠিক বানান সেটা নিয়ে অনেকেই দ্বিধায় পড়ে যান। এই সমস্যার মূল কারণ হচ্ছে মুখের ভাষাকে লেখার ভাষা হিসেবে ব্যবহার করা। আমরা সারাক্ষণ যে শব্দগুলো ব্যবহার করি সেগুলো ভুল হলেও ধীরে ধীরে তা আমাদের কাছে মনের অজান্তেই স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।

এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বানানের যাচ্ছেতাই প্রয়োগের কারণে মানুষ এগুলোকে শুদ্ধ ও স্বাভাবিক বলে মনে করছে এবং নির্বিচারে তার প্রয়োগ করছে। ফলে দিনদিন এগুলোতে অভ্যস্ত হয়ে ভুল প্রয়োগ করছে।

এই যে, গেছি, বলসি, খাইসি প্রভৃতি বানানগুলোর কথা-ই ধরুন না। অনেকে রীতিমতো এগুলোকে একরকম প্রচলিত বানান বানিয়ে ফেলেছে। এই শব্দ দুটির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। চলুন খোঁজা নাকি খুঁজা, এদের মধ্যে কোনটি শুদ্ধ বা অশুদ্ধ তা জেনে নেওয়া যাক।

খোঁজা—খোঁজা হচ্ছে বিশেষ্য হিসেবে চলিত শব্দ। চলিত বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহারের প্রয়োজন হলে ‘খোঁজা’ শব্দটি ব্যবহার করতে হবে।
দৃষ্টান্ত :
১. খোঁজাখুঁজি করলে পেয়ে যাবে।
২. গোরুখোঁজা কি এতই সহজ কাজ!
৩. ডুমুরের ফুল খোঁজা হাস্যকর কাজ।

তবে ক্রিয়াপদে রূপ পরিবর্তিত হয়ে খ-য়ে হ্রস্ব উ-কার ব্যবহৃত হতে পারে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে অপরিবর্তিত থাকে।
দৃষ্টান্ত :
১. হারিয়ে গেলেও কেউ তাকে খোঁজেনি।
২. আমি আর তাকে খুঁজতে যাচ্ছি না।
৩. জিনিসটা খুঁজে পেলে আমাকে দিয়ে যেয়ো।
৪. আমি আজও তাকে খুঁজি।

খুঁজা—খুঁজা হচ্ছে বিশেষ্য হিসেবে সাধু শব্দ। সাধু বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে খোঁঁজা’র পরিবর্তে ‘খুঁজা’ বসে।
দৃষ্টান্ত :
১. মানুষ খুঁজা সহজ কার্য নহে।
২. খুঁজাখুঁজি করিয়া তাহাকে বাহির করা হইল।

ক্রিয়াপদে রূপান্তরের সময় খ-য়ে হ্রস্ব উ-কার বজায় থাকে।
দৃষ্টান্ত :
১. তাহাকে খুঁজিয়া খুঁজিয়া মরিতেছি।।
২. রমেন তাহাকে খুঁজিতেছে।
৩. রাফিনকে তিনদিন ধরিয়া খুঁজিতেছি।

সুপ্রিয় পাঠক, খোঁজা নাকি খুঁজা, কোনটি কোথায় ব্যবহার করতে হবে সেটা বুঝতে পেরেছেন আশা করি।

বাধা নাকি বাঁধা : কোনটি সঠিক বানান ও কেন?

বাধা নাকি বাঁধা, এই দুইয়ের মধ্যে কোনটি সঠিক বানান সেটা নিয়ে আমরা অনেকেই দ্বিধায় পড়ে যাই। চলুন আজীবন মনে রাখার মতো একটি সহজ উপায় জেনে নিই।

বাধা—বাধা শব্দের অর্থ হচ্ছে প্রতিবন্ধকতা, অন্তরায়, বিঘ্ন, নিষেধ, উপদ্রব, সংগঠিত হওয়া, সায় না পাওয়া, কষ্ট বোধ হওয়া, আটক হওয়া, বুঝতে অসুবিধা হওয়া, জড়িয়ে যাওয়া, খণ্ডন করা। √বাধ্+অ+আ = বাধা।
উপরিউক্ত অর্থে বাধা শব্দটি ব্যবহৃত হবে।
দৃষ্টান্ত :
১. ভালো কাজের পদে পদে বাধা থাকে।
২. অশিক্ষা দেশের উন্নতির পথে বড়ো বাধা।
৩. সে আমার কোনো বাধা মানেনি।
৪. বিবেকের বাধা পেয়ে আমি ফের তার কাছে যাইনি।
৪. আমার গলায় মাছের কাঁটা বেধেছে।
৫. বয়সের ভারে তার কথা বেধে যাচ্ছে।
৬. তার বাধা বাধা কথা আমার বুঝতে কষ্ট হয়।
৭. সে এক মহা ঝামেলা বাধিয়েছে।

বাঁধা—বাঁধা শব্দের অর্থ হচ্ছে আবদ্ধ করা, তৈরি করা, রচনা করা, একত্র করা, সংহত হওয়া, সাহস সঞ্চয় করা, পাকা করা হয়েছে এমন, ঋণের জামিনরূপে গচ্ছিত সম্পত্তি। বাঁধা শব্দের উৎপত্তি সংস্কৃত বন্ধক থেকে।
শুধু উপরিউক্ত অর্থে বাঁধা শব্দটি ব্যবহৃত হবে।
দৃষ্টান্ত :
১. নদীর তীরে নৌকা বাঁধা।
২. ঘর বাঁধা একদিনের কাজ নয়।
৩. গুরুপদ গুপ্ত একখানা গান বেঁধেছেন।
৪. খুচরা ব্যাবসাদাররা জোটবেঁধে দাম বাড়াচ্ছে।
৫. আশায় বুক বেঁধে মানুষ বেঁচে থাকে।
৬. গ্রামের বাঁধানো ঘাটে সবাই গোসল করতে আসে।
৭. ঋণ পরিশোধ না করলে বাঁধা বিক্রি করে টাকা উসুল করো।

মনে রাখার কৌশল : বাঁধা (বন্ধন অর্থে) বানানে চন্দ্রবিন্দু আছে। মনে রাখবেন যে, বাঁধতে দড়ি লাগে, আর চন্দ্রবিন্দুটা সেই দড়ি। এটা মনে রাখলে অন্যটা আপনিতেই মনে থাকবে।

বাধা নাকি বাঁধা, কোনটি কোথায় লিখবেন সেটা বুঝতে পেরেছেন আশা করি।

সমাসবদ্ধ শব্দ লেখার নিয়ম : কখন একসঙ্গে কখন ফাঁকা?

সমাসবদ্ধ শব্দ লেখার সময় আমরা প্রায়ই দ্বিধান্বিত হয়ে যাই যে শব্দের মাঝে ফাঁকা হবে কি না। চলুন জেনে নেওয়া যাক সমাসবদ্ধ শব্দ লেখার যথাযথ নিয়ম।

সমাসবদ্ধ শব্দ যথাসম্ভব একসাথে লিখতে হবে।
দৃষ্টান্ত :
১. উগান্ডার স্বাস্থ্যমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন।
২. ডাক্তার জাফরুল্লাহ চৌধুরী এখন করোনামুক্ত
৩. ভাষাসৈনিকদের প্রতি সকলে বিনম্র শ্রদ্ধা জানায়।
৪. ভ্রমরকালো চোখ তার।
৫. তোমার চাঁদমুখ দেখে দিশা হারাই।
৬. তাঁর কাছেই আমার বাংলা শেখার হাতেখড়ি
৭. তাঁর মতো মহাপুরুষ দ্বিতীয়টি নেই।
৮. সে আজ অনেকদিন ধরে বাড়িছাড়া
৯. ওই আয়তলোচনে হারাতে চাই।
১০. মনমাঝি তোর বইঠা নে রে, আমি আর বাইতে পারলাম না।

তবে প্রয়োজনে সমাসবদ্ধ শব্দকে হাইফেনযোগে লেখা যায়।
দৃষ্টান্ত :
১. আমার মা-বাবা আমাকে অনেক স্নেহ করেন।
২. তাদের মধ্যে দা-কুমড়া সম্পর্ক।
৩. এমন ভুল কম-বেশি সবাই করে।
৪. সে করোনা-আক্রান্ত
৫. আমাদের বানান-বাতায়ন কি আপনার ভালো লাগে?

সমাসবদ্ধ শব্দে বিশেষণ পদ থাকলে সাধারণত আলাদা লিখতে হয়।
দৃষ্টান্ত :
১. লাল গোলাপ সবাই পছন্দ করে।
২. শুভ সকাল
৩. নীল আকাশ আমার অনেক প্রিয়।
৪. তার মতো ভালো মানুষ খুব কম দেখা যায়।
৫. আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে আমরা শহিদ মিনারে ফুল দিতে যাই।

তবে কিছু ক্ষেত্রে সমাসবদ্ধ শব্দে বিশেষণ পদ থাকলেও তা একসাথে বসতে পারে। যেমন—তোমার জন্য শুভকামনা রইল। মূলত অর্থবিভ্রান্তির আশঙ্কা থাকলে বা উচ্চারণ শ্রুতিকটু হলে বিশেষণ পদ থাকলেও তা একসাথে বসতে পারে।

ফোঁটা নাকি ফোটা : কোনটি সঠিক ও কেন ?

ফোঁটা নাকি ফোটা, কোনটি সঠিক বানান সেটা নিয়ে অনেকেই সংশয়ে পড়ে যান।
উপরিউক্ত শব্দ দুটির উচ্চারণ একই হলেও অর্থের ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। চলুন জেনে নেওয়া যাক এদের পার্থক্য।

ফোঁটা—ফোঁটা শব্দের অর্থ হচ্ছে তরল পদার্থের বিন্দু,  বিন্দুচিহ্ন, তাসের চিহ্ন।
উপরিউক্ত অর্থে ফোঁটা শব্দটি ব্যবহৃত হবে।
দৃষ্টান্ত :
১. ”ডাক্তার সাহেব, তুমি আমার জন্য দুফোঁটা চোখের জল ফেলেছ—তার প্রতিদানে আমি জনম জনম কাঁদিব।”
২. ভাইফোঁটা দিবসে বোন ভাইয়ের কপালে ফোঁটা দেয়।
৩. ঘরের চালা দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি পড়তে লাগল।
৪. লোকটি তাস হাতে নিয়ে ফোঁটা গুনতে শুরু করল।

ফোটা—ফোটা শব্দের অর্থ হচ্ছে পরিস্ফুটিত হওয়া, উদিত হওয়া, সেদ্ধ হওয়া, উন্মীলিত হওয়া, ধ্বনিত হওয়া, বিদ্ধ হওয়া, বিস্ফোরিত হওয়া।
উপরিউক্ত অর্থে ফোটা শব্দটি ব্যবহৃত হবে।
দৃষ্টান্ত :
১. ফুল ফোটার মোহনীয় সৌন্দর্য সবার চোখে পড়ে না।
২. নারীরা মুখ ফুটে অনেক কিছুই বলতে পারে না।
৩. তার মুখে যেন খই ফোটে।
৪. অন্ধকার ভেদ করে আলো ফুটল।
৫. ভাত ফুটেছে কি না তা দেখার জন্য মা কয়েকটি ভাত হাতে নিয়ে দেখলেন।
৬. বাচ্চাটির মুখে কথা ফুটেছে।
৭. আমার পায়ে কাঁটা ফুটেছে।
৮. বাজি ফোটাতে গিয়ে তুহিনের গায়ে আগুনের ফুলকি লেগেছে।

মনে রাখার কৌশল : ফোঁটা মানে বিন্দু তাই ফোঁটা বানানে চন্দ্রবিন্দুর ফোঁটা আছে।

সুপ্রিয় পাঠক, ফোঁটা নাকি ফোটা, কোনটি কোথায় লিখবেন তা নিয়ে আর সমস্যা নেই আশা করি।

অনুদিত নাকি অনূদিত : কোনটি সঠিক ও কেন ?

অনুদিত নাকি অনূদিত, দুটিই সঠিক নাকি একটি সঠিক বা দুটি সঠিক হলে কোনটির অর্থ কী এটা নিয়ে অনেকেই চিন্তায় পড়ে যান। অনূদিত ও অনুদিত শব্দ দুটির উচ্চারণ একই হলেও অর্থের ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে।

অনূদিত—অনূদিত শব্দের অর্থ হচ্ছে অনুবাদ করা হয়েছে এমন, ভাষান্তরিত। অনূ+ √বদ্+ত = অনূদিত। এটি সংস্কৃত শব্দ।
ভাষান্তরিত অর্থে অনূদিত শব্দটি ব্যবহৃত হবে।
দৃষ্টান্ত :
১. গীতাঞ্জলি অনেক ভাষায় অনূদিত হয়েছে।
২. অনূদিত বইয়ের অর্থের সাথে মূল বইয়ের অর্থের পার্থক্য থাকতে পারে।
৩. তার অনূদিত বইয়ের সংখ্যা দশটি।

অনুদিত—অনুদিত শব্দের অর্থ হচ্ছে উদিত হয়নি এমন, অপ্রকাশিত, অব্যক্ত। ন+উদিত = অনুদিত। এটিও সংস্কৃত শব্দ।
উদিত হয়নি এমন, অপ্রকাশিত বা অব্যক্ত অর্থে অনুদিত শব্দটি ব্যবহৃত হবে।
দৃষ্টান্ত :
১. সূর্য এখনও অনুদিত।
২. তার মনের কথা আজও অনুদিত।

সুপ্রিয় পাঠক, অনুদিত না অনূদিত, কোনটি কোথায় ব্যবহৃত হবে সেটা এতক্ষণে বুঝেছেন নিশ্চয়।

বোঝা নাকি বুঝা : কোনটি সঠিক বানান ও কেন?

বোঝা নাকি বুঝা, এই দুইয়ের মধ্যে কোনটি সঠিক বানান সেটা নিয়ে অনেকেই দ্বিধায় পড়ে যান। এই সমস্যার মূল কারণ হচ্ছে মুখের ভাষাকে লেখার ভাষা হিসেবে ব্যবহার করা। আমরা সারাক্ষণ যে শব্দগুলো ব্যবহার করি সেগুলো ভুল হলেও ধীরে ধীরে তা আমাদের কাছে মনের অজান্তেই স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।

এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বানানের যাচ্ছেতাই প্রয়োগের কারণে মানুষ এগুলোকে শুদ্ধ ও স্বাভাবিক বলে মনে করছে এবং নির্বিচারে তার প্রয়োগ করছে। ফলে দিনদিন এগুলোতে অভ্যস্ত হয়ে ভুল প্রয়োগ করছে।

এই যে, গেছি, বলসি, খাইসি প্রভৃতি বানানগুলোর কথা-ই ধরুন না। অনেকে রীতিমতো এগুলোকে একরকম প্রচলিত বানান বানিয়ে ফেলেছে। এই শব্দ দুটির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। চলুন লেখা নাকি লিখা—এদের মধ্যে কোনটি শুদ্ধ বা অশুদ্ধ তা জেনে নেওয়া যাক।

বোঝা—বোঝা হচ্ছে বিশেষ্য হিসেবে চলিত শব্দ। চলিত বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহারের প্রয়োজন হলে ‘বোঝা’ শব্দটি ব্যবহার করতে হবে।
দৃষ্টান্ত :
১. এসব বিষয় বোঝা আমার সাধ্যের বাইরে।
২. মানবীকে বোঝা সহজ কাজ নয়।
৩. তোমার পক্ষে বোঝা সম্ভব না হলে কারো থেকে বুঝে নাও।
৪. রসায়ন বোঝা কি এতই সহজ!
৫. মানুষের বোঝার ক্ষমতা তার জ্ঞানের ওপর নির্ভর করে।

তবে ক্রিয়াপদে রূপ পরিবর্তিত হয়ে ব-য়ে হ্রস্ব উ-কার ব্যবহৃত হতে পারে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে অপরিবর্তিত থাকে।
দৃষ্টান্ত :
১. রাতুল কিছুই বোঝে না।
২. আমি তোমার কথা বুঝতে পারি না। ।
৩. তোমাকে বোঝানো আমার পক্ষে অসম্ভব।
৪. মইনুলকে বিষয়টা বুঝিয়ে দাও।
৫. বুঝেশুনে কাজ কোরো।
৬. তুমি আমার কথা বোঝোনি।
৭. সে কোনোদিন আমাকে বোঝেনি।

বুঝা—বুঝা হচ্ছে বিশেষ্য হিসেবে সাধু শব্দ। সাধু বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে বোঝা’র পরিবর্তে ‘বুঝা’ বসে।
দৃষ্টান্ত :
১. চীনা ভাষা বুঝা সহজ নহে।
২. তোমার না বুঝার হেতু অদ্যাবধি আমার অগোচরে।
৩. হৈমন্তীকে বুঝা সহজ ছিল না তাহা নহে তথাপিও অপু চেষ্টা করেন নাই

ক্রিয়াপদে রূপান্তরের সময় ব-য়ে হ্রস্ব উ-কার বজায় থাকে।
দৃষ্টান্ত :
১. তোমার কথা বুঝিতেছি বটে।
২. কথা না বুঝিয়াই মোহনবাবু নরেনের প্রতি দৃষ্টিপাত করিলেন।
৩. আমার কর্তব্য আমি করিয়াছি, সবকিছু বুঝাইয়া দিয়া চলিয়া আসিয়াছি।
৪. আমার কষ্টকর ব্যাপারখানা তুমি কেন বুঝিতেছ না!

সুপ্রিয় পাঠক, বোঝা নাকি বুঝা, কোনটি কোথায় ব্যবহার করতে হবে সেটা বুঝতে পেরেছেন আশা করি।

দ্রষ্টব্য—বোঝা শব্দের আরেক অর্থ স্তূপ বা বড়ো গাঁটরি।

কারক কাকে বলে, কত প্রকার ও কী কী? | বিভক্তি

কারক ব্যাকরণের একটি অন্যতম অংশ। কারক শব্দের অর্থ—যা ক্রিয়া সম্পাদন করে। কর্তা বা ক্রিয়ার সঙ্গে অনেককিছু মিলেই একটি বাক্যের পূর্ণ অর্থ প্রকাশ করে। এর প্রত্যেকটি অংশই কারক।
কারক ৬ প্রকার—১. কর্তৃকারক  ২. কর্মকারক  ৩. করণ কারক  ৪. সম্প্রদান কারক  ৫. অপাদান কারক  ৬. অধিকরণ কারক।

জামাল সাহেব রোজ সকালে ভান্ডার থেকে নিজ হাতে এতিমদেরকে টাকা দান করেন।
এখানে :
জামাল সাহেব—কর্তৃসম্বন্ধ
টাকা—কর্মসম্বন্ধ
হাত—করণসম্বন্ধ
এতিমদেরকে—সম্প্রদানসম্বন্ধ
ভান্ডার থেকে—অপাদানসম্বন্ধ
রোজ সকালে—অধিকরণসম্বন্ধ

বিভক্তি : বাক্যে অবস্থিত একটি শব্দের সঙ্গে অন্য শব্দের সংযোগ ঘটানোর জন্যে যে শব্দাংশ শব্দের সঙ্গে যুক্ত হয় তাকে বিভক্তি বলে। বিভক্তি ছাড়া বাক্যের যথাযথ অর্থ প্রকাশ করা সম্ভব নয়। ভিখারিকে ভিক্ষে দাও। এখানে ভিখারি শব্দের সঙ্গে কে বিভক্তি যুক্ত হয়েছে। বিভক্তি যুক্ত না হলে অবস্থা দাঁড়াত—ভিখারি ভিক্ষে দাও। তখন এই বাক্যের অর্থ স্পষ্ট হতো না।

বিভক্তিসংকেত
প্রথমাঅ, এ, য়, তে
দ্বিতীয়াকে, রে, এরে
তৃতীয়াদ্বারা, দিয়ে, কর্তৃক
চতুর্থীকে, রে, এরে
পঞ্চমীহতে, থেকে, চেয়ে
ষষ্ঠীর, এর
সপ্তমীএ, য়, তে, এতে
বিভক্তিসমূহ

কর্তৃকারক

বাক্যের অন্তর্গত যে বিশেষ্য বা সর্বনাম পদ ক্রিয়া সম্পাদন করে তাকে কর্তৃকারক বলে। ক্রিয়াকে কে বা কারা দ্বারা প্রশ্ন করলে যে উত্তর পাওয়া যায় তাকে কর্তৃকারক বলে।
১. জিসান বই পড়ে। (কে বই পড়ে?)

কর্তৃকারক ৪ প্রকার :

মুখ্যকর্তা

যে নিজেই ক্রিয়া সম্পাদন করে তাকে মুখ্যকর্তা বলে।
১. পাখিরা আকাশে ওড়ে।
২. মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে।

প্রযোজক কর্তা

মূল কর্তা যখন অন্যকে দিয়ে ক্রিয়া সম্পাদন করায় তখন তাকে (মূল কর্তা) প্রযোজক কর্তা বলে।
মা শিশুকে চাঁদ দেখাচ্ছেন। এখানে মা প্রযোজক কর্তা।

প্রযোজ্য কর্তা

মূল কর্তা যাকে দিয়ে ক্রিয়া সম্পাদন করায় তাকে প্রযোজ্য কর্তা বলে।
১. মা শিশুকে চাঁদ দেখাচ্ছেন।
২. শিক্ষক ছাত্রকে পড়াচ্ছেন।

ব্যতিহার কর্তা

বাক্যের দুটি কর্তা যখন একইসঙ্গে একই কাজ করে তখন তাকে ব্যতিহার কর্তা বলে।
১. রাজায়-রাজায় লড়াই হয়।
২. বাঘে-মহিষে এক ঘাটে জল খায়।

কর্তৃকারকে বিভিন্ন বিভক্তির প্রয়োগ

প্রথমা বিভক্তি : শিহাব বই পড়ে
দ্বিতীয়া বিভক্তি : সুমনকে কাজ করতে হবে।
তৃতীয়া বিভক্তি : রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক গীতাঞ্জলি রচিত হয়েছে।
ষষ্ঠী বিভক্তি : আমার যাওয়া হবে না।
সপ্তমী বিভক্তি : পাগলে কী না বলে।

কর্মকারক

যাকে আশ্রয় করে কর্তা ক্রিয়া সম্পাদন করে তাকে কর্মকারক বলে। ক্রিয়াকে কী বা কাকে দ্বারা প্রশ্ন করলে যে উত্তর পাওয়া যায় সেটাই কর্মকারক।
১. রাজিব বই পড়ছে (কী পড়ছে?)।
২. হাতি কলাগাছ খায় (কী খায়?)।

কর্মকারকে বিভিন্ন বিভক্তির প্রয়োগ

প্রথমা বিভক্তি : ডাক্তার ডাকো।
দ্বিতীয়া বিভক্তি : আমি তাকে সংবাদ দিয়েছি।
ষষ্ঠী বিভক্তি : ছেলেটি বলের সঙ্গে যুদ্ধ করছে।
সপ্তমী বিভক্তি : জিজ্ঞাসিব জনে জনে

করণ কারক

ক্রিয়া সম্পাদনের ক্ষেত্রে যা প্রধান সহায় তাকে করণ কারক বলে। ক্রিয়াকে দ্বারা, দিয়ে, কর্তৃক ইত্যাদি প্রশ্ন করলে যে উত্তর পাওয়া যায় তাকে করণ কারক বলে, অর্থাৎ কর্তা যার দ্বারা ক্রিয়া সম্পাদন করে সে-ই করণ কারক।
১. ছেলেরা বল খেলে (বল দ্বারা খেলে)।
২. আম্ফানে সব লন্ডভন্ড হয়ে গেল (আম্ফানের দ্বারা)।
৩. মায়ের কথা মধুমাখা (মধু দিয়ে মাখা)।

করণ কারকে বিভিন্ন বিভক্তির প্রয়োগ

প্রথমা বিভক্তি : ছেলেরা বল খেলে।
তৃতীয়া বিভক্তি : মন দিয়ে করো সবে বিদ্যা অর্জন।
পঞ্চমী বিভক্তি : এই ব্যাবসা হতে তোমার বেশ লাভ হবে।
ষষ্ঠী বিভক্তি : কুকুরটাকে লাঠির আঘাত কোরো না।
সপ্তমী বিভক্তি : আকাশ মেঘে ঢাকা।

সম্প্রদান কারক

যখন স্বত্ব ত্যাগ করে কাউকে কোনোকিছু দান করা হয় তখন দান গ্রহণকারী ব্যক্তিকেই সম্প্রদান কারক বলে।
১. ভিখারিকে ভিক্ষে দাও।
২. অন্ধজনে দেহ আলো।
৩. ক্ষুধার্তকে খাবার দাও।

সম্প্রদান কারকে বিভিন্ন বিভক্তির প্রয়োগ

প্রথমা বিভক্তি : গুরুদক্ষিণা দাও।
চতুর্থী বিভক্তি : অসহায়কে সাহায্য করো।
ষষ্ঠী বিভক্তি : গরিবদের অন্ন দাও।
সপ্তমী বিভক্তি : দীনে দয়া করো।

তবে সম্পূর্ণ স্বত্ব ত্যাগ করে না দিলে তা সম্প্রদান কারক হবে না। যেমন—ধোপাকে কাপড় দাও। এখানে স্বত্ব ত্যাগ করে দেওয়া হচ্ছে না।

অপাদান কারক

যা কোনোকিছু থেকে বিচ্যুত, পতিত, গৃহীত, জাত, রক্ষিত, বিরত, দূরীভূত, উৎপন্ন তাকে অপাদান কারক বলে। সাধারণভাবে ক্রিয়াকে ‘কোথা হতে’ দ্বারা প্রশ্ন করলে যে উত্তর পাওয়া যায় তাকে অপাদান কারক বলে।
বিচ্যুত : গাছ থেকে পাতা ঝরে।
পতিত : মেঘে বৃষ্টি হয়।
গৃহীত : ঝিনুক থেকে মুক্তো মেলে।
জাত : খেত থেকে সবজি পাই।
রক্ষিত : বিপদে মোরে রক্ষা করো।
বিরত : পাপে বিরত হও।
দূরীভূত : দেশ থেকে করোনা বিদায় হলো।
উৎপন্ন : তিলে তেল হয়।
ভীত : সুন্দরবনে বাঘের ভয় আছে।

অপাদান কারকে বিভিন্ন বিভক্তির প্রয়োগ

প্রথমা বিভক্তি : উড়োজাহাজ বিমানবন্দর ছাড়ল।
দ্বিতীয়া বিভক্তি : মাকে খুব ভয় পাই।
তৃতীয়া বিভক্তি : শিশুটির চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগল।
পঞ্চমী বিভক্তি : ঝিনুক থেকে মুক্তো মেলে।
ষষ্ঠী বিভক্তি : বাঘের ভয়ে সবাই আতঙ্কিত।
সপ্তমী বিভক্তি : দুধে ঘি হয়।

অধিকরণ কারক

যে স্থানে, যে কালে বা যে বিষয়ে ক্রিয়া সম্পন্ন হয় তাকে অধিকরণ কারক বলে। ক্রিয়াকে কখন, কোথায়, কীসে ইত্যাদি দ্বারা প্রশ্ন করলে যে উত্তর পাওয়া যায় তা-ই অধিকরণ কারক। যেমন—বনে বাঘ আছে, শীতে তালের রস পাওয়া যায়। অধিকরণ কারক ৪ প্রকার :

ঐকদেশিক/স্থানাধিকরণ

যে স্থানে ক্রিয়া সম্পন্ন হয় তাকে ঐকদেশিক/স্থানাধিকরণ কারক বলে।
১. বনে বাঘ আছে (বনের কোনো এক জায়গায়)।
২. পুকুরে মাছ আছে (পুকুরের কোনো এক অংশে)।

কালাধিকরণ

যে কাল বা সময়ে ক্রিয়া সম্পন্ন হয় তাকে কালাধিকেণ কারক বলে।
১. বসন্তে নানান ফুল ফোটে।
২. মাঘ মাসে বেশ শীত থাকে।

বিষয়াধিকরণ

যে বিষয়ে দক্ষতা বা অক্ষমতা প্রকাশ করা হয় তাকে বিষয়াধিকরণ কারক বলে।
১. রাতুল অঙ্কে কাঁচা।
২. সে বাংলায় বেশ দক্ষ।

ভাবাধিকরণ

একটি ক্রিয়া অন্যটির ওপর নির্ভর করলে নির্ভরশীল ক্রিয়াটি ভাববাচকে রূপান্তরিত হয়ে অধিকরণ হলে তাকে ভাবাধিকরণ কারক বলে।
১. কান্নায় শোক মন্দীভূত হয়।

অধিকরণ কারকে বিভিন্ন বিভক্তির প্রয়োগ

প্রথমা বিভক্তি : আমি আগামীকাল বাড়ি যাব।
দ্বিতীয়া বিভক্তি : মন আমার নাচেরে আজিকে
তৃতীয়া বিভক্তি : খিলিপান (এর ভেতরে ভরে) দিয়ে ওষুধ খাবে।
পঞ্চমী বিভক্তি : বাড়ি থেকে নদী দেখা যায়।
সপ্তমী বিভক্তি : বনে বাঘ আছে।



সন্ধি কাকে বলে, কত প্রকার ও কী কী?

সন্ধি শব্দের  অর্থ মিলন। পাশাপাশি অবস্থিত দুটি ধ্বনির মিলনকে সন্ধি বলে। সন্ধির ফলে শব্দের মাধুর্য বৃদ্ধি পায়। তবে মূল শব্দের অর্থ তেমন লোপ পায় না।

বাংলা শব্দের সন্ধি

বাংলা শব্দের মাধুর্য বৃদ্ধির জন্যে যে সন্ধির উদ্ভব তাকে বাংলা শব্দের সন্ধি বলে। বাংলা শব্দের সন্ধি ২ প্রকার—স্বরসন্ধি, ব্যঞ্জনসন্ধি।

স্বরসন্ধি

স্বরধ্বনির সঙ্গে স্বরধ্বনির মিলনের ফলে যে সন্ধি হয় তাকে স্বরসন্ধি বলে। স্বরসন্ধিতে ধ্বনি লোপ পেয়ে নতুন ধ্বনি গঠনের নিয়ম :
১. অ+এ = এ          শত+এক = শতেক।
২. আ+আ = আ     সোনা+আলি = সোনালি।
৩. আ+উ = উ         মিথ্যা+উক = মিথ্যুক।
৪. ই+এ = ই            কুড়ি+এক = কুড়িক।

মাঝে মাঝে শেষের ধ্বনিটি লোপ পায়। যেমন—যা+ইচ্ছা+তাই = যাচ্ছেতাই।

ব্যঞ্জনসন্ধি

স্বরধ্বনি ও ব্যঞ্জনধ্বনি, ব্যঞ্জনধ্বনি ও ব্যঞ্জনধ্বনি, ব্যঞ্জনধ্বনি ও স্বরধ্বনির মিলনে যে সন্ধি হয় তাকে ব্যঞ্জনসন্ধি বলে।
১. প্রথম ধ্বনি অঘোষ ও পরের ধ্বনিটি ঘোষ হলে দুটির মিলনে ঘোষ ধ্বনির দ্বিত্ব হয়। যেমন—ছোট+দা = ছোড়দা।
২. হলন্ত র্ ধ্বনির পরে অন্য ব্যঞ্জনধ্বনি থাকলে র্ ধ্বনি লোপ পেয়ে পরের ধ্বনির দ্বিত্ব হয়। যেমন—চার+টি = চাট্টি, ধর্+না = ধন্না, দুর+ছাই = দুচ্ছাই।
৩. চ বর্গীয় ধ্বনির (চ, ছ, জ, ঝ, ঞ) আগে ত বর্গীয় ধ্বনি থাকলে ত বর্গীয় ধ্বনিটি লোপ পায় এবং চ বর্গীয় ধ্বনির দ্বিত্ব হয়। যেমন—বদ্+ জাত = বজ্জাত, হাত+ছানি = হাচ্ছানি।
৪. প ধ্বনির পরে ‘চ’ বা ‘স’ ও তারপরে ত থাকলে ‘চ’ ও ‘ত’ ধ্বনি মিলে তালব্য শ হয়। যেমন—পাঁচ+শ = পাঁশ্‌শ, সাত+শ = সাশ্‌শ, পাঁচ+সিকা = পাঁশশিকা।
৫. হলন্ত ধ্বনির সঙ্গে স্বরধ্বনি যুক্ত হলে স্বরের কোনো লোপ ঘটে না। যেমন—বোন+আই = বোনাই, চুন+আরি = চুনারি, বার+এক = বারেক।
৬. স্বরধ্বনির পরে ব্যঞ্জনধ্বনি থাকলে স্বরধ্বনিটি লোপ পায়। যেমন—কাঁচা+কলা = কাঁচকলা, নাতি+বউ = নাতবউ, ঘোড়া+দৌড় = ঘোড়দৌড়।

তৎসম শব্দের সন্ধি

সংস্কৃত থেকে হুবহু বাংলায় আসা শব্দগুলো সংস্কৃত ব্যাকরণের নিয়মেই গঠিত। তৎসম শব্দ বা সংস্কৃত থেকে আসা সন্ধিবদ্ধ শব্দগুলো তিনটি উপায়ে গঠিত—স্বরসন্ধি, ব্যঞ্জনসন্ধি ও বিসর্গ সন্ধি।

স্বরসন্ধি

স্বরধ্বনির সঙ্গে স্বরধ্বনির মিলনে যে সন্ধি হয় তাকে স্বরসন্ধি বলে।
১. অ-আ, আ-আ, কিংবা আ-অ আগে-পরে যা-ই থাক দুটি মিলে সবসময় আ-কার হয়।
অ+অ = আ            প্রাণ+অধিক = প্রাণাধিক।
অ+আ = আ           সিংহ+আসন = সিংহাসন।
আ+অ = আ           আশা+অতীত = আশাতীত।
আ+আ = আ          কারা+আগার = কারাগার।

২. অ-কার বা আ-কারের পরে হ্রস্ব ই বা দীর্ঘ ঈ থাকলে দুটি মিলে এ-কার হয়।
অ+ই = এ              শুভ+ইচ্ছা = শুভেচ্ছা।
আ+ই = এ             যথা+ইষ্ট = যথেষ্ট।
অ+ঈ = এ             পরম+ঈশ = পরমেশ।
আ+ঈ = এ            মহা+ঈশ = মহেশ।

৩. অ কিংবা আ-ধ্বনির পরে হ্রস্ব উ বা দীর্ঘ ঊ যে-কোনো একটি থাকলে তা ও-কারে রূপান্তরিত হয়।
অ+উ = ও            নীল+উৎপল = নীলোৎপল।
আ+উ = ও           মহা+উৎসব = মহোৎসব।
অ+ঊ = ও           গৃহ+ঊর্ধ্ব = গৃহোর্ধ্ব।
আ+ঊ = ও          চল+ঊর্মি = চলোর্মি।

৪. অ কিংবা আ-ধ্বনির পরে ঋ-ধ্বনি থাকলে উভয় মিলে ‘অর’ হয় এবং রেফরূপে পরের বর্ণের সঙ্গে যুক্ত হয়।
অ+ঋ = অর             দেব+ঋষি = দেবর্ষি।
আ+ঋ = অর            মহা+ঋষি = মহর্ষি।

৫. অ কিংবা আ-ধ্বনির পরে ‘ঋত’ থাকলে দুটি মিলে ‘আর’ হয় এবং আগের ধ্বনিতে আ-কার—পরের ধ্বনিতে রেফ যুক্ত হয়।
অ+ঋ = আর           ভয়+ঋত = ভয়ার্ত।
আ+ঋ = আর          ক্ষুধা+ঋত = ক্ষুধার্ত।

৬. অ কিংবা আ-ধ্বনির সঙ্গে এ বা ঐ ধ্বনি যে-কোনো  যুক্ত হলে উভয় মিলে ঐ-কার হয় এবং তা প্রথম ধ্বনির সঙ্গে যুক্ত হয়।

অ+এ = ঐ     জন+এক = জনৈক।
আ+এ = ঐ    সদা+এব = সদৈব।
অ+ঐ = ঐ     মত+ঐক্য = মতৈক্য।
আ+ঐ = ঐ    মহা+ঐশ্বর্য = মহৈশ্বর্য।

৭. অ কিংবা আ-ধ্বনির পরে ও বা ঔ-ধ্বনি থাকলে উভয় মিলে ঔ-কার হয় এবং তা প্রথম ধ্বনির সঙ্গে যুক্ত হয়।
অ+ও = ঔ      বন+ওষধি = বনৌষধি।
আ+ও = ঔ     মহা+ওষধি = মহৌষধি।
অ+ঔ = ঔ     পরম+ঔষধ = পরমৌষধ।
আ+ঔ = ঔ    মহা+ঔষধ = মহৌষধ।

৮. হ্রস্ব ই-কার কিংবা দীর্ঘ ঈ-কারের পরে হ্রস্ব ই-কার বা দীর্ঘ ঈ-কার থাকলে উভয় মিলে দীর্ঘ ঈ-কার হয়।
ই+ই = ঈ        রবি+ইন্দ্র = রবীন্দ্র।
ই+ঈ = ঈ       পরি+ঈক্ষা = পরীক্ষা।
ঈ+ই = ঈ       সতী+ইন্দ্র = সতীন্দ্র।
ঈ+ঈ = ঈ       সতী+ঈশ = সতীশ।

৯. হ্রস্ব ই-কার কিংবা দীর্ঘ ঈ-কারের পরে হ্রস্ব ই-কার, দীর্ঘ ঈ-কার ছাড়া অন্য স্বর থাকলে উভয় মিলে য বা য-ফলা (্য) হয়।
ই+অ = য্+অ       অতি+অন্ত = অত্যন্ত।
ই+আ = য্+আ     ইতি+আদি = ইত্যাদি।
ই+উ = য্+উ        অতি+উক্তি = অত্যুক্তি।
ই+ঊ = য্+ঊ       প্রতি+ঊষ = প্রত্যূষ।
ই+এ = য্+এ        প্রতি+এক = প্রত্যেক।
ঈ+অ = য্+অ      নদী+অম্বু = নদ্যম্বু।

১০. হ্রস্ব উ-কার কিংবা দীর্ঘ ঊ-কারের পরে হ্রস্ব উ বা দীর্ঘ ঊ থাকলে দুটি মিলে দীর্ঘ ঊ-কার হয়।
উ+উ = ঊ        মরু+উদ্যান = মরূদ্যান।
উ+ঊ = ঊ       বহু+ঊর্ধ্ব = বহূর্ধ্ব।
ঊ+উ = ঊ       বধূ+উৎসব = বধূৎসব।
ঊ+ঊ = ঊ      ভূ+ঊর্ধ্ব = ভূর্ধ্ব।

১১. হ্রস্ব উ-কার কিংবা দীর্ঘ ঊ-কারের পরে হ্রস্ব উ বা দীর্ঘ ঊ ছাড়া অন্য কোনো স্বর থাকলে হ্রস্ব উ/দীর্ঘ ঊ-এর স্থানে ব-ফলা বসে এবং তা প্রথম ধ্বনির সঙ্গে যুক্ত হয়।
উ+অ = ব+অ        সু+অল্প = স্বল্প।
উ+আ = ব+আ      সু+আগত = স্বাগত।
উ+ই = ব+ই           অনু+ইত = অন্বিত।
উ+ঈ = ব+ঈ          তনু+ঈ = তন্বী।
উ+এ = ব+এ         অনু+এষণ = অন্বেষণ।

১২. ঋ-কারের পরে ঋ ছাড়া অন্য স্বর থাকলে ঋ-ধ্বনির জায়গায় ‘র’ হয় তা র-ফলা হিসেবে যুক্ত হয়।
পিতৃ+আদেশ = পিত্রাদেশ।
পিতৃ+আলয় = পিত্রালয়।

১৩. এ, ঐ, ও, ঔ-কারের পরে এ, ঐ-কারের স্থানে অয়, আয় এবং ও, ঔ-কারের স্থানে যথাক্রমে অব, আব বসে।
এ+অ = অয়্+এ      নে+অন = নয়ন।
ঐ+অ = আয়্+অ    গৈ+অক = গায়ক।
ও+অ = অব্+অ      লো+অন = লবণ।
ঔ+অ = আব+অ    পৌ+অক = পাবক।
ও+আ = অব্+আ    গো+আদি = গবাদি।
ও+এ = অব+এ       গো+এষণা = গবেষণা।
ও+ই = অব্+ই         পো+ইত্র = পবিত্র।
ঔ+ই = আব্+ই       নৌ+ইক = নাবিক।
ঔ+উ = আব+উ     ভৌ+উক = ভাবুক।

১৪. কিছু সন্ধি কোনো নিয়ম অনুযায়ী হয় না, এগুলোকে নিপাতনে সিদ্ধ সন্ধি বলে। যেমন—কুল+অটা = কুলটা, প্র+উঢ় = প্রৌঢ়, অন্য+অন্য = অন্যান্য, মার্ত+অণ্ড = মার্তণ্ড, শুদ্ধ+ওদন = শুদ্ধোদন, গো+অক্ষ = গবাক্ষ।

ব্যঞ্জনসন্ধি

ব্যঞ্জনধ্বনি+স্বরধ্বনি, ব্যঞ্জনধ্বনি+ব্যঞ্জনধ্বনি, স্বরধনি+ব্যঞ্জনধ্বনিতে মিলে যে সন্ধি হয় তাকে ব্যঞ্জনসন্ধি বলে।

ব্যঞ্জনধ্বনি+স্বরধ্বনি

১. ক, চ, ট, ত, প ইত্যাদির পরে স্বরধ্বনি থাকলে ব্যঞ্জনধ্বনিগুলো যথাক্রমে গ্, জ্, ড (ড়্), দ, ব-তে রূপান্তরিত হয়।
ক্+অ = গ        দিক্+অন্ত = দিগন্ত।
চ্+অ = জ        ণিচ্+অন্ত = ণিজন্ত।
ট্+আ = ড়       ষট্+আনন = ষড়ানন।
ত্+অ = দ        তৎ+অবধি = তদবধি।
প্+অ = ব        সুপ্+অন্ত = সুবন্ত।

স্বরধ্বনি+ব্যঞ্জনধ্বনি

স্বরধ্বনির পরে ছ থাকলে সেই ব্যঞ্জনধ্বনির দ্বিত্ব (চ্ছ) হয়।
অ+ছ = চ্ছ       এক+ছত্র = একচ্ছত্র।
আ+ছ = চ্ছ      কথা+ছলে = কথাচ্ছলে।
ই+ছ = চ্ছ         পরি+ছদ = পরিচ্ছদ।

ব্যঞ্জনধ্বনি+ব্যঞ্জনধ্বনি

১. ত্ এবং দ্-এর পরে চ, ছ থাকলে ত্ এবং দ্-এর পরিবর্তে চ্ বসে।
ত্+চ = চ্চ       সৎ+চিন্তা = সচ্চিন্তা।
ত্+ছ = চ্ছ      উৎ+ছেদ = উচ্ছেদ।
দ্+চ = চ্চ        বিপদ+চয় = বিপচ্চয়।
দ্+ছ = চ্ছ       বিপদ+ছায়া = বিপচ্ছায়া।

২. ত্ এবং দ্-এর পরে জ্ বা ঝ থাকলে ত্ বা দ্-এর স্থানে জ্ বসে।
ত্+জ = জ্জ      সৎ+জন = সজ্জন।
দ্+জ = জ্জ      বিপদ+জনক = বিপজ্জনক।
ত্+ঝ = জ্ঝ       কুৎ+ঝটিকা = কুজ্ঝটিকা।

৩. ত্ এবং দ্-এর পরে তালব্য শ থাকলে ত্ বা দ্-এর স্থানে চ হয় এবং তালব্য শ-এর স্থানে ছ হয়।
ত্+শ = চ্ছ       উৎ+শ্বাস = উচ্ছ্বাস।

৪. ত্ এবং দ্-এর পরে ড থাকলে ত্ ও দ্-এর পরিবর্তে ড্ বসে।
ত্+ড = ড্ড      উৎ+ডীন = উড্ডীন।

৫. ত্ এবং দ্-এর পরে হ থাকলে ত্ বা দ্-এর স্থানে দ এবং হ-এর স্থানে ধ বসে।
ত্+হ = দ্+ধ       উৎ+হার = উদ্ধার।
দ্+হ = দ্+ধ        পদ্+হতি = পদ্ধতি।

৬. ত্ এবং দ্-এর পরে ল থাকলে ত্ ও দ্-এর পরিবর্তে ল বসে।
ত্+ল = ল্ল         উৎ+লাস = উল্লাস।
দ্+ল = ল্ল          উদ্+লিখিত = উল্লিখিত।

৭. ব্যঞ্জনধ্বনিসমূহের যে-কোনো বর্গের অঘোষ অল্পপ্রাণ ধ্বনি ও ঘোষ মহাপ্রাণ ধ্বনি কিংবা ঘোষ অল্পপ্রাণ তালব্য ধ্বনি (য>জ), ঘোষ অল্পপ্রাণ ওষ্ঠ্য ধ্বনি (ব),  ঘোষ কম্পনজাত দন্তমূলীয় ধ্বনি (র) বা ঘোষ অল্পপ্রাণ ওষ্ঠ্য ব্যঞ্জনধ্বনি (ব) থাকলে প্রথম অঘোষ অল্পপ্রাণ ধ্বনি ঘোষ অল্পপ্রাণরূপে উচ্চারিত হয়।
ক্+দ = গ্+দ       বাক্+দান = বাগ্‌দান।
ট্+য = ড্+য        ষট+যন্ত্র = ষড়যন্ত্র।
ত্+ঘ = দ্+ঘ        উৎ+ঘাটন = উদ্‌ঘাটন।
ত্+য = দ্+য        উৎ+যোগ = উদ্‌যোগ/উদ্যোগ।
ত্+ব = দ্+ব        উৎ+বোধন = উদ্‌বোধন।
ত্+র = দ্+র        তৎ+রূপ = তদ্রূপ।
  
 ৮. ঙ, ঞ, ণ, ন, ম পরে থাকলে পূর্ববর্তী অঘোষ অল্পপ্রাণ স্পর্শধ্বনি সেই বর্গের ঘোষ স্পর্শধ্বনি কিংবা নাসিক্যধ্বনি হয়।
ক্+ন = গ/ঙ+ন      দিক+নির্ণয় = দিগ্‌নির্ণয়/দিঙ্‌নির্ণয়।
ত্+ম = দ/ন+ম       তৎ+মধ্যে = তদ্‌মধ্যে/তন্মধ্যে।

৯. ম-এর পরে যে-কোনো বর্গীয় ধ্বনি থাকলে ম্ ধ্বনিটি সেই বর্গের নাসিক্যধ্বনি হয়।
ম্+ক = ঙ+ক্        শম্+কা = শঙ্কা।
ম্+চ্  = ঞ+চ্        সম্+চয় = সঞ্চয়।
ম্+ত্ = ন্+ত্          সম্+তাপ = সন্তাপ।

দ্রষ্টব্য—আধুনিক বাংলায় ম্-এর পরে কণ্ঠ বর্গীয় ধ্বনি থাকলে ম্-এর স্থানে সাধারণত অনুস্বার (ং) হয়।
সম্+গত = সংগত,    অহম্+কার = অহংকার।

১০. ম-এর পরে অন্তঃস্থ ধ্বনি য, র, ল, ব কিংবা শ, ষ, স, হ থাকলে ম-এর জায়গায় অনুস্বার (ং) বসে। যেমন—সম্+যোগ = সংযোগ, সম্+সার = সংসার

১১. চ্ ও জ্-এর পরের নাসিক্যধ্বনি তালব্যধ্বনিতে রূপান্তরিত হয়।
চ্+ন = চ্+ঞ           যাচ্+না = যাচ্‌ঞা।
জ্+ন = জ্+ঞ        যজ্+ন = যজ্ঞ।

১২. দ ও ধ-এর পরে বর্গের প্রথম বা দ্বিতীয় বর্ণ থাকলে ‘দ’ ও ‘ধ’ অঘোষ অল্পপ্রাণ ধ্বনি হয়।
দ্>ত্             তদ্+কাল = তৎকাল।
ধ্>ত্             ক্ষুধ্+পিপাসা = ক্ষুৎপিপাসা।

১৩. দ্ কিংবা ধ্-এর পরে স থাকলে দ্ ও ধ্-এর স্থানে অঘোষ অল্পপ্রাণ ধ্বনি হয়। যেমন—বিপদ্+সংকেত = বিপৎসংকেত,  তদ্+সম = তৎসম।

১৪. ষ-এর পরে ত্ বা থ্ থাকলে তা যথাক্রমে ‘ট’ ও ‘ঠ’-তে রূপান্তরিত হয়।
যেমন—কৃষ্+তি = কৃষ্টি,    ষষ্+থ = ষষ্ঠ।

বিশেষ নিয়মে সাধিত সন্ধি :
উৎ+স্থান = উত্থান, সম্+কার = সংস্কার।
পরি+কার = পরিষ্কার, সম্+কৃত = সংস্কৃত।

কতগুলো নিপাতনে সিদ্ধ সন্ধি :
পর+পর = পরস্পর, বন+পতি = বনস্পতি।
গো+পদ = গোষ্পদ, আ+চর্য = আশ্চর্য।
বৃহৎ+পতি = বৃহস্পতি, তৎ+কর = তস্কর।
মনস্+ঈষা = মনীষা, ষট্+দশ = ষোড়শ।
এক্+দশ = একাদশ, পতৎ+অঞ্জলি = পতঞ্জলি।

বিসর্গ সন্ধি

সংস্কৃত ছাড়া অন্য শব্দে বিসর্গ সন্ধি নেই। সংস্কৃত সন্ধির নিয়মে পদের অন্তস্থিত র্ ও স্ অনেক ক্ষেত্রে অঘোষ উষ্মধ্বনি অর্থাৎ হ ধ্বনির মতো উচ্চারিত হয় এবং তা বিসর্গরূপে লেখা হয়। র্ ও স ব্যঞ্জনধ্বনির অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় বিসর্গ সন্ধিও ব্যঞ্জনসন্ধির অন্তর্গত। সহজ কথায় বিসর্গ হচ্ছে র্ ও স-এর সংক্ষিপ্ত রূপ।
বিসর্গ সন্ধি দুইভাবে গঠিত হয়—বিসর্গ+স্বর, বিসর্গ+ব্যঞ্জন।

বিসর্গ ও স্বরের সন্ধি

অ ধ্বনির পরে অবস্থিত অঘোষ উষ্মধ্বনি বিসর্গের পরে অ ধ্বনি থাকলে অ, ঃ,  অ মিলে ও-কার হয়। যেমন—
ততঃ+অধিক = ততোধিক। 

বিসর্গ ও ব্যঞ্জনের সন্ধি

১. অ-কারের পরে অবস্থিত স্-জাত বিসর্গের পর ঘোষ অল্পপ্রাণ ও ঘোষ মহাপ্রাণ ব্যঞ্জনধ্বনি, নাসিক্যধ্বনি বা য, ব, র, ল, হ থাকলে অ-কার ও স্-জাত বিসর্গ উভয় স্থানে ও-কার হয়। যেমন—
তিরঃ+ধান = তিরোধান, মনঃ+রম = মনোরম।
তপঃ+বন = তপোবন।

২. অ-কারের পরে অবস্থিত র্-জাত বিসর্গের পরে উপরিউক্ত ধ্বনিসমূহের যে-কোনো একটি থাকলে বিসর্গের স্থানে র্ বসে। যেমন—
অন্তঃ+গত = অন্তর্গত, পুনঃ+আয় = পুনরায়।
অহঃ+অহ = অহরহ , পুনঃ+জন্ম = পুনর্জন্ম।

৩. অ কিংবা আ ছাড়া অন্য স্বরের পরে বিসর্গ থাকলে ও তার সঙ্গে অ, আ, বর্গীয় ঘোষবর্ণ অল্পপ্রাণ ও ঘোষ মহাপ্রাণ নাসিক্যধ্বনি কিংবা য, র, ল, ব, হ থাকলে বিসর্গের স্থানে র বসে।
যেমন—আশীঃ+বাদ = আশীর্বাদ, দুঃ+যোগ = দুর্যোগ।

দ্রষ্টব্য—ই বা উ ধ্বনির পরের বিসর্গের সঙ্গে র ধ্বনির সন্ধি হলে বিসর্গের বিলোপ ঘটে এবং বিসর্গের আগের হ্রস্ব স্বর দীর্ঘ হয়।
যেমন—নিঃ+রব = নীরব, নিঃ+রস = নীরস।

৪. বিসর্গের পরে অঘোষ অল্পপ্রাণ কিংবা মহাপ্রাণ তালব্য ব্যঞ্জনধ্বনি থাকলে বিসর্গের স্থানে তালব্য শিস ধ্বনি হয়। অঘোষ অল্পপ্রাণ বা অঘোষ মহাপ্রাণ মূর্ধন্য ব্যঞ্জন থাকলে বিসর্গের স্থানে মূর্ধন্য শিস ধ্বনি হয়, অঘোষ অল্পপ্রাণ কিংবা অঘোষ মহাপ্রাণ দন্ত্য ব্যঞ্জনের স্থানে দন্ত্য শিস ধ্বনি হয়।
ঃ+চ/ছ = শ+চ/ছ      শিরঃ+ছেদ = শিরশ্ছেদ।
ঃ+ট/ঠ = ষ+ট/ঠ       নিঃ+ঠুর = নিষ্ঠুর।
ঃ+ত/থ = স+ত/থ      দুঃ+থ = দুস্থ।

৫. অঘোষ অল্পপ্রাণ কিংবা অঘোষ মহাপ্রাণ কণ্ঠ্য বা ওষ্ঠ্য ব্যঞ্জন (ক, খ, প, ফ) পরে থাকলে অ বা আ ধ্বনির পরে অবস্থিত বিসর্গের স্থানে অঘোষ দন্ত্য শিস ধ্বনি (স্) হয় এবং অ বা আ ছাড়া অন্য স্বরধ্বনির পরে অবস্থিত বিসর্গের স্থানে অঘোষ মূর্ধন্য শিস ধ্বনি (ষ) হয়।
অ ধ্বনির পরে বিসর্গ+ক = স্+ক  নমঃ+কার = নমস্কার।
অ ধ্বনির পরে বিসর্গ+খ = স্+খ   পদঃ+খলন = পদস্খলন।
ই ধ্বনির পরে বিসর্গ+ক = ষ+ক     নিঃ+কর = নিষ্কর।
উ ধ্বনির পরে বিসর্গ+ক = ষ+ক     দুঃ+কর = দুষ্কর।

৬. কখনো কখনো সন্ধির ক্ষেত্রে বিসর্গ লোপ পায় না। যেমন—প্রাতঃ+কাল = প্রাতঃকাল, মনঃ+কষ্ট = মনঃকষ্ট।

কয়েকটি বিশেষ বিসর্গ সন্ধির উদাহরণ :
বাচঃ+পতি = বাচস্পতি, অহঃ+নিশা = অহর্নিশ।

হোটেল, মোটেল ও রেস্টুরেন্টের পার্থক্য

হোটেল, মোটেল ও রেস্টুরেন্ট ইত্যাদি শব্দগুলো আমাদের কারো কাছেই অপরিচিত নয়। তবে প্রায়ই অনেকে জিজ্ঞেস করেন যে আসলে হোটেল, মোটেল ও রেস্টুরেন্টের মধ্যে কোনো পার্থক্য আছে কি না, আর থাকলেও তা কতটুকু। চলুন বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।

হোটেল

আমরা বাঙালিরা অনেকে হোটেল বলতে ‘মায়ের দোয়া ভাতের হোটেল’—এমন কিছু দেখে অভ্যস্ত। তবে বাস্তবে পার্থক্যটা অনেক। যদিও সব হোটেলের বৈশিষ্ট্য এক নয় তবুও প্রায় সব হোটেলেরই সাধারণ কিছু বৈশিষ্ট্য আছে।

হোটেলে প্রধানত থাকার সুবিধা থাকে। এছাড়া অবস্থানরত ব্যক্তিদের জন্যে খাবারের ব্যবস্থাও থাকে। অনেক হোটেলে, বিশেষ করে আধুনিক হোটেলগুলোতে পার্টি, সভা, সেমিনার, বিনোদন ও সুইমিংপুল প্রভৃতির ব্যবস্থা থাকে। বেশিরভাগ হোটেলই বহুতল হয়ে থাকে।

হোটেলে প্রায় ৫০টা থেকে ২০০টা পর্যন্ত কক্ষ থাকে। হোটেলে প্রতিটি কক্ষ-সংলগ্ন বারান্দা থাকে এবং তা দিয়ে মানুষ যাতায়াত করে। হোটেলে কর্মচারীর সংখ্যা মোটেল ও রেস্টুরেন্টের কর্মচারীর সংখ্যার তুলনায় অনেক বেশি থাকে। বিভিন্ন প্রকারের কর্মচারী থাকে আধুনিক হোটেলগুলোতে। হোটেলে গাড়ি রাখার ব্যবস্থা খুব সীমিত থাকে।

মোটেল

হোটেলের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মোটেলের বৈশিষ্ট্যের কিছুটা মিল থাকলেও বেশকিছু পার্থক্য রয়েছে। মোটেলে খুব অল্প সংখ্যক কক্ষ থাকে। মূলত পর্যটন এলাকাগুলোতে মোটেলের সংখ্যা বেশি। মোটেল সাধারণত দুইতলাবিশিষ্ট হয়ে থাকে।

মোটেলে আবাসন-সুবিধা থাকে এবং অবস্থানরতদের খাবারের ব্যবস্থাও থাকে। মোটেলের সামনে গাড়ি রাখার জন্যে বড়ো প্রশস্ত জায়গা থাকে। মোটেলে অবস্থানের খরচ হোটেলে অবস্থানের খরচের তুলনায় কম।

মোটেলে সাধারণত একটি লম্বা বারান্দা থাকে যা দিয়ে অবস্থানকারীরা সরাসরি কক্ষে প্রবেশ করতে পারে। মোটেলের কর্মচারীর সংখ্যা হোটেলের কর্মচারীর সংখ্যার চেয়ে অনেক কম কারণ মোটেলের কক্ষের সংখ্যাও অনেক কম হয়ে থাকে।

রেস্টুরেন্ট

রেস্টুরেন্টের বৈশিষ্ট্য হোটেল ও মোটেলের বৈশিষ্ট্যের তুলনায় আলাদা। রেস্টুরেন্টে সাধারণত বিভিন্ন ধরনের খাবার সরবরাহ করা হয়ে থাকে। এখানে থাকার কোনো ব্যবস্থা থাকে না। রান্নাঘর ছাড়া একটি বা দুটি বড়ো কক্ষ থাকে যা চেয়ার-টেবিলে প্রায় ভরা থাকে।

রেস্টুরেন্টে কর্মচারীর সংখ্যা কম হয়ে থাকে তবে আধুনিক রেস্টুরেন্টগুলোতে কর্মচারীর সংখ্যা একটু বেশি। বাবুর্চি, ওয়েটার (সরবরাহকারী) ছাড়া সাধারণত একজন ম্যানেজার বা ব্যবস্থাপক থাকে। রেস্টুরেন্টে খাওয়া শেষ হলে চলে যেতে হয় তবে অনেক রেস্টুরেন্টে খাওয়ার আগে বা পরেও কিছুক্ষণ সময় কাটানোর সুযোগ থাকে।

রেস্টুরেন্টে সাধারণত গাড়ি রাখার ব্যবস্থা থাকে না। এখানে বাহ্যিক বিনোদনেরও ব্যবস্থা থাকে না। বর্তমানে অনেক রেস্টুরেন্ট বাড়িতে খাবার পাঠানোর সেবাও দিয়ে থাকে।
সুপ্রিয় পাঠক, আশা করি হোটেল, মোটেল ও রেস্টুরেন্টের মধ্যে কী কী পার্থক্য আছে তা বুঝতে পেরেছেন।

সমাস কাকে বলে, কত প্রকার ও কী কী?

সমাস কাকে বলে সেটা প্রায় সবারই জানা। তবুও আরেকবার মনে করিয়ে দিই। সমাস শব্দের অর্থ সংক্ষেপণ, মিলন, একপদীকরণ। কতগুলো পরস্পরসম্পর্কিত পদ যখন একসঙ্গে হয়ে নতুন একটি পদ গঠন করে তখন তাকে সমাস বলে। সমাসের ফলে ব্যবহৃত শব্দের সংখ্যা কমে যায়, অর্থাৎ কম শব্দ ব্যবহার করে একই অর্থ প্রকাশ করা যায়।

মূলত একাধিক শব্দকে সংক্ষেপ করতে সমাসের উদ্ভব। সমাসের মাধ্যমে যে নতুন শব্দ তৈরি হয় তাকে সমাসবদ্ধ পদ বা সমস্তপদ বলে।
সমাসের জন্যে ব্যবহৃত প্রত্যেকটি পদকে সমস্যমান পদ বলা হয়। সবগুলো সমস্যমান পদকে একসঙ্গে ব্যাসবাক্য বা বিগ্রহবাক্য বলে।  সমাসযুক্ত পদের প্রথমটিকে বলে পূর্বপদ এবং পরের প্রধান পদটিকে পরপদ বা উত্তরপদ বলে।

এবার একটি সমাস লক্ষ করা যাক। মহান যে নবি = মহানবি। এখানে মহান পূর্বপদ, নবি পরপদ ও মহানবি সমস্তপদ। এখানে মহান, যে ও নবি প্রত্যেকটি সমস্যমান পদ। সমাস প্রধানত ৬ প্রকার—দ্বন্দ্ব, কর্মধারয়, তৎপুরুষ, বহুব্রীহি, দ্বিগু ও অব্যয়ীভাব।

দ্বন্দ্ব সমাস

যে সমাসে প্রত্যেকটি সমস্যমান পদের অর্থ সমস্তপদে বজায় থাকে তাকে দ্বন্দ্ব সমাস বলে। অর্থাৎ, পূর্বপদ ও পরপদ উভয়ের অর্থই সমস্তপদে বজায় থাকে। দ্বন্দ্ব সমাস উভয়পদপ্রধান। দ্বন্দ্ব সমাসে দুটি পদকে যুক্ত করতে ও, এবং, আর ইত্যাদি ব্যবহৃত হয়।
দৃষ্টান্ত :
১. আসল ও নকল = আসল-নকল।
২. ভাই ও বোন = ভাই-বোন।
৩. মা ও বাবা = মা-বাবা।
৪. উঁচু ও নিচু = উঁচু-নিচু।
৫. এখানে ও সেখানে = এখানে-সেখানে।
৬. কাঁচা ও পাকা = কাঁচা-পাকা।
৭. ছোটো ও বড়ো = ছোটো-বড়ো।
৮. পড়া ও শোনা = পড়াশোনা।
৯. ওঠা ও বসা = ওঠাবসা।
১০. খাতা ও পত্র = খাতাপত্র।

   ক. অলুক দ্বন্দ্ব : যে দ্বন্দ্ব সমাসে সমস্যমান পদের বিভক্তি লোপ পায় না তাকে অলুক দ্বন্দ্ব সমাস বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. সাপে ও নেউলে = সাপে-নেউলে।
২. পথে ও ঘাটে = পথেঘাটে।
৩. চোখে ও মুখে = চোখে-মুখে।

   খ. বহুপদী দ্বন্দ্ব : তিনটি বা তার বেশি পদ মিলে দ্বন্দ্ব সমাস হলে তাকে বহুপদী দ্বন্দ্ব সমাস বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. সাহেব, বিবি ও গোলাম = সাহেব-বিবি-গোলাম।

কর্মধারয় সমাস

বিশেষণ বা বিশেষণভাবাপন্ন পদের সঙ্গে বিশেষ্য বা বিশেষ্যভাবাপন্ন পদের মিলনে যে সমাস হয় তাকে কর্মধারয় সমাস বলে। কর্মধারয় সমাসে পরপদের অর্থ সমস্তপদে বজায় থাকে। কর্মধারয় সমাস পরপদপ্রধান।
দৃষ্টান্ত :
১. মহান যে রাজা = মহারাজ।
২. খাস যে জমি = খাসজমি।
৩. যিনি লাট তিনি সাহেব = লাটসাহেব।
৪. কু (মন্দ) যে নজর = কুনজর।
৫. সৎ যে কর্ম = সৎকর্ম।
৬. ভাজা যে বেগুন = বেগুনভাজা।
৭. যিনি পণ্ডিত তিনিই মশাই = পণ্ডিতমশাই।

   ক. মধ্যপদলোপী কর্মধারয় : যে কর্মধারয় সমাসের মধ্যপদ সমস্তপদে লোপ পায় তাকে মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. সিংহ চিহ্নিত আসন = সিংহাসন।
২. দুধ মেশানো ভাত = দুধভাত।
৩. মোটর চালিত গাড়ি = মোটরগাড়ি।

  খ. উপমান কর্মধারয় : যার সঙ্গে তুলনা করা হয় তাকে বলে উপমান এবং যাকে তুলনা করা হয় তাকে বলে উপমেয়। পূর্বপদে উপমান-বিশেষ্য ও পরপদে সাধারণ গুণবাচক বিশেষণ মিলে যে সমাস হয় তাকে উপমান কর্মধারয় সমাস বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. তুষারের ন্যায় শুভ্র = তুষারশুভ্র।
২. বজ্রের ন্যায় কঠোর = বজ্রকঠোর।
৩. যে বকের মতো ধার্মিক = বকধার্মিক।

  গ. উপমিত কর্মধারয় : পূর্বপদে উপমান বিশেষ্য ও পরপদে উপমিত বিশেষ্য মিলে যে সমাস হয় তাকে উপমিত কর্মধারয় সমাস বলে। উপমিত কর্মধারয় সমাসে দুটো পদই বিশেষ্য পদ কিন্তু উপমান কর্মধারয় সমাসে সাধারণত একটি বিশেষ্য পদ থাকে, পার্থক্য এখানেই।
দৃষ্টান্ত :
১. চাঁদের ন্যায় মুখ = চাঁদমুখ।
২. কর পল্লবের ন্যায় = করপল্লব।
৩. পুরুষ সিংহের ন্যায় = সিংহপুরুষ।

  ঘ. রূপক কর্মধারয় : পূর্বপদে উপমান-বিশেষ্য ও পরপদে উপমান-বিশেষ্যর মধ্যে অভেদ কল্পনা করে যে সমাস হয় তাকে রূপক কর্মধারয় সমাস বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. মন রূপ মাঝি = মনমাঝি।
২. জীবন রূপ যুদ্ধ = জীবনযুদ্ধ।
৩. বিষাদ রূপ সিন্ধু = বিষাদসিন্ধু।
৪. মোহ রূপ নিদ্রা = মোহনিদ্রা।

তৎপুরুষ সমাস

পূর্বপদের বিভক্তি সমস্তপদে লোপ পেয়ে যে সমাস হয় তাকে তৎপুরুষ সমাস বলে।
ক. দ্বিতীয়া তৎপুরুষ : পূর্বপদের দ্বিতীয়া বিভক্তি (কে, রে) লোপ পেয়ে যে সমাস হয় তাকে দ্বিতীয়া তৎপুরুষ সমাস বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. লোককে দেখানো = লোকদেখানো।
২. চাঁদকে দেখা = চাঁদ দেখা।

ব্যাপ্তি অর্থেও দ্বিতীয়া তৎপুরুষ সমাস হয়।
দৃষ্টান্ত : চিরকাল ব্যাপিয়া সুখী = চিরসুখী।

খ. তৃতীয়া তৎপুরুষ : পূর্বপদের তৃতীয়া বিভক্তি (দ্বারা, দিয়ে, কর্তৃক) লোপ পেয়ে যে সমাস হয় তাকে তৃতীয়া তৎপুরুষ সমাস বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. ঢেঁকি দিয়ে ছাঁটা = ঢেঁকিছাঁটা।
২. মধু দিয়ে মাখা = মধুমাখা।
৩. মন দিয়ে গড়া = মনগড়া।

গ. চতুর্থী তৎপুরুষ : পূর্বপদের চতুর্থী বিভক্তি (কে, রে), নিমিত্ত, জন্যে, উদ্দেশ্য ইত্যাদি লোপ পেয়ে যে সমাস হয় তাকে চতুর্থী তৎপুরুষ সমাস বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. শিশুদের জন্যে পার্ক = শিশুপার্ক।
২. এতিমদের জন্যে খানা = এতিমখানা।
৩. বিদ্যার নিমিত্ত আলয় = বিদ্যালয়।

ঘ. পঞ্চমী তৎপুরুষ : পূর্বপদের পঞ্চমী বিভক্তি (হতে, থেকে, চেয়ে, অপেক্ষা) লোপ পেয়ে যে সমাস হয় তাকে পঞ্চমী তৎপুরুষ সমাস বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. হাত থেকে ছাড়া = হাতছাড়া।
২. প্রাণের চেয়ে প্রিয় = প্রাণপ্রিয়।
৩. পথ হতে ভ্রষ্ট = পথভ্রষ্ট।

ঙ. ষষ্ঠী তৎপুরুষ : পূর্বপদের ষষ্ঠী বিভক্তি (র, এর) লোপ পেয়ে যে সমাস হয় তাকে ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. বিশ্বের কবি = বিশ্বকবি।
২. আমের গাছ = আমগাছ।
৩. রাষ্ট্রের পতি = রাষ্ট্রপতি।
৪. হাতের ঘড়ি = হাতঘড়ি।

ষষ্ঠী বিভক্তি লোপ না পেলে তাকে অলুক ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. মনের মানুষ = মনের মানুষ।
২. কলের গান = কলের গান।

চ. সপ্তমী তৎপুরুষ : পূর্বপদের সপ্তমী বিভক্তি (এ, য়, তে) লোপ পেয়ে যে সমাস হয় তাকে সপ্তমী তৎপুরুষ সমাস বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. বস্তায় বন্দি = বস্তাবন্দি।
২. অকালে পক্ব = অকালপক্ব।
৩. ঝুড়িতে ভরতি = ঝুড়িভরতি।

ছ. নঞ্ তৎপুরুষ : না-বাচক শব্দ (না, নেই, নাই, নয়, অ, অনা, অনা, গর প্রভৃতি) পূর্বে যুক্ত হয়ে যে সমাস হয় তাকে নঞ্ তৎপুরুষ সমাস বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. ন আচার = অনাচার।
২. ন কাতর = অকাতর।
৩. অন আদর = অনাদর।

জ. উপপদ তৎপুরুষ : পূর্বপদের সঙ্গে কৃৎপ্রত্যয় যুক্ত হয়ে যে সমাস গঠন করে তাকে উপপদ তৎপুরুষ সমাস বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. পঙ্কে জন্মে যা = পঙ্কজ।
২. পা চাটে যে = পা-চাটা।
৩. পকেট মারে যে = পকেটমার।

ঝ. অলুক তৎপুরুষ : যে তৎপুরুষ সমাসে পূর্বপদের বিভক্তি লোপ পায় না তাকে অলুক তৎপুরুষ সমাস বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. গায়ে পড়া = গায়েপড়া।
২. ঘিয়ে ভাজা = ঘিয়ে ভাজা।
৩. গোরুর গাড়ি = গোরুর গাড়ি।

বহুব্রীহি সমাস

যে সমাসে সমস্যমান পদের অর্থ সম্পূর্ণ না বুঝিয়ে ভিন্ন অর্থ প্রকাশ করে তাকে বহুব্রীহি সমাস বলে।

ক. ব্যতিহার বহুব্রীহি : যে সমাসের পরপদে পূর্বপদের বিশেষ্য বা ক্রিয়ার দ্বিরুক্তি প্রকাশ পায় তাকে ব্যতিহার বহুব্রীহি সমাস বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. হাতে হাতে যে লড়াই = হাতাহাতি।
২. লাঠিতে লাঠিতে যে যুদ্ধ = লাঠালাঠি।
৩. গলায় গলায় যে ভাব = গলাগলি।

খ. সমানাধিকরণ বহুব্রীহি : পূর্বপদের বিশেষণ ও পরপদের বিশেষ্য পদ মিলে যে সমাস হয় তাকে সমানাধিকরণ বহুব্রীহি সমাস বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. বদ নসিব যার = বদনসিব।
২. নীল কণ্ঠ যার = নীলকন্ঠ।
৩. হত হয়েছে শ্রী যার = হতশ্রী।

গ. ব্যাধিকরণ বহুব্রীহি : বহুব্রীহি সমাসের পূর্বপদ ও পরপদ কোনোটাই বিশেষণ না হলে তাকে ব্যাধিকরণ বহুব্রীহি সমাস বলে।
দুষ্টান্ত :
১. আশীতে বিষ যার = আশীবিষ।
২. ধামা ধরা স্বভাব যার = ধামাধরা।
৩. কথা সর্বস্ব যার = কথাসর্বস্ব।

ঘ. নঞ্ বহুব্রীহি : বিশেষ্য পূর্বপদের আগে না-বোধক অব্যয় যুক্ত হয়ে যে সমাস হয় তাকে নঞ্ বহুব্রীহি সমাস বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. নেই চেতনা যার = অচেতন।
২. নয় জানা যা = অজানা।
৩. নেই ভুল যাতে = নির্ভুল।

ঙ. মধ্যপদলোপী বহুব্রীহি : ব্যাসবাক্যের ব্যাখ্যামূলক মধ্যপদ লুপ্ত হয়ে যে বহুব্রীহি সমাস গঠিত হয় তাকে মধ্যপদলোপী বহুব্রীহি সমাস বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. ক্ষুরের মতো ধার এমন = ক্ষুরধার।
২. বিড়ালের মতো চোখ যার = বিড়ালচোখী।
৩. গায়ে হলুদ দেওয়া হয় যে অনুষ্ঠানে = গায়েহলুদ।

চ. অলুক বহুব্রীহি : যে বহুব্রীহি সমাসের পূর্বপদ বা পরপদের বিভক্তি লোপ পায় না তাকে অলুক বহুব্রীহি সমাস বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. মাথায় পাগড়ি যার = মাথায়পাগড়ি।
২. চশমা নাকে এমন যার = চশমা-নাকে।

ছ. প্রত্যয়ান্ত বহুব্রীহি : যে বহুব্রীহি সমাসের সমস্তপদে আ, এ, ও ইত্যাদি প্রত্যয় যুক্ত হয় তাকে প্রত্যয়ান্ত বহুব্রীহি সমাস বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. ঘরের দিকে মুখ যার = ঘরমুখো।
২. দুই তলা যার = দোতলা।
৩. দুই দিকে টান যার = দোটানা।

জ. সংখ্যাবাচক বহুব্রীহি : যে বহুব্রীহি সমাসের পূর্বপদে সংখ্যাবাচক শব্দ যুক্ত হয় তাকে সংখ্যাবাচক বহুব্রীহি সমাস বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. চৌ (চার) চাল যে ঘরের = চৌচালা।
২. দশ হাত দৈর্ঘ্য যার = দশহাতি।
৩. তে (তিন) পায়া যার = তেপায়া।

ঝ. নিপাতনে সিদ্ধ বহুব্রীহি : যে বহুব্রীহি সমাস নিয়ম মেনে গঠিত হয় না তাকে নিপাতনে সিদ্ধ বহুব্রীহি সমাস বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. পণ্ডিত হয়েও যে মূর্খ = পণ্ডিতমূর্খ।
২. জীবিত থেকেও যে মৃত = জীবন্মৃত।

দ্বিগু সমাস

সমাহার, সমষ্টি বা মিলন অর্থে সংখ্যাবাচক শব্দের সঙ্গে বিশেষ্য পদ যুক্ত হয়ে যে সমাস গঠন করে তাকে দ্বিগু সমাস বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. চৌ (চার) রাস্তার সমাহার = চৌরাস্তা।
২. সাত সমুদ্রের সমাহার = সাতসমুদ্র।
৩. শত অব্দের সমাহার = শতাব্দী।

অব্যয়ীভাব সমাস

যে সমাসের সমস্তপদের আগে অব্যয় যুক্ত হয় তাকে অব্যয়ীভাব সমাস বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. কূলের সমীপে = উপকূল।
২. দিন দিন = প্রতিদিন।
৩. আমিষের অভাব = নিরামিষ।
৪. পা হতে মাথা পর্যন্ত = আপাদমস্তক।
৫. গ্রহের সদৃশ = উপগ্রহ।
৬. বেলাকে অতিক্রান্ত = উদ্‌বেল।
৭. ঈষৎ রক্ত = আরক্ত।

উপরিউক্ত ৬ প্রকারের সমাস ছাড়াও আরও ২টি অপ্রধান  সমাসের দেখা মেলে।
ক. প্রাদি সমাস : প্র, প্রতি, অনু ইত্যাদি অব্যয়ের সঙ্গে কৃৎপ্রত্যয়সাধিত বিশেষ্যর যে সমাস হয় তাকে প্রাদি সমাস বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. পরি (চারিদিক) যে ভ্রমণ = পরিভ্রমণ।
২. প্র (প্রকৃষ্ট) যে বচন = প্রবচন।

খ. নিত্য সমাস : যে সমাসের সমস্যমান পদগুলো সবসময় সমাসবদ্ধ থাকে তাকে নিত্য সমাস বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. অন্য দেশ = দেশান্তর।
২. তুমি, আমি ও সে = আমরা।
৩. কাল তুুল্য সাপ = কালসাপ।

যা-ই হোক, কিছু কিছু সময় একই শব্দ একাধিক সমাসের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। মোটকথা, প্রশ্নে যে-কোনো একটি সঠিক উত্তর দেওয়া থাকবে। তাছাড়া লিখিত প্রশ্নে সমাস কাকে বলে জিজ্ঞেস করলে প্রথম অনুচ্ছেদটুকু যথেষ্ট। আর, ‘সমাস কাকে বলে, কত প্রকার ও কী কী’ প্রশ্ন হলে সংজ্ঞার্থ দিয়ে সঙ্গে প্রতিটির সামান্য বিস্তারিতসহ উদাহরণ লিখলে যথেষ্ট।



বাঙলা নাকি বাংলা : কোনটি শুদ্ধ ও কেন?

বাঙলা নাকি বাংলা, কোনটি সঠিক সেটা নিয়ে মাঝে মাঝে অনেকেই প্রশ্ন করেন। অনেকের ধারণা বাঙলা বানানটি ভুল, আবার অনেকের মতে বাঙলা অপ্রচলিত হলেও শুদ্ধ বানান। আর যদি বাঙলা ভুল বানান হয়েও থাকে তাহলে তার কারণ কী। বানানটি ভুল না শুদ্ধ সেটা বিচার করার আগে শব্দটির উৎপত্তি জানা দরকার। চলুন বাঙলা নাকি বাংলা, কোনটি ভুল বা কোনটি শুদ্ধ তার পর্যালোচনা করা যাক।

শব্দটির মূল এসেছে সংস্কৃত বঙ্গ থেকে। প্রাচীনকালে বঙ্গ বলতে কেবল পূর্ববঙ্গকে বোঝাত—এখনকার মতো সমগ্র বাংলাকে বোঝাত না। বঙ্গ শব্দের সঙ্গে অধিবাসী অর্থে আল প্রত্যয় যুক্ত হয়ে বঙ্গ+আল = বঙ্গাল শব্দটি তখন পূর্ববঙ্গের অধিবাসীদের বোঝাতে ব্যবহৃত হতো।

পশ্চিমবঙ্গকে তখন ভিন্ন নামে ডাকা হতো। পশ্চিমবঙ্গে ঙ+গ = ঙ্গ যুক্তবর্ণের গ-কে অনেক জায়গায় উচ্চারণ করা হয় না; ফলে বঙ্গাল বানানটি হয়ে গেল বঙাল, যার প্রচলিত উচ্চারণ ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে বাঙাল

এর অনেক পরে বাংলা তুর্কিদের দ্বারা বিজিত হয়। তুর্কিরা বাংলার শাসনকার্যে ফারসি ভাষা ব্যবহার করত। ফারসিতে বঙ্গাল শব্দটি বঙ্গালহ বা বঙ্গালা রূপ ধারণ করে। বাঙালি জনসাধারণের মধ্যে তুর্কিদের দেওয়া এই নাম স্বীকৃত হলো। ধীরে ধীরে দেশবাসীর মুখে তার উচ্চারণ হয়ে ওঠে বাঙ্গালা

বাঙ্গালাকে সাধু শব্দ বলা যেতে পারে। মৌখিক ভাষায় আদ্যাক্ষরে বল বা ঝোঁকের ফলে দ্বিতীয় অক্ষর দুর্বল হয়ে আ-কার হারাল। ফলে বানান গিয়ে দাঁড়ায়—বাঙ্গলা বা বাঙ্গ্‌লা। পশ্চিমবঙ্গে ঙ্গ যুক্তবর্ণের লোপ পাওয়ায় বাঙ্‌লা রূপের উদ্ভব। ঙ্ এবং ং-এর উচ্চারণে পার্থক্য না থাকায় বাংলা লেখা হয়।

অনুস্বার (ং) হচ্ছে ঙ বর্ণের হস্‌চিহ্নযুক্ত রূপ। বাংলা বানানটিতেই শব্দটির যথাযথ উচ্চারণ প্রকাশ পায়। বর্তমানে ঙ বর্ণের সঙ্গে হস্‌চিহ্ন যুক্ত করার পরিবর্তেবেশি ব্যবহৃত হয়। তাছাড়া বর্তমানে অধিকাংশ বানানে সেটা দেখা যায়।

বাঙাল ও বাঙালি শব্দের বানানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখার জন্যে ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় একসময় বাঙলা বা বাঙ্‌লা লেখার কথা বলেছিলেন, এবং তা কোথাও কোথাও ব্যবহৃত হতো।

আবার অনেকে বলেন যে, বাংলা বানানে অনুস্বার তাহলে বাঙালি বানানে ঙ কেন। অনুস্বারের সঙ্গে কার বা স্বর যুক্ত হলে পরিবর্তিত হয়ে ঙ রূপ লাভ করে।

ব্যাকরণ | শিক্ষা

‘কর্’ ধাতুর রূপ

কর্ ধাতুও বাংলায় বহুল ব্যবহৃত একটি ধাতু। আমরা অনেকেই কর্ ধাতুর ক্রিয়াপদ লিখতে গিয়ে ভুল করে থাকি। চলুন জেনে নিই কর্ ধাতুর চলিত রূপগুলো।

ক. ব্যক্তি নিজে কাজ করলে সাধারণত নিচের রূপগুলো বসে :
করতাম, করেছিলাম, করছিলাম, করলাম, করেছি, করছি, করি, করব, করতে, করেছিলে, করছিলে, করলে, করেছ, করছ, করো, করবে, কোরো, করতি (স), করেছিলি, করছিলি, করলি, করেছিস, করছিস, করিস, করবি, কর, করত, করেছিল, করছিল, করল, করেছে, করছে, করে, করবে, করুক, করতেন, করেছিলেন, করছিলেন, করলেন, করেছেন, করছেন, করেন, করবেন, করুন, করে।
প্রয়োগ :
১. আমি একসময় খুব খেলাধুলো করতাম।
২. আমি তাকে সাহায্য করেছিলাম।
৩. আমি তখন কাজ করছিলাম।
৪. আমি মাত্র কাজটা শেষ করলাম।
৫. আমি আমার কর্তব্য পালন করেছি।
৬. আমি এখন পড়াশোনা করছি।
৭. আমি এখন চাকরি করি।
৮. ঠিক আছে, আমি তোমার কাজটা করব।
৯. আমাকে যদি একটু সাহায্য করতে তাহলে ভালো হতো।
১০. তুমিই তো আমার সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছিলে।
১১. রাত ১১টা পর্যন্ত তুমি বাজারে কী করছিলে?
১২. তুমি কেন এমন কাজ করলে!
১৩. দুপুরের খাওয়া শেষ করেছ?
১৪. তুমি এখন কী করছ?
১৫. আমি চাই কাজটা তুমিই করো।
১৬. তুমি এমন করবে সেটা আমি ভাবতেও পারিনি।
১৭. তিনমাসের মধ্যে কাজটি শেষ কোরো।
১৮. আমাকে অন্তত একবার স্মরণ করতি (স)।
১৯. তুই তাকে কেন কল করেছিলি?
২০. এতক্ষণ বাইরে কী করছিলি?
২১. তুই এমন কাজ কীভাবে করলি!
২২. আমার কাজটা শেষ করেছিস?
২৩. তুই কি এখন গুরুত্বপূর্ণ কোনো কাজ করছিস?
২৪. আমাকে এই কাজে সহায়তা করিস।
২৫. তুই এত খারাপ কাজ করবি সেটা আমার ধারণার বাইরে ছিল।
২৬. এখনই খাওয়া শেষ কর।
২৭. তুহিন আগে রেলওয়েতে চাকরি করত।
২৮. নাজিম আমাকে অপমানিত করেছিল।
২৯. সে তখনও আমার সঙ্গে তর্ক করছিল।
৩০. সে মাত্র পড়া শুরু করল ।
৩১. টিটু সরকারি চাকরিতে আবেদন করেছে।
৩২. সে রাগে গজগজ করছে।
৩৩. জলিল খুব ভালো কাজ করে।
৩৪. তুমি কবে ভালোভাবে কাজ করবে?
৩৫. সে তার মতো কাজ করুক।
৩৬. আমার নানা আমাকে খুব স্নেহ করতেন।
৩৭. এলাকার ইউনিয়ন পরিষদ সদস্যই রাস্তাটা মেরামত করতে টাকা বরাদ্দ করেছিলেন।
৩৮. তিনি আমাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করলেন।
৩৯. আপনি নাশতা করেছেন?
৪০. তিনি এখন কাজ করছেন।
৪১. আপনি দ্রুত কাজটা শেষ করেন/করুন।
৪২. বাড়িতে গিয়ে আমাকে কল করবেন।
৪৩. সে এখন কেরানির চাকরি করে।

খ. ব্যক্তি অন্যের দ্বারা কাজ করালে সাধারণত নিচের রূপগুলো বসে :
করাতাম, করিয়েছিলাম, করাচ্ছিলাম, করালাম, করিয়েছি, করাচ্ছি, করাই, করাব, করাতে, করিয়েছিলে, করাচ্ছিলে, করালে, করিয়েছ, করাচ্ছ, করাও, করাবে, কোরিয়ো, করাতি (স), করিয়েছিলি, করাচ্ছিলি, করালি, করিয়েছিস, করাচ্ছিস, করাস, করাবি, করা, করাতো, করিয়েছিল, করাচ্ছিল, করালো, করিয়েছে, করাচ্ছে, করায়, করাবে, করাক, করাতেন, করিয়েছিলেন, করাচ্ছিলেন, করালেন, করিয়েছেন, করাচ্ছেন, করাবেন, করান, করিয়ে।
প্রয়োগ :
১. আগে জানলে তোমাকে দিয়েই কাজটা করাতাম।
২. আমি সুব্রতকে দিয়ে আমার ঘরের রং করিয়েছিলাম।
৩. তোমাকে অপেক্ষা করাচ্ছিলাম কারণ আমি তখন খুব ব্যস্ত ছিলাম।
৪. শুধু শুধু তোমাকে কষ্ট করালাম।
৫. তমা কনস্ট্রাকশনকে দিয়ে আমার নতুন বাড়ি করিয়েছি।
৬. আমি খুব শীঘ্রই কাজটা করাচ্ছি।
৭. আমি এখন তাকে দিয়ে আমার বাড়ির কাজ করাই না।
৮. অনেকদিন ধরে ভাবছি যে রাস্তাটা পাকা করাব।
৯. তোমার ভাইকে দিয়েই তো কাজটা করাতে পারতে।
১০. তুমি রফিককে দিয়ে কাজটা করিয়েছিলে?
১১. তাকে অযথা কেন দেরি করাচ্ছিলে?
১২. তুমি কেন তাকে দিয়ে এই অপরাধ করালে?
১৩. তুমি নাকি তাকে দিয়ে আমার বিরুদ্ধে নালিশ করিয়েছ?
১৪. আমাকে শুধু শুধু অপেক্ষা করাচ্ছ কেন?
১৫. আমি বলছি না তুমি আমাকে দিয়ে কাজ করাও।
১৬. তুমি আমাকে আর কত দেরি করাবে?
১৭. তুমি জিসানকে দিয়ে কাজটা কোরিয়ো।
১৮. তাকে দিয়ে আমাকে একটিবার কল করাতি (স)।
১৯. দাসীকে দিয়ে ঘরটা পরিষ্কার করিয়েছিলি?
২০. ওকে দিয়ে কেন আমাকে হেনস্তা করাচ্ছিলি?
২১. আমার বিরুদ্ধে এমন নালিশ কীভাবে করালি?
২২. তোর বউয়ের অস্ত্রোপচার করিয়েছিস?
২৩. আমাকে কেন দেরি করাচ্ছিস?
২৪. কাজ যেহেতু করাবি সেহেতু আমার ভাইকে দিয়েই করাস।
২৫. এসব কাজ করা সহজ নয়।
২৬. সে আমাকে দিয়ে তার ব্যক্তিগত কাজ করাতো।
২৭. সে-ই এসব কাজ করিয়েছিল।
২৮. সে যখন কাজ করাচ্ছিল তখন আমি হঠাৎ হাজির হয়েছিলাম।
২৯. সে কেন আমাকে দিয়ে এমন কাজ করালো তা আমার আজও অজানা।
৩০. সে আমাকে ৩ ঘণ্টা অপেক্ষা করিয়েছে।
৩১. সে আমাকে দিয়ে প্রতিনিয়ত খারাপ কাজ করাচ্ছে।
৩২. সে যদি ফারুককে দিয়ে কাজ করায় তো করাক।
৩৩. সে আমাকে এতক্ষণ অপেক্ষা করাবে তা আমি বুঝতে পারিনি।
৩৪. মহারাজ গোপালকে দিয়ে যাবতীয় কঠিন কাজ করাতেন।
৩৫. সম্রাট শাহজাহান তাজমহল তৈরি করিয়েছিলেন।
৩৬. তিনি হেলালকে দিয়ে কাজটা করাচ্ছিলেন।
৩৭. বৈকুণ্ঠ শ্বশুরকে দিয়ে বিনোদের নামে মামলা করালেন।
৩৮. তিনি আমাকে দিয়ে এই কঠিন কাজটি করিয়েছেন।
৩৯. তাকে দিয়ে এত কষ্ট করাচ্ছেন কেন?
৪০. আপনি নেহালকে দিয়ে কাজটা করাবেন তো করান, আমার এতে কোনো আপত্তি নেই।
৪১. বাবা বেঁচে থাকতে সবকিছু ঠিকঠাক করিয়ে নাও।

‘দি’ ধাতুর রূপ

দি ধাতু বাংলায় বহুল ব্যবহৃত একটি ধাতু। আজকাল আমরা অনেকেই মুখের ভাষাকেই লেখার ভাষা হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করেছি। এর প্রধান কারণ হচ্ছে আমরা মৌখিক ভাষার সঙ্গে এত বেশি পরিচিত হয়ে গিয়েছি যে, আজকাল এগুলোকেই শুদ্ধ ও লেখার ভাষা মনে হয়।

আর এই কারণেই আমরা দি ধাতুর ভুল প্রয়োগ করছি প্রতিনিয়ত। চলুন জেনে নিই দি ধাতুর চলিত রূপগুলো।

ক. ব্যক্তি নিজে কাজ করলে সাধারণত নিচের রূপগুলো বসে :
দিতাম, দিয়েছিলাম, দিচ্ছিলাম, দিলাম, দিয়েছি, দিচ্ছি, দিই, দেবো, দিতে, দিয়েছিলে, দিচ্ছিলে, দিলে, দিয়েছ, দিচ্ছ, দাও, দিয়ো, দেবে, দিতি (স), দিয়েছিলি, দিচ্ছিলি,
দিলি, দিয়েছিস, দিচ্ছিস, দিস, দিবি, দে, দিত, দিয়েছিল, দিচ্ছিল, দিলো, দিয়েছে, দিচ্ছে, দেয়, দেবে, দিক,
দিতেন, দিয়েছিলেন, দিচ্ছিলেন, দিলেন, দিয়েছেন, দিচ্ছেন, দেন, দেবেন, দিন, দিয়ে।
প্রয়োগ :
১. আমি রোজই তাকে কল দিতাম।
২. আমি তাকে একটা ডায়ারি উপহার দিয়েছিলাম।
৩. আমি তাকে তাড়া দিচ্ছিলাম কারণ আমি তখন ব্যস্ত ছিলাম।
৪. আমার সবকিছু তোমাকে দিয়ে দিলাম।
৫. আমি বৃদ্ধটাকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছি।
৬. আমরাই তাকে প্রথম এই সুযোগটি দিই।
৭. আমি এই অবস্থায় তোমাকে যেতে দেবো না।
৮. কষ্ট করে আসার কী দরকার ছিল, আমাকে একটা কল দিতে।
৯. যখন তুমি খুদে বার্তা দিয়েছিলে তখন আমি মুঠোফোনের পাশে ছিলাম না।
১০. বারবার কেন আমাকে ডাক দিচ্ছিলে?
১১. আমাকে আজও খবরটা দিয়েছ?
১২. দিচ্ছ ভীষণ যন্ত্রণা, বুঝতে কেন পারছ না ছাই মানুষ আমি যন্ত্র না।
১৩. আমাকে আরেকবার সুযোগ দাও।
১৪. হলুদ খামে হলেও পত্র দিয়ো।
১৫. আমাকে রশিদের বাড়ির ঠিকানাটা দেবে?
১৬. সে আমাকে খবর দিক আর না-ই দিক, আমি যাবই।
১৭. তিনি আমাকে খুব ভালো উপদেশ দিতেন।
১৮. তিনি আমাকে একটা টাকার খাম দিয়েছিলেন।
১৯. তিনি আমাকে বারবার কেন খবর দিচ্ছিলেন তা আমি বুঝছিলাম না।
২০. তিনি খুশি হয়ে আমাকে ৫০০০ টাকা উপহার দিলেন।
২১. বাবা আমাকে অনেককিছুই দিয়েছেন।
২২. তিনি আমাকে রোজ কল দিচ্ছেন।
২৩. আমাকে কিছু টাকা ধার দেন/দিন।
২৪. সে এলে আমাকে ডাক দেবেন।
২৫. তোমাকে দিয়ে কিছুই হবে না।
২৬. আমি এখনই তার টাকা দিয়ে দিচ্ছি।
২৭. আমাকে কেন এই অপবাদ দিলে?
২৮. আমাকে একবার খবরটা দিতি (স)।
২৯. আমাকে তখন অযথা কেন ডাক দিয়েছিলি?
৩০. আমাকে কেন অনবরত ডাক দিচ্ছিলি?
৩১. আমাকে কতটুকু সম্মান দিয়েছিস?
৩২. আমাকে কেন দোষ দিচ্ছিস?
৩৩. পরীক্ষার খাতায় ঠিকমতো উত্তর দিস।
৩৪. ভোরবেলা আমাকে ঘুম থেকে ডেকে দিবি।
৩৫. তোর মাকে তাড়াতাড়ি ডাক দে।
৩৬. সে আমাকে প্রায়ই পত্র দিত।
৩৭. সে আমাকে একটা দামি কলম দিয়েছিল।
৩৮. সে আমার কাজ করে দিচ্ছিল, তাই আমি তার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম।
৩৯. সে অবশেষে আমার চিঠির জবাব দিলো।
৪০. বিপিন তার প্রথম স্ত্রীকে তালাক দিয়েছে।
৪১. সে আমাকে যেতে দিচ্ছে না।
৪২. সে-ই আমাকে সব খবর দেয়।

খ. ব্যক্তি অন্যের দ্বারা কাজ করালে সাধারণত নিচের রূপগুলো বসে :
দেওয়াতাম, দিইয়েছিলাম, দেওয়াচ্ছিলাম, দেওয়ালাম, দিইয়েছি, দেওয়াচ্ছি, দেওয়াই, দেওয়াব, দেওয়াতে, দিইয়েছিলে, দেওয়াচ্ছিলে, দেওয়ালে, দিইয়েছ,
দেওয়াচ্ছ, দেওয়াও, দিইয়ো, দেওয়াবে, দেওয়াতি, দিইয়েছিলি, দেওয়াচ্ছিলি, দেওয়ালি, দিইয়েছিস, দেওয়াচ্ছিস, দেওয়াস, দেওয়াবি, দেওয়া, দেওয়াত, দিইয়েছিল, দেওয়াচ্ছিল, দেওয়ালো, দিইয়েছে, দেওয়াচ্ছে, দেওয়ায়, দেওয়াবে, দেওয়াক, দেওয়াতেন, দিইয়েছিলেন, দেওয়াচ্ছিলেন, দেওয়ালেন, দিইয়েছেন, দেওয়াচ্ছেন, দেওয়াবেন, দেওয়ান।
প্রয়োগ :
১. প্রয়োজন হলে আমি সিজানকে দিয়ে তোমাকে খবর দেওয়াতাম।
২. দারোয়ানের মাধ্যমে তাকে বাড়িতে পৌঁছে দিইয়েছিলাম।
৩. আরে তুমি এসে পড়েছ! আমি তো বিপুলের মাধ্যমে তোমাকে খবর দেওয়াচ্ছিলাম।
৪. শিমুকে দিয়ে রশিদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ালাম।
৫. তারেককে দিয়ে তোমার বাড়িতে খবর দিইয়েছি।
৬. আমি এখনই তাকে খবর দেওয়াচ্ছি।
৭. তাহলে তোমাকে দিয়েই তোমার মাকে খবরটা দেওয়াব।
৮. তাকে দিয়ে আমাকে একটা কল দেওয়াতে।
৯. তুমিই তো নাহিদের মাধ্যমে আমাকে খবরটা দিইয়েছিলে।
১০. বারবার পুলিশ দিয়ে কেন আমাকে হুমকি দেওয়াচ্ছিলে?
১১. আমাকে কেন পিয়ন দিয়ে চিঠি দেওয়ালে, তুমি তো নিজে আসতে পারতে।
১২. শুনলাম তুমি নাকি জিসানকে ঘুস দিয়ে আমার বিরুদ্ধে নালিশ দিইয়েছ!
১৩. কেন বারবার আমাকে হুমকি দেওয়াচ্ছ?
১৪. তুমি তাকে দিয়ে যতই পত্র দেওয়াও না কেন, কোনো লাভ হবে না।
১৫. রাতুলের মাধ্যমে আমার জিনিসটা বাড়িতে পৌঁছে দিইয়ো।
১৬. আমাকে দিয়ে আর কতবার পরীক্ষা দেওয়াবে?
১৭. তোর ভাইকে দিয়ে আমাকে অন্তত একবার ডাক দেওয়াতি।
১৮. তুই তো টুটুলের মাধ্যমে আমাকে খবরটা দিইয়েছিলি।
১৯. কেন অসীমকে দিয়ে আমাকে অনবরত কল দেওয়াচ্ছিলি?
২০. তুই কেন তাকে দিয়ে আমাকে হুমকি দেওয়ালি?
২১. তুই কেন তাকে দিয়ে খবর দিইয়েছিস, নিজে তো বলতে পারতিস।
২২. কুবুদ্ধি করে তাকে দিয়ে কেন আমাকে কষ্ট দেওয়াচ্ছিস?
২৩. তাকে দিয়ে আমাকে একটা কল দেওয়াস।
২৪. বাড়িতে গিয়ে তোর আম্মাকে দিয়ে আমাকে কল দেওয়াবি।
২৫. আমাকে অন্তত একবার তাকে দিয়ে চিঠি দেওয়া।
২৬. সে আমাকে গুন্ডা দিয়ে হুমকি দেওয়াত।
২৭. সে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার মাধ্যমে আমাকে চাকরিটা পাইয়ে দিইয়েছিল।
২৮. সে আমাকে অনবরত খবর দেওয়াচ্ছিল।
২৯. সে শেষ পর্যন্ত আমাকে নোটিশ দেওয়ালো।
৩০. সে পাপলুকে দিয়ে আমাকে খবর দিইয়েছে।
৩১. সে আমাকে অন্যের মাধ্যমে সুযোগ দেওয়াচ্ছে।
৩২. সে আজও আমাকে অন্যের মাধ্যমে খবর দেওয়ায়।
৩৩. আর কতবার আমাকে খবর দেওয়াবে?
৩৪. সে পারে তো আমাকে জেলে দেওয়াক।
৩৫. রাজা প্রহরীর মাধ্যমে দুস্থদেরকে খাবার দেওয়াতেন।
৩৬. রাজা পেয়াদা পাঠিয়ে গোপালকে খবর দিইয়েছিলেন।
৩৭. মুঠোফোনে না পেয়ে তিনি আমাকে লোক দিয়ে খবর দেওয়াচ্ছিলেন।
৩৮. বড়ো ভাই মাকে দিয়ে আমাকে বকা দেওয়ালেন।
৩৯. অফিসে না যাওয়ায় বড়োকর্তা আমাকে খবর দিইয়েছেন।
৪০. তাকে দিয়ে কেন আমাকে বারবার কল দেওয়াচ্ছেন?
৪১. তাকে বলে আমাকে একবার এই চলচ্চিত্রটিতে সুযোগ দেওয়াবেন?
৪২. রাজা প্রহরীকে দিয়ে গোপালকে বলে দেওয়ান যে, গোপালকে তাড়াতাড়ি প্রাসাদে হাজির হতে হবে।

দ্রষ্টব্য—ওপরের ধাতুরূপগুলো বাদে দি ধাতুর বাকি সব রূপই আঞ্চলিক ও সাধু।

ফোন দেওয়া নাকি ফোন করা, কোনটি শুদ্ধ?

ফোন দেওয়া নাকি ফোন করা, এই দুইয়ের মধ্যে কোনটি শুদ্ধ সেটা নিয়ে অনেকেই দ্বিধায় পড়ে যান। বর্তমানে ফোন বা মুঠোফোন একটি বহুল ব্যবহৃত যন্ত্র। ছেলে-বুড়ো সবাই আজকাল এসব ব্যবহার করে অভ্যস্ত। অনেকের মুখেই শুনি ফোন দেওয়ার কথা। কিন্তু কারো সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা অর্থে ফোন দেওয়া কি আসলেই শুদ্ধ?

ফোন দেওয়া মানে দাঁড়ায়—কেউ কাউকে একটা ফোন উপহার দিচ্ছে।  অবশ্য আমরা এটার অর্থের দিক বিবেচনা না করেই এটা ব্যবহার করে থাকি। আমরা মূলত যোগাযোগ করা অর্থে ফোন দেওয়া কথাটি ব্যবহার করি।

কিন্তু যোগাযোগ করা অর্থে ফোন দেওয়া বলা যুক্তিযুক্ত নয়, কারণ আমরা যোগাযোগ করি মাত্র; ফোনটা তাকে দিয়ে দিই না। এটার ইংরেজি হয়—give me a call/give me a ring; ভেবে দেখুন তো ইংরেজি বাক্যেও কিন্তু ফোন দেওয়ার কথা বোঝাচ্ছে না। ফোন করা, কল করা বা কল দেওয়া বোঝাচ্ছে।

তাছাড়া ইংরেজিকে বাংলাতে হুবহু বলা সম্ভবও নয়। অনেকে হয়তো বলবেন যে, কল করা, কল দেওয়া বা ফোন করা শব্দের মধ্যেও তো ইংরেজি শব্দ আছে। হ্যাঁ আছে, তবে এমন কিছু ইংরেজি শব্দ আছে যেগুলোর বাংলা করতে গেলে তা সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা সম্ভব হয়ে উঠবে না।

আর এই কারণেই আমরা এরকম ইংরেজি-বাংলা মিশ্রিত শব্দ ব্যবহার করতে কিছু ক্ষেত্রে বাধ্য। আপনি যদি ফোন করা, কল দেওয়া বা কল করার বাংলা করতে যান, তাহলে অনেকেই আপনার কথার প্রকৃত অর্থ বুঝবে না।

মুঠোফোনে কারো সঙ্গে যোগাযোগ করা অর্থে ফোন করা, কল করা বা কল দেওয়া ব্যবহার করা যেতে পারে।
তবে কেউ কাউকে ফোন, মোবাইল বা মুঠোফোন কিনে দিলে বা উপহার দিলে ফোন দেওয়া বলতে পারি; সেটা অন্য ব্যাপার।


সুপ্রিয় পাঠক, ফোন দেওয়া নাকি ফোন করা, কোনটি শুদ্ধ সেটা বুঝতে পেরেছেন নিশ্চয়।

‘ভিত্তিক’ একসঙ্গে না আলাদাভাবে বসে?

ভিত্তিক’ শব্দটি প্রায়ই ব্যবহৃত হতে দেখা যায়। বিশেষ করে গণমাধ্যমে এটার ব্যবহার সবচেয়ে বেশি।
তবে আমরা অনেকেই শব্দটির ভুল প্রয়োগ করি। চলুন জেনে নেওয়া যাক শব্দটি একসঙ্গে লিখতে হবে না আলাদাভাবে লিখতে হবে।

শেষে ‘ভিত্তিক’ যুক্ত আছে এমন শব্দ সাধারণত সমাসবদ্ধ শব্দ হয়ে থাকে। আর সমাসবদ্ধ শব্দ সাধারণত একসঙ্গে বসে। ‘ভিত্তিক’ শব্দটি সবসময় আগের শব্দের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বসে।
দৃষ্টান্ত :
১. আল-জাজিরা হচ্ছে কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম।
২. ধর্মভিত্তিক রাজনীতি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের জন্যে মঙ্গলজনক নয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
৩. কৃষিভিত্তিক সমাজব্যবস্থা-ই আজকের আধুনিক সভ্যতার শেকড়।
৪. প্রযুক্তিভিত্তিক দেশ গড়তে ইন্টারনেটের দাম কমানোর প্রস্তাব দিয়েছেন সুধীজনরা।
৫. যুক্তিভিত্তিক বক্তব্য আমি বরাবরই পছন্দ করি।
৬. অর্থনীতিবিদরা মনে করেন যে, চুক্তিভিত্তিক বিদুৎকেন্দ্র অর্থনীতির জন্যে ভালো নয়।
৭. ফেসবুকভিত্তিক ব্যাবসা দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে
৮. কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিবেশের জন্যে মারাত্মক ক্ষতিকর।

শ্যাম রাখি না কুল রাখি কথাটির উৎপত্তি

শ্যাম রাখি না কুল রাখি একটি বহুল প্রচলিত বাগ্‌ধারা। চলুন জেনে নিই এর পেছনের ইতিহাস। শ্যাম হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণের আরেক নাম। রাধা-কৃষ্ণের প্রণয়ের কাহিনি শোনেননি এমন মানুষ বোধ হয় খুঁজে পাওয়া যাবে না। প্রেমের ইতিহাসে তাঁরা যে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন তা চিরদিন বেঁচে থাকার যোগ্য।

প্রথমদিকে কৃষ্ণ রাধার জন্যে কাতর থাকতেন। রাধার চিন্তায় হয়ে উঠতেন অধীর, ছন্নছাড়া। কিন্তু প্রথমে তিনি রাধার থেকে উপেক্ষা ছাড়া আর কিছুই পাননি। কিছুদিন পরেই ঘটনা পালটে যায়। যে রাধা তাঁকে উপেক্ষা করেছিলেন সেই রাধা-ই তাঁর জন্যে অধীর হওয়া শুরু করেছেন।

কিন্তু উপেক্ষা সহ্য করতে করতে কৃষ্ণের তৃষ্ণার মাত্রা কিছুটা কমে যায়। কিন্তু তখন অবস্থা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, রাধা কৃষ্ণকে ছাড়া বাঁচবেনই না।
কিন্তু রাধা ও কৃষ্ণের সামাজিক যে মামি-ভাগ্নের সম্পর্ক, সেখানে মিলন হওয়া ছিল প্রায় অসম্ভব।

রাধার ছিল কুল (জাত) যাওয়ার ভয়, কারণ সে ছিল অন্যের স্ত্রী। তিনি যদি কৃষ্ণকে পেতে চান তাহলে তাঁর জাত বা কুল যাবে। আবার কৃষ্ণকে তিনি হারাতে চান না, কারণ তখন কৃষ্ণকে ছাড়া তাঁর বেঁচে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছিল।

রাধা না পারছিলেন কৃষ্ণের কাছে নিজেকে সঁপে দিতে, কারণ কৃষ্ণ তাঁকে ঠিক আগের মতো ভালোবাসেন না। আবার সেটা সম্ভব হলেও লোকলজ্জা, জাত যাওয়ার চিন্তা। তিনি কোনটাকে বেছে নেবেন! কারণ তাঁর কাছে কোনোটাকেই ছেড়ে দেওয়া সম্ভব ছিল না।

এই দোটানা অবস্থা থেকেই শ্যাম রাখি না কুল রাখি কথাটির উৎপত্তি। কেউ যখন দুটো বিকল্পের মধ্যে একটাকে বাদ দিয়ে আরেকটাকে গ্রহণ করতে পারেন না তখন সাধারণত শ্যাম রাখি না কুল রাখি কথাটি ব্যবহার করা হয়।

সম্পন্ন কখন একসঙ্গে, কখন আলাদাভাবে বসে?

সম্পন্ন শব্দটির ভুল ব্যবহার প্রতিনিয়তই আমাদের চোখে পড়ে।
মূলত শব্দটির অবস্থানগত কারণে অর্থবিভ্রান্তির সম্ভাবনা থাকে। অবশ্য একটি নিয়ম মনে রাখলে শব্দটির ভুল প্রয়োগ এড়ানো সম্ভব। চলুন জেনে নিই ‘সম্পন্ন’ কখন, কোথায় ও কীভাবে লিখবেন।

ক.সম্পন্ন’ শব্দটি দিয়ে সম্পৎশালী, সমাপ্ত বা সম্পূর্ণ বোঝালে তা আলাদাভাবে বসে।
দৃষ্টান্ত :
১. জহুরুল সাহেবের কুলখানি সম্পন্ন হয়েছে।
২. এই কাজ সম্পন্ন করতে কমপক্ষে ৩০ দিন সময় লাগবে।
৩. সে একটা সম্পন্ন ঘরের মেয়ে।

খ.সম্পন্ন’ শব্দটি দিয়ে আছে এমন বা কোনোকিছুতে পরিপূর্ণ বোঝালে তা আগের শব্দের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বসে।
দৃষ্টান্ত :
১. তিনি চিকিৎসার ক্ষেত্রে ১০ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন।
২. ইউনুস সাহেব একজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি।
৩. প্রাচীন মানসিকতাসম্পন্ন ব্যক্তিরা পরিবর্তনকে সহজে মেনে নিতে পারেন না।
৪. তোমার মতো বিবেকবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের থেকে এমন কাজ আশা করিনি।
উল্লেখিত/উল্লিখিত

সম্পর্কিত একসঙ্গে না আলাদাভাবে লিখবেন?

সম্পর্কিত শব্দটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়।
তবে শব্দটির ভুল প্রয়োগে বাক্যের অর্থবিভ্রান্তি ঘটতে পারে। এজন্যে শব্দটির শুদ্ধ প্রয়োগ জানা প্রয়োজন।
চলুন জেনে নিই ‘সম্পর্কিত’ শব্দটি একসঙ্গে না আলাদাভাবে লিখতে হবে।

ক.সম্পর্কিত’ শব্দটি দিয়ে যে বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্ক নির্দেশ করা হয় সেটা আগে থাকলে ‘সম্পর্কিত’ শব্দটি তার সঙ্গে যুক্ত হয়ে বসে।
দৃষ্টান্ত :
১ ইতিহাস-সম্পর্কিত বই আমি খুব পছন্দ করি।
২. রাজনীতিসম্পর্কিত বিষয়ে আমি তোমার সঙ্গে আলোচনা করতে চাই না।
৩. দুর্নীতিসম্পর্কিত বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী ছাড় দিতে নারাজ।
৪. আবহাওয়া-সম্পর্কিত নতুন কোনো তথ্য পেলে আমাকে জানাবে।

খ. ওপরের শর্ত পূরণ না হলে ‘সম্পর্কিত’ আলাদাভাবে বসে।
দৃষ্টান্ত :
১. মোট জাতীয় আয় ও মাথাপিছু আয় একে অন্যের সঙ্গে সম্পর্কিত।
২. হলি আর্টিজানে হামলা ও শোলাকিয়া ইদগাহে হামলা—একটি অপরটির সঙ্গে সম্পর্কিত কি না পুলিশ তা খতিয়ে দেখছে।
৩. আইনের প্রয়োগ ও অপরাধের হার সম্পূর্ণভাবে সম্পর্কিত।
৪. সম্পর্কিত নয় এমন দুটি বিষয়ের মাঝে তুলনা করা অনুচিত।

দ্রষ্টব্য—প্রথম নিয়মে একসঙ্গে লিখতে গিয়ে উচ্চারণে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকলে হাইফেন ব্যবহার করা যেতে পারে।
হয় তো/হয়তো | স্বাস্থ্য

ভূতের মুখে রামনাম কথাটির উৎপত্তি

ভূতের মুখে রামনাম কথাটি আমরা প্রায়ই ব্যবহার করে থাকি। সাধারণত অসম্ভব বা অবিশ্বাস্য ঘটনা/ব্যাপার বোঝাতে আমরা ভূতের মুখে রামনাম কথাটি ব্যবহার করি। অবশ্য এই কথাটির পেছনে রয়েছে এক বিরাট পৌরাণিক কাহিনি।

বাংলায় দেবযোনি নামে একটা শব্দ আছে। যাদের জন্ম দেবতা থেকে কিন্তু ক্ষমতা ও অন্যান্য দিক দিয়ে দেবতার মতো নয়, তাদেরকে মূলত দেবযোনি নামে অভিহিত করা হয়। দেবযোনিরা দশ প্রকারের হতে পারে—অপ্সরা, পিশাচ, ভূত, গন্ধর্ব, বিদ্যাধর, কিন্নর, যক্ষ, রাক্ষস, গুহ্যক ও সিদ্ধ।

এই ভূতের চেহারা খুবই ভয়ংকর রকমের। যে-কোনো সাহসী মানুষকেও মুহূর্তেই ভীত করে দিতে সক্ষম এরা।
এরা দেখতে খুবই রোগাপটকা ধরনের। দেখলে মনে হয় যে গায়ে হাড় ছাড়া অন্যকিছু অবশিষ্ট নেই।

তাদের হাতে থাকে অস্বাভাবিক লম্বা নখ, বড়ো বড়ো রক্তাক্ত চোখ, লম্বা হাত-পা, বিশ্রী রকমের কণ্ঠস্বর, অনেক লম্বা ধরনের কান ও দাঁত। ঠোঁট দেখলে মনে হয় যে ঝুলে আছে। এদের আরেকটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে, এরা উলঙ্গ থাকতে পছন্দ করে।

তবে মাঝে মাঝে এদেরকে অদ্ভুত কাপড় পরিহিত অবস্থায়ও দেখা যায়। পুরাণমতে এদের সংখ্যা প্রায় ১১ কোটি। এই ভূতেরা দেবতা-অসুরদের সঙ্গেও যুদ্ধ করত। যুদ্ধে এদের প্রধান হাতিয়ার ছিল ত্রিশূল ও তির-ধনুক।

অনেক পুরাণে দেখা যায় যে, শিব বা রুদ্রই ছিল এদের সর্দার বা দলনেতা। আবার কোথাও কোথাও শিবের শিষ্য নন্দীবীরভদ্রকে এদের সর্দার হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। এছাড়া অনেক পুরাণে বিনায়কস্কন্দকে এদের সর্দার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

কথিত আছে যে, অন্ধক নামের এক দৈত্য একদিন বিনায়ককে আক্রমণ করেন। কিন্তু তার কাছে হেরে যান ভূতের সর্দার বিনায়ক। প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে বিনায়ক তাকে আক্রমণ করার ফন্দি আঁটতে থাকেন। এক পর্যায়ে তিনি নন্দীর সঙ্গে পরামর্শ করে একত্রে কাজ করতে শুরু করেন।

একসময় তারা শক্তি সঞ্চার করে অন্ধককে আক্রমণ করেন। অন্ধক ছিলেন একা। অসহায় হয়ে তিনি শিবের কাছে গিয়ে সাহায্য প্রার্থনা করলেন। একদিন শিব অন্ধককে কয়েকজন ভূত উপহার দেন। শেষে অন্ধকও শিবের শিষ্য হিসেবে স্থান লাভ করেন। এরপর তার নাম হয় ভৃঙ্গী।

তবে আরেক পুরাণ অনুযায়ী অন্ধক শিবের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। যুদ্ধে অন্ধক হেরে যান এবং শিবের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন, তখন তার নাম হয় ভৃঙ্গী।

যদিও এই ভূতেরা শিব বা শিবের শিষ্য নন্দী ও ভৃঙ্গীর অনুগামী, কিন্তু এরা রামের নাম শুনতে পারে না। কথিত আছে যে, রামের নাম শোনামাত্রই ভূতেরা পালিয়ে যায়। যারা রামের নাম শুনতেই পারে না, তারা রামের নাম জপবে কী করে! এটা একেবারেই অসম্ভব ঘটনা।
নিষেধ/নিষিদ্ধ | শিক্ষা

উল্লেখিত নাকি উল্লিখিত : কোনটি সঠিক ও কেন?

উল্লেখিত নাকি উল্লিখিত, এই দুইয়ের মধ্যে কোনটি সঠিক বানান সেটা নিয়ে অনেকেই দ্বিধায় পড়ে যান। উল্লেখিত শব্দটির সঙ্গে আমরা অনেক আগে থেকেই পরিচিত। সাধারণত উল্লেখ করা হয়েছে এমন অর্থে আমরা এই শব্দটি ব্যবহার করি। তবে ব্যাকরণগত দিক দিয়ে উল্লেখিত অশুদ্ধ শব্দ।

সন্ধিতে উদ্+লিখিত = উল্লিখিত হয়, আবার শব্দটি প্রত্যয়যোগেও গঠিত। উদ্+ √লিখ্+ত = উল্লিখিত।
উদ্ হচ্ছে উৎ শব্দের আরেক রূপ। যার অর্থ—ওপরে বা আগে। ‘লিখিত’ অর্থ যা লেখা হয়েছে। ‘উল্লিখিত’ শব্দের অর্থ দাঁড়ায়—ওপরে লিখিত বা পূর্বে লিখিত।

একই অর্থে আমরা উপরোল্লিখিত বা উপরোল্লেখিত- লিখে থাকি—যেটা ভুল, কেননা ‘উল্লিখিত’ শব্দের মধ্যেই ওপর/উপর শব্দের অর্থ উপস্থিত। আবার নতুন করে তার আগে উপর শব্দটি যুক্ত করা বাহুল্য। আবার উল্লেখিতউল্লিখিত—এই দুটি শব্দের মধ্যে অর্থের ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে।

আমরা অনেকেই উল্লেখ করা হয়েছে এমন অর্থে উল্লেখিত লিখে থাকি। তবে ব্যাকরণের নিয়ম মেনে উল্লেখ থেকে উল্লেখিত হওয়া সম্ভব নয়।
দৃষ্টান্ত :
১. উল্লিখিত বিষয়টি ব্যাখ্যা করো।
২. উল্লিখিত নিয়মে পরের অঙ্কগুলো সমাধান করো।

সুপ্রিয় পাঠক, উল্লেখিত নাকি উল্লিখিত, কোনটি সঠিক বানান সেটা বুঝতে পেরেছেন আশা করি।

নিষিদ্ধ নাকি নিষেধ : কোনটি সঠিক বানান?

নিষিদ্ধ নাকি নিষেধ, এই দুইয়ের মধ্যে কোনটি সঠিক বানান সেটা নিয়ে অনেকেই দ্বিধায় পড়ে যান।
লেখার সময় সংশয়ের মাত্রা আরও বাড়ে। প্রতিনিয়ত আমাদের চারপাশে এগুলোর ভুল ব্যবহার আমাদেরকে আরও সংশয়ে ফেলে দেয়, বিশেষ করে সংবাদপত্রে ভুল প্রয়োগ। প্রথমে জানা জরুরি যে, দুটিই সঠিক নাকি একটি ভুল। চলুন জেনে নিই দুটিই সঠিক নাকি একটি সঠিক।

নিষিদ্ধ—‘নিষিদ্ধ’ শব্দটি বিশেষণ। নিষিদ্ধ অর্থ—বারণ করা হয়েছে এমন। বাক্যে বিশেষণ পদ হিসেবে ব্যবহারের প্রয়োজন হলে ‘নিষিদ্ধ লিখতে হবে।
দৃষ্টান্ত :
১. নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি মানুষের কৌতূহল বরাবরই বেশি।
২. নিষিদ্ধ পল্লিতে রাতে মানুষের অবাধ বিচরণ থাকে।
৩. তিব্বত একটি নিষিদ্ধ দেশ।
৪. টিএসসিতে ধূমপান নিষিদ্ধ।

নিষেধ—‘নিষেধ’ শব্দটি বিশেষ্য। নিষেধ মানে বারণ।
বাক্যে বিশেষ্য পদ হিসেবে ব্যবহারের প্রয়োজন হলে ‘নিষেধ ’লিখতে হবে।
দৃষ্টান্ত :
১. সে আমার নিষেধ শোনেনি।
২. বিধিনিষেধের কারণে চাল আমদানি বন্ধ আছে।
৩. এখানে আবর্জনা রাখা নিষেধ।
৪. ওকে বাইরে যেতে নিষেধ করো।

এমন কিছু বাক্য আছে যেখানে নিষিদ্ধ বসবে না নিষেধ বসবে সেটা বোঝা খুবই সূক্ষ্ম। এই ধরনের বাক্যে আগে ক্রিয়াপদ থাকলে তারপরে সাধারণত নিষেধ বসে। নিষিদ্ধ ও নিষেধ উভয়ই তৎসম শব্দ এবং আপনি প্রয়োজন অনুযায়ী দুটোই ব্যবহার করতে পারবেন, কোনো সমস্যা নেই

সুপ্রিয় পাঠক, নিষিদ্ধ নাকি নিষেধ, কোনটি সঠিক বানান বা কোনটি লিখবেন সেটা বুঝতে পেরেছেন আশা করি।

‘জাতীয়’ একসঙ্গে না আলাদাভাবে বসে?

আমরা অধিকাংশ বাঙালিই ‘জাতীয়’ শব্দটির প্রয়োগে ভুল করি। অবশ্য একটি সহজ নিয়ম মনে রাখলেই এই ভুল এড়ানো সম্ভব। চলুন জেনে নিই ‘জাতীয়’ কখন একসঙ্গে, কখন আলাদাভাবে লিখতে হবে।

ক.জাতীয়’ শব্দটি জাতিসম্পর্কিত বা সমগ্র জাতির ইত্যাদি বোঝালে তা আলাদাভাবে বসবে।
দৃষ্টান্ত :
১. কাঁঠাল বাংলাদেশের জাতীয় ফল।
২. জাতীয় স্বার্থে সবাইকে দল-মত ভুলে কাজ করা উচিত।
৩. জাতীয় চার নেতাকে সবাই আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে।
৪. ১৫ই আগস্ট জাতীয় শোক দিবস।

খ.জাতীয়’ শব্দটি রকম, ধরন, প্রকার বা শ্রেণিভুক্ত অর্থে ব্যবহৃত হলে সেটা আগের শব্দের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বসবে।
দৃষ্টান্ত :
১. কেরোসিন হচ্ছে পেট্রোলিয়ামজাতীয় পদার্থ। 
২. কফি এক প্রকার চা-জাতীয় পানীয়।
৩. একজাতীয় মানুষ আছে যারা অন্যের দুঃখে আনন্দ পায়।
৪. টিকটিকি হচ্ছে গিরগিটিজাতীয় সরীসৃপ প্রাণী।

অত্র-এর প্রচলিত ভুল ব্যবহার | বানানবিদ

প্রেক্ষিত/পরিপ্রেক্ষিত-এর পার্থক্য ও ব্যবহার

আমরা অনেকেই প্রেক্ষিত/পরিপ্রেক্ষিত শব্দ দুটিকে একে অন্যের পরিপূরক হিসেবে ব্যবহার করি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে শব্দ দুটির অর্থে পার্থক্য রয়েছে।

‘প্রেক্ষিত’ শব্দটি প্রেক্ষণ শব্দের বিশেষণ। প্রেক্ষণ মানে দর্শন বা দেখা। প্রেক্ষিত মানে দেখা হয়েছে এমন।
প্রেক্ষিত শব্দের সঙ্গে ‘পরি উপসর্গ যুক্ত হয়ে পরিপ্রেক্ষিত শব্দটি গঠিত হয়েছে।

‘পরি’ উপসর্গের অর্থ হচ্ছে সম্পূর্ণভাবে, চতুর্দিক।
পরিপ্রেক্ষিত শব্দের অর্থ দাঁড়ায়—পটভূমি, পারিপার্শ্বিক অবস্থা বা সবকিছু দেখেশুনে তার ওপর ভিত্তি স্থাপন করা। কোনোকিছুকে ভিত্তি করে নতুন মন্তব্য করতে সাধারণত পরিপ্রেক্ষিত শব্দটি ব্যবহৃত হয়।
দৃষ্টান্ত :
১. প্রেক্ষিত বিষয়ে তোমার মন্তব্য কী?
২. করোনার পরিপ্রেক্ষিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখা হয়েছে।

অত্র-এর প্রচলিত ভুল ব্যবহার

অত্র শব্দটির সঙ্গে আমরা ছোটোবেলা থেকেই পরিচিত। যেদিন থেকে আমরা প্রধান শিক্ষকের কাছে আবেদনপত্র লেখা শুরু করেছি, সেদিন থেকেই বোধ হয় আমাদের ‘অত্র ’লেখার হাতেখড়ি।

আবেদনপত্র লিখেছেন কিন্তু ‘অত্র’ শব্দটি লেখেননি এমন মানুষ খুব কমই আছেন।
এমনকি বক্তৃতা বা মৌখিক ঘোষণায় প্রায়ই ‘অত্র’ শব্দটি শোনা যায়। আমরা সাধারণত ‘এই’ অর্থে ‘অত্র‘ শব্দটি ব্যবহার করি।

কিন্তু ‘অত্র ’শব্দের অর্থ ‘এই’ নয়। ‘অত্র’ শব্দের অর্থ—এইখানে। এই ও এইখানের মাঝে যোজন যোজন পার্থক্য রয়েছে।
এই’ মানে যেটা বা যার সম্পর্কে বলা হয়। ‘এইখানে’ মানে এই স্থানে বা এই জায়গায়।

আমরা লিখি অত্র বিদ্যালয়, অত্র অঞ্চল, অত্র প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে লেখা উচিত—এই বিদ্যালয়, এই অঞ্চল, এই প্রতিষ্ঠান।
এই’ অর্থে ‘অত্র’ শব্দটির ব্যবহার অসংগত।

দৃষ্টান্ত :
১. রাশেদ চৌধুরী এই (অত্র) অঞ্চলের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি।
২. এই (অত্র) অফিসের ব্যবস্থাপক সদরুল হাসান।

আসলে/এলে-এর ব্যবহার

‘আসলে’ একটি বহুল ব্যবহৃত শব্দ। আমরা হরহামেশা ‘আসলে’ শব্দটি ব্যবহার করে থাকি। শব্দটির উচ্চারণ ‘আশ্‌লে’ হলে আমরা বুঝতে পারি যে, ‘আসলে’ শব্দটি দিয়ে এলে বা আগমন করলে বোঝানো হচ্ছে।
আবার উচ্চারণ ‘আশোলে’ হলে আমরা বুঝতে পারি যে, প্রকৃতপক্ষে বা বস্তুত বোঝানো হচ্ছে।

বানান একই, কিন্তু উচ্চারণ ও অর্থ উভয়ই ভিন্ন। মাঝে মাঝে বাক্যে ‘আসলে’ শব্দটি দেখে রীতিমতো থমকে যাই যে, এটা দিয়ে কোন অর্থ প্রকাশ করা হচ্ছে।

‘সে আসলে ভালো হবে’—এই বাক্যটি দিয়ে দুটি অর্থই প্রকাশ পায়।
একটি অর্থ হচ্ছে, সে যদি আগমন করে তাহলে ভালো হবে। আরেকটি অর্থ হতে পারে যে, সে প্রকৃতপক্ষে ভালো হবে। এখন আপনি কোনটি বুঝবেন?

আগমন করলে অর্থে ‘আসলে’ শব্দটি আঞ্চলিক। আগমন করলে অর্থে ‘আসলে’ না লিখে ‘এলে’ লেখাই যুক্তিযুক্ত, কেননা এতে বাক্যের অর্থ সহজবোধ্য হয়।
আবার ক্রিয়াপদের রূপ হিসেবে ‘এলে’ শুদ্ধ ও প্রমিত।

অর্থবিভ্রান্তি দূর করতে শুধু বস্তুত বা প্রকৃতপক্ষে অর্থে ‘আসলে’ শব্দটি ব্যবহার করা উচিত, আগমন করলে অর্থে ‘এলে’ ব্যবহার করা সংগত।
দৃষ্টান্ত :
উচিত—তুমি এলে মজা হবে।
অনুচিততুমি আসলে মজা হবে

‘চলাকালীন সময়ে’ ভুল না শুদ্ধ?

চলাকালীন সময়ে শব্দ দুটি প্রায়ই আমাদের চোখে পড়ে।
এই শব্দ দুটির সঙ্গে আমরা রীতিমতো অভ্যস্তও বটে।
অবস্থা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, চলাকালীন শব্দটি লেখার সঙ্গে সঙ্গেই সময়ে শব্দটি আমাদের কলমের ডগায় চলে আসে।

কাল হচ্ছে বিশেষ্য, যার অর্থ—সময়। কালীন হচ্ছে কাল শব্দের বিশেষণ পদ, এর অর্থ—সময়ে। চলাকালীন শব্দের অর্থ দাঁড়ায়—চলার সময়ে। চলাকালীন সময়ে মানে ‘চলার সময়ে সময়ে’। চলাকালীন শব্দের মধ্যেই সময়ে শব্দটি অন্তর্ভুক্ত আছে। চলাকালীন শব্দের পরে সময়ে শব্দটি নিতান্তই বাহুল্য ও নিরর্থক।

বাক্য গঠনের সময় বাহুল্য বর্জন করা সংগত। মোট কথা, কালীন শব্দের পরে সময়ে শব্দটি লেখা অনুচিত। কালীন অথবা সময়ে—যে-কোনো একটি লিখলেই চলে।
দৃষ্টান্ত :
১. বিদ্যালয় চলাকালীন/চলার সময়ে সকল ছাত্রছাত্রীকে বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকা বাধ্যতামূলক।
    বিদ্যালয় চলাকালীন সময়ে সকল ছাত্রছাত্রীকে বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকা বাধ্যতামূলক

২.করোনাকালীন/করোনার সময়ে বিনা প্রয়োজনে ঘরের বাইরে যাওয়া উচিত নয়।
   করোনাকালীন সময়ে বিনা প্রয়োজনে ঘরের বাইরে যাওয়া উচিত নয়

৩. ঢাকায় থাকাকালীন/থাকার সময়ে রোজ ফুলার রোডে ঘুরতে যেতাম।
    ঢাকায় থাকাকালীন সময়ে রোজ ফুলার রোডে ঘুরতে যেতাম

সমসাময়িক নাকি সামসময়িক : কোনটি শুদ্ধ ও কেন?

সমসাময়িক নাকি সামসময়িক, এই দুইয়ের মধ্যে কোনটি সঠিক বানান সেটা নিয়ে আমরা অনেকেই দ্বিধায় পড়ে যাচ্ছি তার কারণ হচ্ছে সামসময়িক বানানটি নিয়ে সম্প্রতি বেশ বিতর্ক শুরু হয়েছে। এর প্রধান কারণ হচ্ছে মানুষ এই বানানটির সঙ্গে অপরিচিত। অধিকাংশ বাঙালিই সমসাময়িক শব্দটির সঙ্গে পরিচিত। বহুদিন ধরেই সমসাময়িক বানানটি শুদ্ধ হিসেবে প্রচলিত ছিল কিন্তু বাংলা একাডেমি ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দে বানানটিকে পরিবর্তন করেছে। এর পেছনের কারণটি হচ্ছে সমসাময়িক বানানটি ব্যাকরণগতভাবে অশুদ্ধ ছিল।
সাধারণত একই সময়ের বা সমকালীন বোঝাতে আমরা সমসাময়িক শব্দটি ব্যবহার করে থাকি। কিন্তু ‘একই সময়ের বা সমকালীন’ অর্থে সমসাময়িক শব্দটি শুদ্ধ কি না তা জানার জন্যে শব্দটির বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।

সম শব্দের অর্থ হচ্ছে সমান বা একই, আর সাময়িক শব্দের অর্থ হচ্ছে ক্ষণকালীন। সমসাময়িক শব্দের অর্থ দাঁড়ায়—একই ক্ষণকালীন। অনেকে হয়তো বলবেন যে সম+সময়+ইক = সমসাময়িক তো হওয়া সম্ভব। কিন্তু অর্থগত দিক বিবেচনায় সমসাময়িক শব্দটি ত্রুটিপূর্ণ ও প্রায় ব্যবহারের অযোগ্য।

সমসময়+ইক = সামসময়িক। শুরুতে অ-ধ্বনি আছে এমন শব্দের সঙ্গে ইক প্রত্যয় যুক্ত হলে সেই শব্দে সাধারণত আ-কার যুক্ত হয়। একই সময়ের বোঝাতে সামসময়িক শব্দটিতে অর্থবিভ্রান্তির কোনো সম্ভাবনা নেই।
ব্যাকরণগত ও অর্থগত উভয় দিক থেকেই সামসময়িক শব্দটি শতভাগ শুদ্ধ।

সুপ্রিয় পাঠক, সমসাময়িক নাকি সামসময়িক, কোনটি সঠিক সেটা নিয়ে আর দ্বিধা নেই আশা করি। তাছাড়া সামসময়িক বানানটিতে কোনোপ্রকার ভুলের সম্ভাবনা নেই। আপনি নির্দ্বিধায় এটি লিখতে পারেন।

‘বহুল’ একসঙ্গে না আলাদাভাবে লিখবেন?

বহুল’ শব্দটি নিজেই একটি বহুল ব্যবহৃত শব্দ। এই শব্দটি কখনো একসঙ্গে, আবার কখনো আলাদাভাবে বসে।
চলুন জেনে নিই এই শব্দটিকে কখন একসঙ্গে ও কখন আলাদাভাবে লিখতে হবে।

ক. ‘বহুল’ শব্দটি দিয়ে যে শব্দটির অর্থ জোরালো করা হয় সেটা আগে থাকলে বহুল শব্দটি সেটার সঙ্গে যুক্ত হয়ে বসে। ‘বহুল’ শব্দটি বিশেষ্য পদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বিশেষণ পদ গঠন করে।
দৃষ্টান্ত :
১. এমন ব্যয়বহুল কাজ শেষ করা সহজ কথা নয়।
২. বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ।
৩. অনেক ঘটনাবহুল নাটকীয়তার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ জন্মলাভ করেছে।
৪. টাইটানিক ছিল সেই সময়ের সবচেয়ে বিলাসবহুল জাহাজ।
৫. এরকম তথ্যবহুল লেখা আমি খুবই পছন্দ করি

খ. বহুল শব্দটি দিয়ে যে শব্দটির অর্থ জোরালো করা হয় সেটা পরে থাকলে বহুল শব্দটি আলাদাভাবে বসে। ‘বহুল’ শব্দটি বিশেষণের আগে বসে বিশেষণের অর্থে জোর দেয়।
দৃষ্টান্ত :
১. সরকারি পাটকল বন্ধের সিদ্ধান্ত একটি বহুল সমালোচিত বিষয়।
২. অবশেষে বহুল প্রতীক্ষিত দিনটি আমার সামনে এলো।
৩. করোনার সময়ে মাস্ক একটি বহুল ব্যবহৃত পণ্য।
৪. রহিম চাচা এলাকার বহুল পরিচিত একজন ব্যক্তি।



এতদ্বারা নাকি এতদ্দ্বারা : কোনটি সঠিক ও কেন ?

এতদ্বারা নাকি এতদ্দ্বারা, এই দুটির মধ্যে কোনটি সঠিক সেটা নিয়ে সম্প্রতি কিছুটা বিতর্ক দেখা দিয়েছে। এদের শুদ্ধতা জানতে ব্যাকরণগত বিশ্লেষণ জানা খুবই জরুরি। চলুন জেনে নেওয়া যাক।

আমরা বহু আগে থেকেই এতদ্বারা শব্দটির সঙ্গে পরিচিত।বিজ্ঞপ্তি বা ঘোষণায় “এতদ্বারা” শব্দটি দেখেননি বা শোনেননি এমন বাঙালি খুব কমই আছেন।আবালবৃদ্ধবনিতা সবাই এই শব্দটি দেখে বা শুনে অভ্যস্ত।

এত শব্দটির অর্থ হচ্ছে এই পরিমাণ। এতদ্বারা শব্দের অর্থ দাঁড়ায়—এই পরিমাণের দ্বারা। একবার ভেবে দেখুন তো বিজ্ঞপ্তিতে এতদ্বারা শব্দ দিয়ে ‘এই পরিমাণের দ্বারা’ বোঝানো হয় কি না।

বিজ্ঞপ্তিতে ওপরের শব্দটি যে অর্থে ব্যবহৃত হয় তার শুদ্ধ বানান হচ্ছে এতদ্দ্বারা। এতদ্দ্বারা শব্দটি সন্ধির নিয়মে গঠিত।এতদ্+দ্বারা = এতদ্দ্বারা। এতদ্ শব্দের অর্থ হচ্ছে এটা, এই বা ইনি। বিজ্ঞপ্তিতে ব্যবহারযোগ্য এতদ্দ্বারা শব্দের অর্থ হচ্ছে এর দ্বারা বা এটার দ্বারা।এতদ্ হচ্ছে ‘এতৎ’ শব্দের আরেক রূপ, যেটা সাধারণত ঘোষবর্ণের আগে ব্যবহৃত হয়।

এর দ্বারা বা এটার দ্বারা বোঝাতে “এতদ্বারা” শব্দটি একেবারেই ভুল, যেটা আমরা প্রায়ই ব্যবহার করে থাকি। এতদ্বারা নাকি এতদ্দ্বারা লিখবেন তা নিয়ে আর দুশ্চিন্তা নেই আশা করি।

‘বিশেষ’ একসঙ্গে না আলাদাভাবে লিখবেন?

একই শব্দ হলেও লেখার সময় ‘বিশেষ’ শব্দটির অবস্থান ভিন্ন হতে পারে। আমরা অনেকেই দ্বিধায় থাকি এটা নিয়ে।
চলুন জেনে নিই বিশেষ শব্দটির যথাযথ প্রয়োগ।

ক.বিশেষ’ শব্দটি আলাদাভাবে বসলে তা বিশেষণ বা ক্রিয়া বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়; তখন এর অর্থ দাঁড়ায় ‘মর্যাদাপূর্ণ বা গুরুত্বপূর্ণ’।
দৃষ্টান্ত :
১. তিনি আমার কাছে একজন বিশেষ ব্যক্তি।
২. প্রতিটি মানুষের কাছে তার জন্মদিন একটি বিশেষ দিন।
৩. বাংলা ভাষাবিজ্ঞানীদের মধ্যে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
৪. রহমান সাহেব আজ অফিসে আসেননি, হতে পারে তাঁর বিশেষ কোনো কাজ আছে।
৫. বিশেষ প্রয়োজন না থাকলে এখন বাইরে যাওয়ার দরকার নেই।

খ.বিশেষ’ শব্দটি দিয়ে প্রকার, ভেদ বা রকম বোঝালে তা আগের শব্দের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বসে।
দৃষ্টান্ত :
১. ব্যক্তিবিশেষে ধ্যান-ধারণার পার্থক্য ঘটে।
২. অবস্থাবিশেষে পানি রূপ পরিবর্তন করে।
৩. ক্ষেত্রবিশেষে তোমার যুক্তি সঠিক।
৪. লিটার—তরল পদার্থ পরিমাপের এককবিশেষ।
৫. দেশবিশেষে আবহাওয়ার তারতম্য ঘটে।

না হলে/নাহলে-এর ব্যবহার

উপরিউক্ত শব্দ দুটি আমরা প্রায়ই ব্যবহার করে থাকি।
না বুঝে অনেকে ভুল করেও বসি। চলুন জেনে নিই এদের যথাযথ ব্যবহার।

না হলে—‘বাস্তবিকই যদি না ঘটে বা যদি না হয়’ এমন অর্থে না হলে শব্দটি ব্যবহৃত হয়।
দৃষ্টান্ত :
১. বৃষ্টি না হলে আমি ঘুরতে যাব।
২. এই কাজে সফল না হলে আবার চেষ্টা কোরো।
৩. এখন আসা সম্ভব না হলে আপনি পরে আসুন।

নাহলে—সাধারণত ব্যতীত, অন্যথায় অর্থে নাহলে শব্দটি ব্যবহৃত হয়।
দৃষ্টান্ত :
১. মিথ্যে বলা ছেড়ে দাও, নাহলে বিপদে পড়বে।
২. আজ স্কুলে যাও, নাহলে তোমাকে খেলনা কিনে দেবো না।
৩. তুমি নাহলে তোমার বাবা—যে-কোনো একজন এলেই হবে।

সন্ধিবদ্ধ শব্দে বিসর্গ/ও-কার

সন্ধিবদ্ধ শব্দে বিসর্গ/ও-কার লেখা কিছুটা সংশয়মূলক। কোন শব্দে বিসর্গ আর কোন শব্দে ও-কার সেটা মুখস্থ করাও বেশ কঠিন। তবে একটি সহজ নিয়ম মনে রাখলে নিঃসন্দেহে শুদ্ধ বানান লেখা সম্ভব। চলুন জেনে নিই সন্ধিবদ্ধ শব্দে বিসর্গ, ও-কারের ব্যবহার।

ক. সন্ধিতে বিসর্গের পরে বর্গের ৩য়, ৪র্থ ও ৫ম বর্ণ (গ, ঘ, জ, ঝ, ড, ঢ, দ, ধ, ন, ব, ভ, ম), য, র, ল, অন্তঃস্থ ব, হ কিংবা স্বরবর্ণ থাকলে বিসর্গের স্থানে ও-কার বসবে এবং বিসর্গের পরে অ বর্ণ থাকলে তা বিলুপ্ত হবে।
দৃষ্টান্ত :
১. মনঃ+যোগ = মনোযোগ
২. মনঃ+মতো = মনোমতো
৩. অধঃ+নমিত = অধোনমিত
৪. অধঃ+বদন = অধোবদন
৫. বয়ঃ+জ্যেষ্ঠ = বয়োজ্যেষ্ঠ
৬. সদ্যঃ+জাত = সদ্যোজাত
৭. অধঃ+গতি = অধোগতি
৮. মনঃ+ভাব = মনোভাব
৯. ইতঃ+মধ্যে = ইতোমধ্যে
১০. মনঃ+বাসনা = মনোবাসনা
১১. ততঃ+অধিক = ততোধিক
১২. মনঃ+রঞ্জন = মনোরঞ্জন

খ. বিসর্গের পরে যদি ক, খ, প, ফ, স ইত্যাদি বর্ণ থাকে তাহলে বিসর্গের কোনো পরিবর্তন হবে না।
দৃষ্টান্ত :
১. প্রাতঃ+কাল = প্রাতঃকাল
২. বহিঃ+প্রকাশ = বহিঃপ্রকাশ
৩. মনঃ+কষ্ট = মনঃকষ্ট
৪. মনঃ+পূত = মনঃপূত
৫. ইতঃ+পূর্বে = ইতঃপূর্বে
৬. বয়ঃ+সন্ধি = বয়ঃসন্ধি
৭. অন্তঃ+সত্ত্বা = অন্তঃসত্ত্বা
৮. বয়ঃ+কনিষ্ঠ = বয়ঃকনিষ্ঠ
৯. অধঃ+পতন = অধঃপতন

হয় তো/হয়তো-এর ব্যবহার

হয় তোহয়তো শব্দ দুটি লিখতে গিয়ে আমরা প্রায়ই সংশয়ে থাকি। বাক্যের অর্থ স্পষ্ট করার জন্যে এদের যথাযথ প্রয়োগ জরুরি। চলুন জেনে নিই এদের যথাযথ ব্যবহার।

হয় তো—একটি ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আরেকটি ঘটনা ঘটলে বা হ্যাঁ-সূচক অর্থে হয় তো ব্যবহৃত হয়।
দৃষ্টান্ত :
১. যদি বৃষ্টি হয় তো আমি বাজারে যাব না।
২. সে আমার বন্ধু হয় তো।
৩. যদি সম্ভব হয় তো কাল একবার দেখা কোরো।
৪. নির্দোষ হয় তো সে মুক্তি পাবে।
৫. যদি অসুবিধে না হয় তো দুদিন থেকে যাও।

হয়তো—সম্ভাব্যতা বা অনিশ্চয়তা অর্থে হয়তো ব্যবহৃত হয়।
দৃষ্টান্ত :
১. আমি হয়তো আগামী শনিবার ব্যস্ত থাকব।
২. সে হয়তো তোমাকে চিনতেও পারে।
৩. আগামী তিনদিন হয়তো বৃষ্টি হবে।
৪. হয়তো আর কোনোদিনই তোমার সঙ্গে আমার দেখা হবে না।

নয় তো/নয়তো-এর ব্যবহার

নয় তোনয় তো শব্দটি না-বোধক অর্থে বা সংশয় প্রকাশে ব্যবহৃত হয়।
দৃষ্টান্ত :
১. সে এমন দুষ্টু ছেলে নয় তো।
২. সে তোমার মতো বোকা নয় তো।
৩. লোকটা ধান্দাবাজ নয় তো?
৪. লোকটার চরিত্র ভালো নয় তো, একদিন ধরা পড়বেই।
৫. এটা আবার নতুন কোনো ঝামেলা নয় তো?

নয়তো—অন্যথায়, নাহয়, নাহলে ইত্যাদি অর্থে নয়তো শব্দটি ব্যবহৃত হয়।
দৃষ্টান্ত :
১. তুমি আমাদের বাড়িতে বেড়াতে এসো, নয়তো আমি তোমাদের বাড়িতে যাব না।
২. পড়াশোনায় মনোযোগ দাও, নয়তো ভবিষ্যতে আফসোস করবে।
৩. আমি চাকরি করব, নয়তো উদ্যোক্তা হব।
৪. মন চাইলে আমার সঙ্গে থাকো, নয়তো থেকো না।
৫. সাজিদ নয়তো মজিদ—যে-কোনো একজন আমাকে সাহায্য করবে।

‘মতো’ একসঙ্গে না আলাদাভাবে লিখবেন?

মতো’ শব্দটি একসঙ্গে লিখব না আলাদাভাবে লিখব সেটা নিয়ে আমরা প্রায়ই সংশয়ে থাকি। চলুন জেনে নিই আজীবন মনে রাখার মতো একটি সহজ নিয়ম।

. ‘মতো’ শব্দটি যদি অনুযায়ী, অনুসারে, মোতাবেক ইত্যাদি অর্থে ব্যবহৃত হয়, তাহলে মতো শব্দটি সবসময় আগের শব্দের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বসবে।
দৃষ্টান্ত :
১. ঠিকমতো পড়াশোনা কোরো।
২. আমার উপদেশমতো কাজ করবে।
৩. আমার কথামতো চললে তোমার আজ এই অবস্থা হতো না।
৪. তুমি তোমার মনোমতো চলো, আমি বাধা দেবো না।
৫. সচিবরা মন্ত্রীর নির্দেশমতো কাজ করেন।
৬. সময়মতো স্কুলে যেয়ো।
৭. নিজের ইচ্ছেমতো চললে তোমাকে চাকরি ছাড়তে হবে।

. ‘মতো’ শব্দটি যদি সাদৃশ্য, তুল্য, যোগ্য অর্থে ব্যবহৃত হয় তাহলে তা আলাদাভাবে বসবে।
দৃষ্টান্ত :
১. মানুষের মতো মানুষ হওয়ার চেষ্টা করো।
২. আমার মতো সুখী আর কেউ নেই।
৩. জীবনানন্দ দাশের মতো প্রকৃতিপ্রেমী কবি আর জন্মাবে কি না সন্দেহ।
৪. ছেলেটা তার বাবার মতো হয়েছে।
৫. আমি তোমার মতো আত্মভোলা মানুষ আর দেখিনি।

ও-এর বিচিত্র ব্যবহার

বিভিন্ন রূপে বাক্যে ব্যবহৃত হতে পারে।
ও-এর যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে বাক্যকে সহজবোধ্য করে তোলা যায়। চলুন জেনে নিই ও-এর যথাযথ ব্যবহার।

সর্বনাম হিসেবে—সর্বনাম হিসেবে প্রায়ই ব্যবহৃত হতে দেখা যায়।
দৃষ্টান্ত :
১. ও আজ আমার সঙ্গে বাজারে যাবে।
২. ওকে আসতে বোলো।
৩. ওঁকে আমি অনেক সম্মান করি।

সংযোজক অব্যয় হিসেবে—দুটি পদের সংযোগ ঘটাতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়।
দৃষ্টান্ত :
১. রঞ্জিত ও সঞ্জিত দুই ভাই।
২. ঢাকা ও চট্টগ্রাম বাংলাদেশের দুটি গুরুত্বপূর্ণ শহর।
৩. ডাল ও মাংস আমার সবচেয়ে পছন্দের খাবার।

অধিকন্তু অর্থে বা জোর প্রকাশে—বাক্যের অর্থে জোর দিতে বা অধিকন্তু বোঝাতে ব্যবহৃত হয় এবং সেটা আগের শব্দের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বসে।
দৃষ্টান্ত :
১. আমিও তোমার সঙ্গে যাব।
২. সে আজকেও বিদ্যালয়ে আসেনি।
৩. আমি জীবনেও তোমার কথা ভুলব না।
৪. আমাকে আরও কিছু টাকা দাও।
৫. অনেক খুঁজেও তোমার দেখা পাইনি।

ও/এবং-এর ব্যবহার

ও বা এবং হচ্ছে বহুল ব্যবহৃত দুটি সংযোজক অব্যয়। শব্দ দুটি একই অর্থে ব্যবহৃত হলেও প্রয়োগে পার্থক্য রয়েছে। প্রায়োগিক দিক দিয়ে শব্দ দুটি একে অন্যের পরিপূরক নয়। চলুন জেনে নিই শব্দ দুটির যথাযথ ব্যবহার।

—সাধারণত দুটি পদকে সংযুক্ত করতে ব্যবহৃত হয়।
এজন্য দুটি পদের মাঝে ব্যবহৃত হবে।
দৃষ্টান্ত :
১. রহিম ও করিম খুব ভালো ছেলে।
২. আম ও কাঁঠাল আমার পছন্দের ফল।
৩. সিদ্ধার্থ শুদ্ধ বাংলা বলতে ও লিখতে পারে।
৪. ঝুমুরের বাবা ঝুমুরকে মেলা থেকে মন্ডা ও বেলুন কিনে দিয়েছিলেন।

এবং—সাধারণত দুটি বাক্য বা বাক্যাংশের সংযোগ ঘটাতে এবং ব্যবহৃত হয়।
দৃষ্টান্ত :
১. আমি আগামীকাল ঢাকায় যাব এবং সিজানের সঙ্গে দেখা করব।
২. রাফিদা ও রিহান আগামীকাল দেখা করবে এবং তাদের বিয়ের ব্যাপারে আলোচনা করবে।
৩. রনি ও জনির চেহারায় অনেক মিল এবং তাদের রুচিতেও অনেক মিল আছে।
৪. আম্ফানের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের অনেক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং অনেকে ঘরছাড়াও হয়েছিল।

‘ইদ’ অর্থ কি ঋতুস্রাব? | ইদ নিয়ে চলমান বিতর্ক

‘ইদ’ বানানটি নিয়ে সম্প্রতি বেশ বিতর্ক চলছে। কিছুদিন আগে এটা নিয়ে কয়েকটি পোস্ট আমার চোখে পড়েছে।
কয়েকজনের পোস্টে লেখা দেখলাম যে, খুশি বা ধর্মীয় উৎসব অর্থে ইদ শব্দটি ব্যবহার করা যাবে না। তাদের যুক্তি অনুযায়ী ইদ নাকি একটি খারাপ বিষয় নির্দেশ করে। তাদের মতে ইদ শব্দের অর্থ নারীদের মাসিক বা ঋতুস্রাব।

আসলেই কি তাই? প্রকৃতপক্ষে ইদ শব্দের অর্থ মাসিক বা ঋতুস্রাব নয়। আরবি ইদ্দত (عدة) শব্দের অর্থ ঋতুস্রাবকাল গণনা। ইদ্দত শব্দের আরও অর্থ আছে। যেমন—দিন, সংখ্যা। ইসলামে বহুল ব্যবহৃত ইদ্দতের অর্থ হচ্ছে ‘তালাক বা স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে পুনরায় বিয়ের উপযুক্ত হওয়া (শরিয়ত মোতাবেক) পর্যন্ত সময়কাল, যেটা স্ত্রীকে পালন করতে হয়।

কিছু ব্যক্তির ধারণা ইদ্দত শব্দের মধ্যে ইদ শব্দের সব বর্ণ আছে, এজন্য দুটোর অর্থ একই। একটা শব্দের মধ্যে আরেকটা শব্দের সকল বর্ণের অস্তিত্ব থাকলে যে দুটোর অর্থ একই হবে এটা চিন্তা করা অযৌক্তিক।

নিচের শব্দগুলো একটু লক্ষ করুন :
আল, আলু
কল, কলপ
চুল, চুলো
মন, মন্বন্তর
ঘর, ঘোরা
বার, বার্তা
নিদ, নিদারুণ
কর, করুণ

ওপরের শব্দজোড়াগুলোতে কিন্তু দ্বিতীয় শব্দটির মধ্যে প্রথম শব্দের উপস্থিতি বিদ্যমান। কিন্তু তারপরেও দুটি শব্দের মধ্যে অর্থের ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। তাহলে ইদ্দত শব্দের মধ্যে ইদ শব্দের সকল বর্ণ থাকলে যে দুটো শব্দের একই অর্থ হবে সেটা নিতান্তই অবাস্তব। ইদ শব্দের অর্থ ঋতুস্রাব নয়।

উপরন্তু সব আরবি শব্দকে অবিকৃত উচ্চারণে বাংলায় লেখা সম্ভব নয় তার কারণ—বাংলা ধ্বনির উচ্চারণরীতি ও আরবি ধ্বনির উচ্চারণরীতি আলাদা। বাংলা ধ্বনিতত্ত্ব অনুযায়ী হ্রস্ব ই ও দীর্ঘ ঈ স্বরের উচ্চারণ একই। যারা বাংলা ধ্বনিতত্ত্ব বিস্তারিত পড়েছেন তারা এটা নিশ্চয়ই জানেন। বাংলা ধ্বনিতত্ত্ব অনুযায়ী ইদঈদ—এই দুইয়ের উচ্চারণে কোনো পার্থক্য নেই।

দ্রষ্টব্য—তবে আপনি ‘ইদ’ লিখবেন নাকি ঈদ লিখবেন সেটা নিতান্তই আপনার ইচ্ছে।

দিক ও দিগ-এর ব্যবহার

দিকদিক হচ্ছে সমাস ও সন্ধিতে ক, খ, চ, ছ, ত, থ, প, ফ, শ, ষ, স ইত্যাদি বর্ণের আগে ব্যবহৃত দিগ-এর আরেক রূপ।
উপরিউক্ত যে-কোনো বর্ণের আগে দিগ-এর পরিবর্তে দিক বসবে। যেমন—
১. দিক্+চক্র = দিকচক্র
২. দিক্+পাল = দিকপাল
৩. দিক্+শূল = দিকশূল

দিগদিগ হচ্ছে সমাস ও সন্ধিতে গ, ঘ, ঙ, জ, ঝ, ড, ঢ, দ, ধ, ন, ব, ভ, ম, য, য়, র, ল, হ ইত্যাদি বর্ণের আগে ব্যবহৃত দিক-এর রূপ।
উপরিউক্ত যে-কোনো বর্ণের আগে দিক-এর স্থানে দিগ বসবে।
যেমন—
১. দিক্+অন্ত = দিগন্ত
২. দিক্+অন্তর = দিগন্তর
৩. দিক্+অম্বর = দিগম্বর
৪. দিক্+গজ = দিগ্‌গজ
৫. দিক্+দর্শন = দিগ্‌দর্শন
৬. দিক্+দিগন্ত = দিগ্‌দিগন্ত
৭. দিক্+বিদিক = দিগ্‌বিদিক
৮. দিক্+ভ্রম = দিগ্‌ভ্রম

দ্রষ্টব্যক. সন্ধিতে ঙ, ঞ, ণ, ন, ম ধ্বনি পরে থাকলে আগের অঘোষ অল্পপ্রাণ স্পর্শধ্বনি সেই বর্গীয় নাসিক্যধ্বনি হয়।
যেমন—
১. দিক্+নির্ণয় = দিঙ্‌নির্ণয়
২. দিক্+নাগ = দিঙ্‌নাগ

খ. স্বরধ্বনি থাকলেও দ্বিতীয় নিয়ম প্রযোজ্য হবে।

মধ্যে ও মাঝে-এর পার্থক্য

মধ্যে ও মাঝে শব্দ দুটি প্রায় একই অর্থ প্রকাশ করে। কিছু ক্ষেত্রে একটিকে অপরটির পরিপূরক হিসেবে ব্যবহার করা গেলেও সবখানেই মধ্যে ও মাঝে একে অন্যের পরিপূরক নয়।

মধ্যে—অভ্যন্তর বা দুটির তুলনায় সাধারণত মধ্যে শব্দটি ব্যবহৃত হয়। যেমন—
১. সে চুপিচুপি ঘরের মধ্যে প্রবেশ করল।
২. দুইমাসের মধ্যে কাজটি শেষ কোরো।

মাঝে—কেন্দ্রবিন্দু বা সময়কাল বোঝাতে সাধারণত মাঝে শব্দটি ব্যবহৃত হয়। যেমন—
১. মাঝে মাঝে সে গ্রামে বেড়াতে আসে।
২. সে মরুভূমির মাঝে পানির জন্য দৌড়াতে লাগল।
৩. এখন সে সুখে আছে, মাঝে তো কারাগারেও ছিল।

দ্রষ্টব্য—মাঝে মাঝে’র পরিবর্তে ‘মাঝে মধ্যে’ও ব্যবহার করা যায়।

কিছু ক্ষেত্রে উভয় শব্দই ব্যবহার করা যায়। যেমন—
১. ওদের মধ্যে/মাঝে রাতুলই বুদ্ধিমান।
২. তাঁর মধ্যে/মাঝে বিশেষ কিছু আছে যা আমাকে আকৃষ্ট করে।

উপসর্গ কাকে বলে, কত প্রকার ও কী কী?

উপসর্গ হচ্ছে অব্যয়সূচক শব্দাংশ বা ধ্বনি যা অন্য শব্দের আগে যুক্ত হয়ে নতুন অর্থবোধক শব্দ গঠন করে। উপসর্গ নিজে স্বাধীন শব্দ বা পদ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে না—অন্য শব্দের সঙ্গে যুক্ত হয়। উপসর্গের অর্থবাচকতা নেই কিন্তু অর্থদ্যোতকতা আছে

১. বাংলা উপসর্গ : বাংলা ভাষার নিজস্ব (খাঁটি বাংলা) উপসর্গ মোট ২১ টি।

নামঅর্থদ্যোতনাউদাহরণ
নয়, মন্দতাঅকাজ, অমিল, অসীম
অঘাবোকাঅঘামার্কা, অঘারাম, অঘাচণ্ডী
অজনিতান্ত (মন্দ)অজমূর্খ, অজপুকুর, অজপাড়াগাঁ
অনামন্দতা, অভাব, অদ্ভুত অনাবৃষ্টি, অনাসৃষ্টি, অনামুখো
আড়বাঁকা, প্রায়আড়পাগলা, আড়চোখা, আড়মোড়া
আননয়, বিক্ষিপ্ত আনকোরা, আনচান, আনমনা
আবঅস্পষ্টতাআবছায়া, আবডাল,
ইতিএ বা এর, পুরাতন ইতিকর্তব্য, ইতিকথা, ইতিহাস
উনকমউনপাঁজুরে, উনপঞ্চাশ
কুমন্দতাকুনজর, কুমতলব, কুখ্যাত, কুদৃষ্টি
নিনেই, নেতিবাচক নিখুঁত, নিখাদ
পাতিক্ষুদ্রপাতিলেবু, পাতিহাঁস, পাতিনেতা
ভরপূর্ণভরপেট, ভরদুপুর
রামবড়ো, উৎকৃষ্ট রামছাগল, রামদা
সাউৎকৃষ্টসাজোয়া
হাঅভাবহাঘরে, হাপিত্যেশ, হাভাতে
অভাব, বাজে, নিকৃষ্ট আধোয়া, আগাছা, আকাল
কদ্নিকৃষ্ট কদাচার, কদাকার, কদর্য
বিনেই, নিন্দনীয় বিপথ, বিকল, বিফল
সঙ্গে, অতিশয়সরব, সঠিক, সজোর, সপরিবার
সুভালো, উৎকৃষ্ট সুখবর, সুদিন, সুপাঠ্য

২. সংস্কৃত উপসর্গ : সংস্কৃত থেকে বাংলায় এসেছে এমন উপসর্গ মোট ২০ টি।

নামঅর্থদ্যোতনাউদাহরণ
প্রপ্রকৃষ্ট, সম্যক, আধিক্য, খ্যাতিপ্রচলন, প্রদান, প্রভাব, প্রতাপ, প্রগাঢ় , প্রস্থান
পরাবিপরীত, আতিশয্য পরাভব, পরাজয়, পরাশক্তি, পরাভূত
অপবিপরীত, অপকর্ষ, দূরীকরণ অপচয়, অপমান, অপকার, অপসারণ
সম্সন্নিবেশ, সম্যক, অভিমুখী, আতিশয্য সংগঠন, সংকলন, সঞ্চয়, সমাদর, সমর্থন
নিআধিক্য, পুরোপুরি, নিচে নিপীড়ন, নিদারুণ, নিশ্চুপ, নিস্তব্ধ, নিবিষ্ট, নিপাত, নিক্ষেপ
অবনিম্নমুখিতা, মন্দ, সম্যকঅবরোধ, অবতরণ, অবগাহন, অবনতি, অবজ্ঞা, অবক্ষয়
অনুপরে, নিরন্তরতা, অভিমুখী, সাদৃশ্য অনুতাপ, অনুশোচনা, অনুগামী, অনুসরণ, অনুকূল, অনুলিপি
নিঃঅভাব, বিশেষভাবে, বহির্মুখিতা নিরক্ষর, নিরপরাধ, নিরহংকার, নিষ্পন্ন
দুঃমন্দ, অভাব, কঠিন, আধিক্য দুঃসাহস, দুর্দান্ত, দুর্দমনীয়, দুর্নীতি, দুস্তর, দুষ্কর্ম
বিসম্যক, বিপরীত, ভিন্ন, অভাব বিফল, বিকর্ষণ, বিবর্ণ, বিশৃঙ্খল, বিকার, বিজ্ঞান
অধিপ্রধান, মধ্যে অধিপতি, অধিনায়ক, অধিকার, অধিষ্ঠিত
সুভালো, সহজ, আতিশয্য সুগন্ধ, সুগঠিত, সুমতি, সুনাম, সুতীব্র
উৎওপরের দিক, অপকর্ষ, আতিশয্য উল্লিখিত, উন্নতি, উদ্‌বোধন
পরিচতুর্দিক, সম্পূর্ণ পরিভ্রমণ, পরিক্রমা, পরিতৃপ্ত, পরিত্যক্ত
প্রতিবিপরীত, সাদৃশ্য, পৌনঃপুনিকতা প্রতিপক্ষ, প্রতিরক্ষা, প্রতিদিন, প্রতিচ্ছবি, প্রতিদান
উপনিকট, অপ্রধান, সম্যক উপকূল, উপকণ্ঠ, উপভাষা, উপভোগ, উপাচার্য, উপবন
পর্যন্ত, ঈষৎ আকণ্ঠ, আমরণ, আনত, আরক্ত
অভিসম্যক, গমনঅভিব্যক্তি, অভিযান, অভিসার
অপিব্যাকরণের সূত্রঅপিনিহিতি
অতিআতিশয্য, অতিক্রম অতিশয়, অতিমানব, অতিপ্রাকৃত

৩. ফারসি উপসর্গ : বাংলায় বহুল ব্যবহৃত ফারসি উপসর্গগুলো হলো :

নামঅর্থদ্যোতনাউদাহরণ
কারকাজকারবার, কারখানা, কারসাজি
খোশআনন্দদায়কখোশগল্প, খোশমেজাজ
দরকম, নিম্নস্থদরকাঁচা, দরদালান, দরপাট্টা
নানয়নারাজ, নাচার, নাবালক, নাহক
নিমঅর্ধ বা প্রায় নিমরাজি, নিমখুন
ফিপ্রত্যেকফি-বছর, ফি-হপ্তা
সহ বা সঙ্গে বকলম, বমাল
বদমন্দ, উগ্রবদমেজাজ, বদনাম, বদনসিব, বদমায়েশ, বদভ্যাস
বেনেই, খারাপ, ভিন্ন বেআক্কেল, বেহুঁশ, বেশরম, বেতার, বেকার

৪. আরবি উপসর্গ : বাংলায় বহুল ব্যবহৃত আরবি উপসর্গগুলো হলো :

নামঅর্থদ্যোতনাউদাহরণ
আমসর্বসাধারণআমজনতা, আমদরবার, আমরাস্তা
খাসব্যক্তিগতখাসকামরা, খাসমহল, খাসদখল
লানা, নেই লাপাত্তা, লাখেরাজ, লাওয়ারিশ
গরনেই, ভুল গরমিল, গররাজি, গরহাজির

৫. ইংরেজি উপসর্গ : বাংলায় বহুল ব্যবহৃত ইংরেজি উপসর্গগুলো হলো :

নামঅর্থদ্যোতনাউদাহরণ
ফুলপুরোফুলপ্যান্ট, ফুলমোজা
হাফঅর্ধেকহাফটিকিট, হাফপ্যান্ট
হেডপ্রধান হেডমাস্টার, হেডপণ্ডিত
সাবঅধীন, অপ্রধান সাব-রেজিস্ট্রার, সাব-অর্ডিনেট, সাব-অফিস, সাব-জোনাল

৬. উর্দু ও হিন্দি উপসর্গ : বাংলায় ব্যবহৃত হিন্দি ও উর্দু উপসর্গ ১ টি।

নামঅর্থদ্যোতনাউদাহরণ
হরপ্রত্যেক, বিভিন্ন হররোজ, হরকিসিম, হরহামেশা

ল্লিখিত উদ্‌বোধন দুটি বহুল ব্যবহৃত উপসর্গযুক্ত শব্দ যা আমরা ভুুল করি।

দূ ও দু-এর ব্যবহার

দ-য়ে দীর্ঘ ঊ-কারযুক্ত শব্দের বানান ভুল না করলেও দ-য়ে হ্রস্ব উ-কারযুক্ত শব্দের বানান আমরা প্রায়ই ভুল করি। চলুন জেনে নিই এই ভুল থেকে বাঁচার একটি সহজ উপায়।

দূ—দূরত্ব বোঝায় এমন সকল শব্দে দ বর্ণের সাথে দীর্ঘ ঊ-কার যুক্ত হবে। যেমন—দূর, দূরত্ব, দূরবর্তী, দূরবীক্ষণ, দূরপাল্লা, দূরদৃষ্টি, দূরদর্শী। ব্যতিক্রম—দুরবিন।

দু—দু বা দুঃ হচ্ছে উপসর্গ। দু বা দুঃ দ্বারা মন্দ ও কষ্টসাধ্য বিষয় নির্দেশ করে। যেমন—দুর্দান্ত, দুর্দিন, দুর্বিপাক, দুর্বোধ্য, দুর্বল, দুর্দমনীয়, দুর্যোগ, দুর্নীতি, দুর্ঘটনা, দুঃখ, দুর্বিষহ, দুর্বিনীত, দুঃসাধ্য, দুঃসহ, দুঃস্বপ্ন, দুরবস্থা, দুরাত্মা, দুঃসময়, দুরারোগ্য, দুরাশা, দুরাচার, দুর্ধর্ষ, দুর্গন্ধ, দুর্গম, দুর্দশা, দুর্নাম, দুর্ব্যবহার, দুর্ভিক্ষ, দুর্ভোগ, দুশ্চিন্তা, দুস্থ, দুষ্প্রাপ্য।

ম-ফলার উচ্চারণ

১. পদের প্রথমে ম-ফলা থাকলে সে বর্ণের উচ্চারণে কিছুটা ঝোঁক পড়ে এবং সামান্য নাসিক্যস্বর হয়। যেমন—
শ্মশান (শঁশান্), স্মরণ (শঁরোন্)।

কখনো কখনো ম-ফলা অনুচ্চারিত থাকতেও পারে। যেমন—স্মৃতি (সৃঁতি)।

২. পদের মধ্যে বা শেষে ম-ফলা যুক্ত হলে উচ্চারণে সে বর্ণের দ্বিত্ব হয় এবং সামান্য নাসিক্যস্বর হয়। যেমন—আত্মীয় (আত্‌তিঁয়ো), পদ্ম (পদ্‌দোঁ), বিস্ময় (বিশ্‌শঁয়), ভস্ম (ভশ্‌শোঁ), রশ্মি (রোশ্‌শিঁ)।

৩. গ, ঙ, ট, ণ, ন বা ল বর্ণের সঙ্গে ম-ফলা যুক্ত হলে ম-এর উচ্চারণ বজায় থাকে। যুক্ত ব্যঞ্জনের প্রথম বর্ণের স্বর লুপ্ত হয়। যেমন—বাগ্মী (বাগ্‌মি), মৃন্ময় (মৃন্‌ময়), জন্ম (জন্‌মো), গুল্ম (গুল্‌মো), যুগ্ম (জুগ্‌মো)।

ঋ, ঐ, ও-ধ্বনির উচ্চারণ

ঋ ধ্বনির উচ্চারণ : স্বাধীনভাবে ব্যবহৃত হলেও ঋ ধ্বনির উচ্চারণ রি বা রী-এর মতো হয়। ঋ ধ্বনি ব্যঞ্জনধ্বনির সাথে যুক্ত হয়ে ব্যবহৃত হলে তা র-ফলা+ই-কার (্রি)-এর মতো হয়। যেমন—ঋতু, ঋণ, মাতৃ, ভ্রাতৃপ্রেমী, বৃষ্টি, দৃষ্টি।

ঐ ধ্বনির উচ্চারণ : ঐ ধ্বনিটি একটি যৌগিক স্বরধ্বনি। ও+ই কিংবা অ+ই ধ্বনি মিলিত হয়ে ঐ ধ্বনি গঠন করে।
যেমন—ক্+অ+ই= কই, ব্+অ+ই+ধ= বৈধ। এরকম—বৈদগ্ধ, বৈশাখ, বৈঠক, ঐকমত্য।

ও ধ্বনির উচ্চারণ : বাংলা একাক্ষর শব্দের ও-কার দীর্ঘ হয়। যেমন—গোরু, জোর, ভোর, রোগ, বোন, কোন।
অন্যত্র সাধারণত হ্রস্ব স্বর হয়। যেমন—সোনা, কারো। ও-এর উচ্চারণ ইংরেজি বোট (boat), গোট (goat) শব্দের (oa)-এর মতো।

পুরুষ কাকে বলে, কত প্রকার ও কী কী?

পক্ষ বা পুরুষের দ্বারা বক্তা, বক্তার সামনে উপস্থিত শ্রোতা ও যার কথা বলা হচ্ছে এমন অনুপস্থিত সত্তা নির্দেশ করা হয়। পুরুষের ওপর ক্রিয়ার রূপ নির্ভরশীল (দৃষ্টান্ত দেওয়া আছে)।
ব্যাকরণের ক্ষেত্রে পক্ষ বা পুরুষ তিন প্রকার :

উত্তম পুরুষ

উত্তম পুরুষ বক্তা বা তার সমগোত্রীয়কে নির্দেশ করে। যেমন—আমি, আমরা, আমাকে আমাদের ইত্যাদি।
ক্রিয়ার প্রয়োগ :
১. আমি তোমাকে কথাটা জানাব।
২. আমরা কাজটা করব।
৩. আমরাই তাকে সাহায্য করেছি।

মধ্যম পুরুষ

যাকে উদ্দেশ্য করে কথা বলা হয় তাকে মধ্যম পুরুষ বা শ্রোতাপক্ষ বলে।
শ্রোতাপক্ষ আবার তিন ধরনের :
ক. সাধারণ শ্রোতাপক্ষ : তুমি, তোমরা, তোমার, তোমাদের।
ক্রিয়ার প্রয়োগ :
১. তুমি আবার কবে আসবে?
২. তোমরা আজকে দিনটা থেকে যাও।
৩. আমি তোমাদেরকে পরে খবর দেবো

খ. মানী শ্রোতাপক্ষ : আপনি, আপনারা, আপনার, আপনাদের।
ক্রিয়ার প্রয়োগ :
১. আপনি কি একবার আসতে পারবেন?
২. আপনারা আমাকে একটু সময় দিন।
৩. আপনাদের পরামর্শ মেনেই আমি কাজ করব।

গ. অন্তরঙ্গ শ্রোতাপক্ষ : তুই, তোরা, তোর, তোদের।
ক্রিয়ার প্রয়োগ :
১. তুই একবার আমার সঙ্গে দেখা করিস।
২. তোরা আজ বাড়ি ফিরে যা।
৩. তোর যা দরকার হয় আমার কাছ থেকে চেয়ে নিস।
৪. তোদের বাড়িতে কি পুকুর আছে?

প্রথম/নাম পুরুষ

যার সম্পর্কে কিছু বলা হয় সে-ই  প্রথম/নাম পুরুষ বা অন্যপক্ষ। অন্যপক্ষ আবার দুই ধরনের :
ক. সাধারণ অন্যপক্ষ : সে, তারা, তার, তাদের, এ, এরা, এর, এদের, ও, ওরা, ওর, ওদের।
ক্রিয়ার প্রয়োগ :
১. সে আমাকে খবর দিয়েছিল।
২. তারা আজ ভারতে যাবে।
৩. তার কথা আর বোলো না।
৪. তাদের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে।
৫. এ আমাকে কিছুই করতে পারবে না।
৬. এরা খুব অসহায়।
৭. এর থেকে আমি কিছু আশা করি না।
৮. এদের সঙ্গে থেকে লাভ নেই।
৯. ও খুব ভালো ছেলে।
১০. ওরা আমাকে যথেষ্ট সম্মান করে।
১১. ওর সব খবর আমি জানি।
১২. ওদের দুঃখ দেখে চোখে জল আসে।

খ. মানী অন্যপক্ষ : তিনি, তাঁরা, তাঁর, তাঁদের, এঁ, এঁরা, এঁর, এঁদের, ওঁ, ওঁরা, ওঁর, ওঁদের।
ক্রিয়ার প্রয়োগ :
১. তিনি আমাকে খুব স্নেহ করেন।
২. তাঁরা আমাকে সাহায্য করেছিলেন।
৩. তাঁর কথা আমি শিরোধার্য মানি।
৪. তাঁদের স্নেহ আমাকে মুগ্ধ করে।
৫. এঁ তো যে সে ব্যক্তি নয়।
৬. এঁরা অনেক সম্মাননীয় মানুষ।
৭. এঁর কথা আমি কোনোদিন ভুলব না।
৮. এঁদের নামে মিছে বলাও পাপ।
৯. ওঁ আমাকে অনেক ভালোবাসতেন।
১০. ওঁরা আমাকে খুব যত্ন করেন।
১১. ওঁর কথা আমি না শুনে পারি না।
১২. ওঁদের জ্ঞান কম নয়।

এ ধ্বনির উচ্চারণ

এ ধ্বনির উচ্চারণ দুই ধরনের হয়ে থাকে—১. সংবৃত ২. বিবৃত/স্বাভাবিক।

এ ধ্বনির সংবৃত উচ্চারণ :
১. পদের শেষে সংবৃত হয়। যেমন—মাঠে, ঘাটে, বলে, চলে।

২. তৎসম শব্দের প্রথমে ব্যঞ্জনধ্বনির সাথে যুক্ত ধ্বনির উচ্চারণ সংবৃত হয়। যেমন—দেশ, প্রেম, শেষ।

৩. একাক্ষর সর্বনাম পদের সংবৃত হয়। যেমন— যে, সে, কে।

৪. কিংবা আ-কারবিহীন যুক্তধ্বনি পরে থাকলে সংবৃত হয়। যেমন—দেহ, কেহ, কেষ্ট।

৫. হ্রস্ব ই-কার বা হ্রস্ব উ-কার পরে থাকলে সংবৃত হয়। যেমন—বেশি, বেণু, বেলুন।

এ ধ্বনির বিবৃত উচ্চারণ :
ধ্বনির বিবৃত উচ্চারণ ইংরেজি  হ্যাট (hat), ব্যাট (bat),  ক্যাট (cat)-এর  (a)-এর মতো। যেমন—দেখ (দ্যাখ), একা (অ্যাকা)।

এ ধ্বনির বিবৃত উচ্চারণ শব্দের আদিতেই পাওয়া যায়।
১. দুই অক্ষরবিশিষ্ট সর্বনাম বা অব্যয় পদে। যেমন—এত, হেন, কেন। ব্যতিক্রম—যেথা, সেথা, হেথা।

২. অনুস্বার ও চন্দ্রবিন্দুযুক্ত ধ্বনির আগের এ ধ্বনি বিবৃত হয়। যেমন—স্যাঁতসেঁতে, গেঁজেল।

৩. খাঁটি বাংলা শব্দে। যেমন—তেলাপোকা।

৪. এক, এগারো, তেরো ইত্যাদি সংখ্যাবাচক শব্দ বা এগুলো যুক্ত আছে এমন শব্দে। যেমন—একদিন, একতলা, একঘেয়ে, তেরোনদী।

৫. ক্রিয়াপদের বর্তমান কালের অনুজ্ঞায়, তুচ্ছার্থে ও সাধারণ মধ্যম পুরুষের রূপে। যেমন—দেখ (দ্যাখ), দেখো (দ্যাখো), খেল (খ্যাল), খেলো (খ্যালো)।

স্ত ও স্থ-এর ব্যবহার

অধিকাংশ সময়ই আমরা স্তস্থ যুক্তবর্ণের প্রয়োগ নিয়ে দ্বিধায় পড়ে যাই। এমনকি ভুল এড়ানোর জন্য আমরা বিকল্প শব্দ ব্যবহার করতেও বাধ্য হই। চলুন জেনে নিই স্তস্থ-এর ব্যবহার মনে রাখার একটি সহজ কৌশল।

স্ত—স্ত সেসব শব্দেই বসে যেসব শব্দে স্ত না থাকলে অবশিষ্ট অংশ অর্থবোধক হয় না বা অবশিষ্ট অংশের অর্থের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। যেমন—
অভাবগ্রস্ত, ক্ষতিগ্রস্ত, অভ্যস্ত, ন্যস্ত, আশ্বস্ত, বিধ্বস্ত, বিপর্যস্ত, প্রশস্ত, বিশ্বস্ত, সুবিন্যস্ত, পরাস্ত, সন্ত্রস্ত, স্বস্তি, সমস্ত।

স্থ—যেসব শব্দের স্থ বাদ দিলেও বাকি অংশ অর্থবোধক হয়, সেসব শব্দে সাধারণত স্থ বসে। যেমন—
অন্তঃস্থ, মুখস্থ, কণ্ঠস্থ, গৃহস্থ, দ্বারস্থ, নিকটস্থ, পদস্থ, পরিবারস্থ, অভ্যন্তরস্থ, অপ্রকৃতিস্থ, ভূ-গর্ভস্থ, মনস্থ, গৃহস্থ, সভাস্থ, ঢাকাস্থ।

যতি বা বিরামচিহ্ন ও এর ব্যবহারকৌশল

যতি বা বিরামচিহ্ন লেখার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। যতি বা বিরামচিহ্ন প্রয়োগ করতে সামান্য ভুল করলে বদলে যেতে পারে বাক্যের সম্পূর্ণ অর্থ। চলুন জেনে নেওয়া যাক যতি বা বিরামচিহ্ন কীভাবে ব্যবহার করা উচিত।

কমা—সাধারণত পূর্ণ বাক্যের শেষে কমা বসে। এছাড়া বিভিন্ন জায়গায় কমা বসতে পারে যেমন:—একাধিক শব্দের মাঝে, সম্বোধনের পরে, প্রত্যক্ষ উক্তিতে, তারিখের ক্ষেত্রে বার বা মাসের পরে ও বাক্যের যে-কোনো স্থানে বিরতির প্রয়োজনেও কমা ব্যবহার করা যাবে। কমার ক্ষেত্রে বিরতিকাল ‘১ বলতে যে সময় লাগে’ তার সমান।

দৃষ্টান্ত :
১. যদি বই পড়ো, তাহলে ভালো ফলাফল করবে।
২. বাজার থেকে চাল, ডাল, আলু, পেঁয়াজ নিয়ে এসো।
৩. আসিফ বলল, “আমি আজ অফিসে যাব না।”
৪. রবিবার, ২৩শে মে, ২০২০ খ্রিষ্টাব্দ।
৫. ৪০, গ্রিনরোড, ধানমন্ডি/ধানমণ্ডি, ঢাকা—১২০৫।

দাঁড়ি—বাক্যের শেষে দাঁড়ি বসে। দাঁড়ির ক্ষেত্রে বিরতিকাল ১ সেকেন্ড।
দৃষ্টান্ত :
১. তার মতো সুখী আর কেউ নেই।
২. হাতে কাজ করায় অগৌরব নেই।

সেমিকোলন—একটি বাক্যের সাথে সম্পর্কযুক্ত বাক্য লিখতে সেমিকোলন ব্যবহৃত হবে।
সেমিকোলনের ক্ষেত্রে বিরতিকাল ‘১ বলার দ্বিগুণ সময়’।
দৃষ্টান্ত :
১. সততার মধ্যেই জীবনের সার্থকতা নিহিত; আর তাতে রয়েছে অনাবিল সুখ।
২. কাজ করে যাও; একদিন সফলতা পাবেই।

কোলন—অসম্পূর্ণ শব্দ বা বাক্যের পরে আরেকটি বাক্য যুক্ত করতে হলে কোলন ব্যবহৃত হবে। কোলনের বিকল্প হিসেবে ড্যাশ চিহ্নও লেখা যেতে পারে। কোলনের ক্ষেত্রে বিরতিকাল ১ সেকেন্ড।
দৃষ্টান্ত :
১. রিহানসহ তিন বন্ধু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল : তারা একত্রে ব্যাবসা শুরু করবে।
২. নাম : রাইসা নাসের।

ড্যাশ চিহ্ন—দুটি বা তার অধিক বাক্যের সংযোগ ঘটাতে ড্যাশ চিহ্ন ব্যবহৃত হয়। এছাড়া বিস্তৃতি বা দৃষ্টান্ত প্রয়োগ করতেও ড্যাশ চিহ্ন ব্যবহৃত হয়।
ড্যাশ চিহ্নের ক্ষেত্রে বিরতিকাল ১ সেকেন্ড।
দৃষ্টান্ত :
১. কাজ করলে সম্মান কমে না—সম্মান বাড়ে।
২. আমি চুপিচুপি বেরিয়ে গেলাম—সে আমাকে হাতের ইশারায় ডাকল।

কোলন ড্যাশ—উদাহরণের ক্ষেত্রে অনেকগুলো আলাদা উদাহরণ (শব্দ) এক বাক্যে বসলে কোলন ড্যাশ ব্যবহৃত হয়। তবে বর্তমানে কোলন ড্যাশের ব্যবহার খুুবই কম। কোলন ড্যাশের ক্ষেত্রে বিরতিকাল ১ সেকেন্ড।
দৃষ্টান্ত :
১. বাংলাদেশের মানুষের মৌলিক অধিকার পাঁচটি:—অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা।
২. পদ পাঁচ প্রকার :—বিশেষ্য, বিশেষণ, সর্বনাম, অব্যয় ও ক্রিয়া।

হাইফেন—সমাসবদ্ধ পদের বিভিন্ন অংশকে আলাদাভাবে দেখানোর জন্য হাইফেন ব্যবহৃত হয়। হাইফেনের ক্ষেত্রে বিরতির প্রয়োজন নেই।
দৃষ্টান্ত :
১. আমার মা-বাবা অনেক পরিশ্রমী।
২. তাদের মধ্যে দা-কুমড়া সম্পর্ক।

ইলেক চিহ্ন—কোনো বর্ণের বিলোপের জন্য ইলেক চিহ্ন  ব্যবহৃত হয়। ইলেক চিহ্নের ক্ষেত্রে বিরতির প্রয়োজন নেই।
দৃষ্টান্ত :
১. রিজভান প্রবাচ’র প্রতিষ্ঠাতা।
২. রহিম’র নতুন বাড়িটা বেশ সুন্দর।

জোড়-উদ্ধৃতি চিহ্ন—প্রত্যক্ষ উক্তি বোঝাতে জোড়-উদ্ধৃতি চিহ্ন ব্যবহৃত হয়। জোড়-উদ্ধৃতি চিহ্নের বিরতিকাল ‘১ বলতে যে সময় লাগে’ তার সমতুল্য।
দৃষ্টান্ত :
১. রাজা বললেন, “খাসনবিশের গর্দান নাও।”
২. সাজিদ বলল, “আমি আজ অসুস্থ।”

বন্ধনী চিহ্ন—প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বন্ধনীর মধ্যে প্রথমটি ও দ্বিতীয়টি বাংলায় ব্যবহৃত হয়। সাধারণত এক বা একাধিক শব্দের ব্যাখ্যা প্রদানে প্রথম বন্ধনী ব্যবহৃত হয়।
বাক্যের অর্থ অস্পষ্ট থাকলে তৃতীয় বন্ধনী ব্যবহার করা যায়।
দৃষ্টান্ত :
১. ড. আনিসুজ্জামান (শিক্ষাবিদ) ইন্তেকাল করেছেন।
২. দুর্ঘটনার সময় আমি ছিলাম না [ঘটনাস্থলে]।

বিস্ময়সূচক চিহ্ন—সুগভীর আবেগ বা অনুভূতি প্রকাশের ক্ষেত্রে বিস্ময়সূচক চিহ্ন ব্যবহৃত হয়।
বিস্ময়সূচক চিহ্নের ক্ষেত্রে বিরতিকাল ১ সেকেন্ড।
যেমন—
১. কী অপরূপ দৃশ্য!
২. সে এক আজব দৃশ্য!

প্রশ্নবোধক চিহ্ন—কোনোকিছু জিজ্ঞেস করার ক্ষেত্রে বাক্যের শেষে প্রশ্নবোধক চিহ্ন ব্যবহৃত হয়।
প্রশ্নবোধক চিহ্নের ক্ষেত্রে বিরতিকাল ১ সেকেন্ড।
দৃষ্টান্ত :
১. তুমি কখন এলে?
২. তুমি কি আজ বাজারে যাবে?

এছাড়া আরও কিছু যতিচিহ্ন বর্তমানে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়।
ত্রিবিন্দু—কোনো বাক্য অসমাপ্ত রাখতে ত্রিবিন্দু ব্যবহৃত হয়।
যেমন—
১. মুহূর্তেই ট্রাকটি পাগলটাকে চাপা দিয়ে গেল, তারপর…
২. নিতাই অচেনা পথের দিকে মিলিয়ে যেতে লাগল…

বিকল্প চিহ্ন—দুটির মধ্যে তুলনা বা দুটির মধ্যে একটি গ্রহণযোগ্য হলে বিকল্প চিহ্ন বসে।
দৃষ্টান্ত :
১. আমি ২/৩ মাস ঢাকার বাইরে থাকব।
২. রহিম/করিম যে-কোনো একজন এলেই হবে।

এক উদ্ধৃতি চিহ্ন—বাক্যের কোনো অংশের প্রতি বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণের প্রয়োজন হলে এক উদ্ধৃতি চিহ্ন ব্যবহার করা যায়।
দৃষ্টান্ত :
১. বাংলাদেশে ‘করোনাভাইরাসে’ মৃতের সংখ্যা ২৬০০ ছাড়িয়েছে।
২. আমাদেরকে ‘পড়াশোনার’ বিষয়ে সচেতন থাকা উচিত।

ডট চিহ্ন—কোনোকিছুকে সংক্ষেপ করতে ডট চিহ্ন ব্যবহার করতে হবে।
দৃষ্টান্ত :
১. মো. আসলাম উদ্দীন।
২. ডা. মৃণাল কান্তি।

ধাতুদ্যোতক চিহ্ন—ধাতুকে চিহ্নিত করার জন্য এটা ব্যবহার করা হয়।
দৃষ্টান্ত :
১. বি+আ+ √কৃ+অন = ব্যাকরণ
২. √ভূ+ইন = ভাবী।

সমান চিহ্ন—দুটি বিষয়বস্তু সমতুল্য হলে তাদের মাঝে সমান চিহ্ন বসে।
দৃষ্টান্ত :
. জায়া ও পতি = দম্পতি।
২. মন রূপ মাঝি = মনমাঝি।

উৎপত্তি-নির্দেশক চিহ্ন : কোনো শব্দের উৎপত্তি-নির্দেশক চিহ্ন হিসেবে এই দুটি চিহ্ন ব্যবহৃত হয়।
১. পূর্ববর্তী শব্দ থেকে উৎপন্ন : হস্ত>হাত।
২. পরবর্তী শব্দ থেকে উৎপন্ন : রানি<রাজ্ঞী।

চিহ্নের নামসংকেত
কমা,
দাঁড়ি
সেমিকোলন;
ড্যাশ
কোলন:
কোলনড্যাশ:—
বিস্ময়সূচক চিহ্ন !
প্রশ্নবোধক চিহ্ন ?
জোড়-উদ্ধৃতি চিহ্ন “ ”
এক উদ্ধৃতি চিহ্ন ‘ ’
ইলেক চিহ্ন
বন্ধনী(), {}, []
হাইফেন
ত্রিবিন্দু
বিকল্প চিহ্ন /
ডট চিহ্ন .
সমান=
ধাতুদ্যোতক চিহ্ন
উৎপত্তি-নির্দেশক চিহ্ন >, <
যতিচিহ্নসমূহ

যতি বা বিরামচিহ্ন প্রয়োগে একটু সচেতন হলেই অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ভুল এড়ানো সম্ভব। তাই, ভুল কমাতে আমাদের সচেতনতা একান্ত জরুরি।

যেমনই/যেমনি, তেমনই/তেমনি, এমনই/এমনি

যেমনই—যেমনই শব্দের অর্থ হচ্ছে যেরকমই, যেরূপই।
উপরিউক্ত অর্থে যেমনই লিখতে হবে। যেমন—
১. দেখতে যেমনই হোক, সে তো আমার সন্তান।
২. যেমনই বাবা, তেমনই ছেলে।

যেমনি—যেমনি শব্দের অর্থ হচ্ছে যেইমাত্র, যে মুহূর্তে।
উপরিউক্ত অর্থে যেমনি লিখতে হবে। যেমন—
১. যেমনি পুলিশ এলো, চোরটা দৌড়ে পালিয়ে গেল।
২. যেমনি বজ্রপাত হলো, তেমনি সে আমাকে জড়িয়ে ধরল।

তেমনই—তেমনই শব্দের অর্থ হচ্ছে সেরকমই, উপযুক্ত।
উপরিউক্ত অর্থে তেমনই লিখতে হবে। যেমন—
১. সাহেদ তেমনই লোক, যে করোনার সনদ নিয়ে জালিয়াতি করতেও দ্বিধাবোধ করে না।
২. তেমনই একজন ছেলেকে দেখেছিলাম, যার চোখ নীল রঙের।
৩. রহিম তেমনই লোক, যে একাই অনেক কাজ সামলাতে পারে।

তেমনি—তেমনি শব্দের অর্থ হচ্ছে তৎক্ষণাৎ, সঙ্গে সঙ্গে।
উপরিউক্ত অর্থে তেমনি শব্দটি ব্যবহৃত হবে। যেমন—
১. যেমনি সে এলো, তেমনি সে চলে গেল।
২. আমার কথা শুনে সে তেমনি রেগে উঠল।

এমনই—এমনই শব্দের অর্থ হচ্ছে এরূপই, এরকমই।
উপর্যুক্ত অর্থে এমনই ব্যবহৃত হবে। যেমন—
১. এমনই এক আঁধার রাতে সে এসেছিল।
২. আমরা এমনই একজন কর্মঠ মানুষকে খুঁজছি।

এমনি—এমনি শব্দের অর্থ হচ্ছে উদ্দেশ্য ব্যতীত, বিনা প্রয়োজনে, অকারণে।
উপর্যুক্ত অর্থে এমনি শব্দটি ব্যবহৃত হয়। যেমন—
১. সে আমার কাছে এমনি আসেনি।
২. কোনোকিছু এমনি ঘটে না।

সাতনরি হার

গান, গল্প বা উপন্যাসে আমরা প্রায়ই সাতনরি হার কথাটি পেয়ে থাকি। কিন্তু এর অর্থ আসলে কী?
চলুন জেনে নিই সাতনরি হার কথার অর্থ।

সাতনরি শব্দে সাত মানে ৭ সংখ্যক, আর নরি অর্থ প্যাঁচ।
সাতনরি’র অর্থ করলে দাঁড়ায় সাতপ্যাঁচবিশিষ্ট। 
সুতরাং সাতনরি হার মানে হচ্ছে গলায় পরিধানের সাতপ্যাঁচবিশিষ্ট হার বা অলংকারবিশেষ।

আ, ই, ঈ, উ, ঊ ধ্বনির উচ্চারণ

আ ধ্বনির উচ্চারণ—বাংলায় আ ধ্বনি একটি বিবৃত স্বর। আ ধ্বনির উচ্চারণ হ্রস্ব ও দীর্ঘ উভয়ই হতে পারে। এর উচ্চারণ অনেকটা ইংরেজি ফাদার (father) ও কাম (calm) শব্দের আ (a) এর মতো। যেমন—বাড়ি, আপন, মা, দাতা প্রভৃতি।

বাংলা একাক্ষর শব্দের আ ধ্বনি দীর্ঘ হয়। যেমন—পান, গান, ধান, বান, সাজ, ঢাল, চাঁদ, বাঁশ।

হ্রস্ব ই ও দীর্ঘ ঈ ধ্বনির উচ্চারণ—হ্রস্ব ই ও দীর্ঘ ঈ ধ্বনির উচ্চারণে তেমন কোনো পার্থক্য নেই বললেই চলে। যেমন—আশি, আশী, দিন, দীন, নিচ, নীচ, ধনি, ধনী।

হ্রস্ব উ ও দীর্ঘ ঊ ধ্বনির উচ্চারণ—বাংলায় হ্রস্ব উ ও দীর্ঘ ঊ ধ্বনির উচ্চারণে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। হ্রস্ব ই ও দীর্ঘ ঈ ধ্বনির মতো একাক্ষর শব্দ ও বহু অক্ষর-বিশিষ্ট শব্দের বদ্ধাক্ষরে বা প্রান্তিক যুক্তাক্ষরে উচ্চারণ সামান্য দীর্ঘ হয়। যেমন—ফুল (দীর্ঘ), চুলা (হ্রস্ব), চূত, ভূত, তুফান, তুলতুলে, করুণ, অজু।

অ ধ্বনির উচ্চারণ

ধ্বনির উচ্চারণ সাধারণত দুই ধরনের হয়ে থাকে—১. স্বাভাবিক বা বিবৃত উচ্চারণ। ২. সংবৃত বা ও-ধ্বনির মতো উচ্চারণ।

অ ধ্বনির স্বাভাবিক বা বিবৃত উচ্চারণ :
শব্দের আদিতে :
১. শব্দের আদিতে না-বোধক অর্থে উচ্চারিত হয়। যেমন—অটল, অনাচার।
২. কিংবা -যুক্ত ধ্বনির পূর্ববর্তী ধ্বনি বিবৃত হয়।
যেমন—অমানিশা, কথা।

শব্দের মধ্যে বা অন্তে :
১. পূর্ব স্বরের সাথে মিল রেখে স্বরসংগতির কারণে বিবৃত । যেমন—কলম, বৈধতা, যত।
২. ধ্বনি, ধ্বনি, ধ্বনি এবং ধ্বনির পরবর্তী প্রায়ই বিবৃত হয়। যেমন—তৃণ, দেব, ধৈর্য, নোলক, মৌন।
৩. অনেকসময় ধ্বনির পরের বিবৃত হয়। যেমন—গঠিত, মিত, জনিত প্রভৃতি।

অ ধ্বনির সংবৃত উচ্চারণ :
সংবৃত উচ্চারণে সাধারণত চোয়ালের ফাঁক কম ও গোলাকৃতির হয়ে ধ্বনির মতো উচ্চারিত হয়।
শব্দের আদিতে :
১. পরবর্তী স্বর সংবৃত হলে শব্দের আদি সংবৃত হয়।
যেমন—অতি (ওতি), করুণ (কোরুন্), করে (কোরো অসমাপিকা ক্রিয়ায়, সমাপিকা ক্রিয়ায় করে শব্দের বিবৃত)।
২. পরবর্তী , ইত্যাদির প্রভাবে পূর্ববর্তী র-ফলাযুক্ত সংবৃত হয়। যেমন—প্রতিজ্ঞা (প্রোতিগ্‌গাঁ), প্রচুর (প্রোচুর্)।
তবে , ধ্বনির প্রভাবে পূর্বের বিবৃত হয়। যেমন—প্রভাত, প্রত্যয়, প্রণাম।

শব্দের মধ্যে ও অন্তে :
১. তর, তম, তন প্রত্যয়যুক্ত শব্দের শেষের স্বর সংবৃত হয়। যেমন—প্রিয়তম (প্রিয়োতমো), গুরুতর (গুরুতরো)।
২. , ধ্বনির পরবর্তী মধ্য ও শেষের সংবৃত হয়। যেমন—পিয় (পিয়ো), যাবতীয় (জাবোতিয়ো)।

ইক প্রত্যয়যুক্ত শব্দের নিয়ম

. শব্দের প্রথমে অ ধ্বনি থাকলে তা পরিবর্তিত হয়ে  আ-কার হবে। যেমন—
১. পরিবার+ইক = পারিবারিক
২. অভিধান+ইক = আভিধানিক
৩. সমুদ্র+ইক = সামুদ্রিক
৪. কল্পনা+ইক = কাল্পনিক
৫. অর্থনীতি+ইক = আর্থনীতিক
৬. প্রসঙ্গ+ইক = প্রাসঙ্গিক
৭. সংগঠন+ইক = সাংগঠনিক
৮. সংবাদ+ইক = সাংবাদিক
৯. সংবিধান+ইক = সাংবিধানিক
১০. সপ্তাহ+ইক = সাপ্তাহিক

. শব্দের প্রথমে হ্রস্ব ই-কার, দীর্ঘ ঈ-কার, এ-কার থাকলে তা পরিবর্তিত হয়ে ঐ-কার হয়। যেমন—
১. শিল্প+ইক = শৈল্পিক
২. বিচার+ইক = বৈচারিক
৩. বিজ্ঞান+ইক = বৈজ্ঞানিক
৪. নিসর্গ+ইক = নৈসর্গিক
৫. দিন+ইক = দৈনিক
৬. বিশ্ব+ইক = বৈশ্বিক
৭. নীতি+ইক = নৈতিক
৮. জীব+ইক = জৈবিক
৯. বেতন+ইক = বৈতনিক
১০. লেখা+ইক = লৈখিক
১১. বেতাল+ইক = বৈতালিক
১২. অর্থ+ (নীতি+ইক) = অর্থনৈতিক

. শব্দের প্রথমে হ্রস্ব উ-কার, দীর্ঘ ঊ-কার, ও-কার থাকলে তা পরিবর্তিত হয়ে ঔ বা ঔ-কারে পরিণত হয়। যেমন—
১. উপন্যাস+ইক = ঔপন্যাসিক
২. উপনিবেশ+ইক = ঔপনিবেশিক
৩. মুখ+ইক = মৌখিক
৪. মূল+ইক = মৌলিক
৫. যুক্তি+ইক = যৌক্তিক
৬. ভূত+ইক = ভৌতিক
৭. ভূগোল+ইক = ভৌগোলিক
৮. লোক+ইক = লৌকিক
৯. যোগ+ইক = যৌগিক

গোরু বানানের আদ্যোপান্ত

গত ২/৩ দিনে বাংলাদেশের সবচেয়ে সমালোচিত বিষয় হচ্ছে গোরু বানান। অনেকে ভাবছেন যে গোরু বানানটি সম্প্রতি তৈরি করা হয়েছে। আমার কাছে থাকা অভিধান ঘাঁটাঘাঁটি করে যেটা পেলাম সেটা হচ্ছে সুবলচন্দ্র মিত্র সম্পাদিত আদর্শ বাঙ্গালা অভিধানে (প্রকাশকাল—১৯৩১, পৃষ্ঠা—৫৫৭) ‘গোরু’ বানানটির অস্তিত্ব পাওয়া যায়।

আমার কাছে থাকা নিম্নোক্ত অভিধানগুলোতেও গোরু বানানটির অস্তিত্ব পাওয়া যায়—

১. চলন্তিকা—আধুনিক বঙ্গভাষার অভিধান (প্রকাশকাল—১৯৩৭, পৃষ্ঠা—১৫৯)

২. বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান (প্রকাশকাল—১৯৭৪, পৃষ্ঠা—৩৭৪)

৩. বাংলা একাডেমী সংক্ষিপ্ত বাংলা অভিধান (প্রকাশকাল—১৯৯২, পৃষ্ঠা—১৫৮)

৪. বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান (প্রকাশকাল—২০০০, পৃষ্ঠা—৩৭৪)

৫. বাংলাভাষায় প্রথম অন্ত্যমিল শব্দের অভিধান ‘মিত্রাক্ষর’ (প্রকাশকাল—২০০০, পৃষ্ঠা—১২৯)

৬. যার যা ধর্ম
বাংলা ভাষায় প্রথম ধর্ম অভিধান (প্রকাশকাল—২০০৯, পৃষ্ঠা—১৪৩)

৭. বাংলা একাডেমি বিবর্তনমূলক বাংলা অভিধান (প্রকাশকাল—২০১৩, পৃষ্ঠা—৮৪৪)

৮. বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান (প্রকাশকাল—২০১৬ বা সবশেষ, পৃষ্ঠা—৪১৮)

উপরিউক্ত অভিধানগুলো বিচার-বিশ্লেষণ করে বলা যায় যে গোরু বানানটি আজকের বানান নয়। অনেক আগে থেকেই অভিধানে গোরু বানানটি অন্তর্ভুক্ত ছিল। ২০১৬ সালের সংস্করণে সেটাকে একমাত্র শুদ্ধ বানান হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

দ্রষ্টব্য—১. নাম বিবেচনায় অভিধানের নামের বানান অবিকৃত রাখা হয়েছে। ২. বাংলা একাডেমির জন্ম ১৯৫৫ সালে।

ভারি/ভারী, তৈরি/তৈরী

ভারি—ভারি শব্দের অর্থ হচ্ছে অত্যন্ত, অতিশয়, অত্যধিক। ভারি বাংলা শব্দ এজন্য হ্রস্ব ই-কার বসবে।
অত্যন্ত, অতিশয়, অত্যধিক অর্থে ভারি শব্দটি ব্যবহৃত হবে। যেমন—
১. ছেলেটি ভারি দুষ্টু।
২. তোমার কাজে আমি ভারি খুশি।
৩. শুকনো মাটি ভারি শক্ত।

ভারী—ভারী শব্দের অর্থ হচ্ছে অতিরিক্ত ভারযুক্ত, দায়িত্বপূর্ণ, ভারবাহক। ভার+ইন্ = ভারী। ইন্ প্রত্যয়ান্ত শব্দের শেষে সাধারণত দীর্ঘ ঈ-কার বসে। উপরিউক্ত অর্থে ভারী শব্দটি ব্যবহৃত হবে। যেমন—
১. কাঠের বোঝাটা বেশ ভারী।
২. রহমান সাহেব তাঁর বিশ্বস্তজনকে ভারী কাজের দায়িত্ব দিলেন।
৩. ভারী মাথায় গাঁটরি নিয়ে হেঁটে চলেছে।

তৈরি—তৈরি শব্দের অর্থ হচ্ছে গঠন, প্রস্তুত, যোগ্য, শিক্ষিত।
তৈরি শব্দের উৎপত্তি আরবি তৈয়ার থেকে, এজন্য শব্দটিতে হ্রস্ব ই-কার বসবে। উপরিউক্ত অর্থে তৈরি লিখতে হবে। যেমন—
১. তাড়াতাড়ি তৈরি (তৈরী) হয়ে এসো, এখনই বের হতে হবে।
২. সমাবেশের জন্য মঞ্চ তৈরি (তৈরী) করা হয়েছে।
৩. কাজের সুবিধার্থে প্রধান নির্বাহী ছোটো ছোটো দল তৈরি (তৈরী)করে দিলেন।
৪. রাজিব আমার তৈরি (তৈরী) করা ছাত্র।

দ্রষ্টব্য—আমরা অনেকে প্রস্তুত অর্থে তৈরী লিখে থাকি যেটা একেবারে অশুদ্ধ কেননা বিদেশি ভাষা থেকে উদ্ভূত শব্দে দীর্ঘ ঈ-কার বসে না। তাছাড়া সাম্প্রতিক সংস্করণের অভিধানেও তৈরী শব্দটি পাওয়া যায় না।

বাক্ ও বাগ্-এর পার্থক্য

বাক্—বাক্ হচ্ছে সমাস ও সন্ধিতে ক, খ, চ, ছ, ত, থ, প, ফ, শ, ষ, স ইত্যাদি বর্ণের আগে ব্যবহৃত বাগ্-এর রূপ।

উপরিউক্ত যে-কোনো বর্ণের আগে বাগ্-এর পরিবর্তে বাক্ বসবে।
যেমন—
১. বাক্+কলহ = বাক্‌কলহ
২. বাক্+চাতুরী = বাক্‌‌চাতুরী
৩. বাক্+পতি = বাক্‌পতি= বাক্‌পতি
৪. বাক্‌+বিভূতি = বাক্‌বিভূতি
৫. বাক্‌+শক্তি = বাক্‌শক্তি
৬. বাক্‌+সংযম = বাক্‌সংযম

বাগ্—বাগ্ হচ্ছে সমাস ও সন্ধিতে গ, ঘ, ঙ, জ, ঝ, ড, ঢ, দ, ধ, ন, ব, ভ, ম, য, য়, র, ল, হ ইত্যাদি
বর্ণের আগে ব্যবহৃত বাক্-এর রূপ।

উপরিউক্ত যে-কোনো বর্ণের আগে বাক্-এর স্থানে বাগ্‌ বসবে।
যেমন—
১. বাক্+জাল = বাগ্‌জাল
২. বাক্‌+দত্তা = বাগ্‌দত্তা
৩. বাক্‌+ধারা = বাগ্‌ধারা
৪. বাক্‌+বিতণ্ডা = বাগ্‌বিতণ্ডা
৫. বাক্+বিধি = বাগ্‌বিধি

দ্রষ্টব্য—স্বরধ্বনি থাকলেও শেষের নিয়ম প্রযোজ্য হবে।

লাগে টাকা দেবে গৌরীসেন

কথায় কথায় আমরা অনেকেই ‘গৌরীসেনের টাকা’ কথাটি উল্লেখ করে থাকি। এই কথাটির অবশ্য একটি ইতিহাসও আছে। চলুন জেনে নিই এই কথাটির উৎপত্তি।

সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতকে ভারতের হুগলি অঞ্চলে গৌরীসেন নামে একজন ধনী ব্যবসায়ী বসবাস করতেন। তিনি জাতিধর্ম নির্বিশেষে দায়গ্রস্ত ব্যক্তিকে চাওয়ামাত্র অর্থ দান করতেন।
সেখান থেকেই ‘লাগে টাকা দেবে গৌরীসেন’ কথাটির উৎপত্তি যার অর্থ চাওয়ামাত্রই যে টাকা পাওয়া যায়।

শাহবাগ নামটির উৎপত্তি

ঢাকা শহরের একটি সুপরিচিত ও জনবহুল এলাকা হচ্ছে শাহবাগ। শাহবাগের নাম শোনেনি এমন মানুষ বাংলাদেশে খুব কমই আছে। চলুন জেনে নিই শাহবাগ নামটির উৎপত্তির ইতিহাস। শাহবাগ শব্দটি দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। প্রথমটি ‘শাহ’ অন্যটি ‘বাগ’।
ফারসি ‘শাহ’ শব্দের অর্থ হচ্ছে রাজা বা বাদশাহ আর বাগ শব্দের অর্থ হচ্ছে বাগান বা বাগিচা। শাহবাগ শব্দের অর্থ হচ্ছে রাজার বাগান বা রাজকীয় বাগান। মোগল আমলে ঢাকা বাংলার প্রাদেশিক রাজধানী হওয়ার পর এই এলাকায় মোগলরা একটি দৃষ্টিনন্দন বাগান গড়ে তোলে। মূলত সেখান থেকেই শাহবাগ নামটির উৎপত্তি। কিন্তু কালের বিবর্তনে সে বাগান হারিয়ে গিয়েছে, তার ছিটেফোঁটাও আজ খুঁজে পাওয়া যায় না।

লেখালেখি নাকি লেখালিখি : কোনটি সঠিক ও কেন?

লেখালেখি নাকি লেখালিখি, কোন বানানটি সঠিক সেটা নিয়ে আমাদের দ্বিধা ও তর্কের যেন শেষ নেই। অনেকে মনে করেন যে লেখালিখি শব্দটি চলিত শব্দ নয়।
তাঁদের অভিমত ‘লেখা শব্দের সাথে লিখি যুক্ত করলে সেটা সাধু শব্দে পরিণত হবে’।

এবার নিম্নোক্ত শব্দগুলো লক্ষ করুন—
বোঝাবুঝি, খোঁজাখুঁজি, বলাবলি, মারামারি, ধরাধরি, কাটাকাটি, দেখাদেখি, চাপাচাপি, খোলাখুলি, বকাবকি।

উপরিউক্ত সবগুলো শব্দই চলিত শব্দ। এই ধরনের শব্দে ক্রিয়াপদ সাধারণত উত্তম পুরুষের ক্রিয়াপদ হয়। এসব শব্দের শেষের ধ্বনি বা ক্রিয়াপদ প্রথম শব্দ থেকে উদ্ভূত অর্থাৎ সমধাতুজ। লেখালিখি শব্দে লিখি শব্দটি উত্তম পুরুষের ক্রিয়া।
আমি ও আমরা উত্তম পুরুষের অন্তর্ভুক্ত।
আমি/আমরা লিখি।
আমি/আমরা লেখি

লেখালেখি শব্দটি ভুল। এটি সাধুও নয় আবার চলিতও নয়। লেখি শব্দটি কোনো পুরুষেরই ক্রিয়ার রূপ নয়।
লিখালিখি শব্দটি লেখালিখি শব্দের সাধু রূপ।

লেখালিখি শব্দটি ভুল বা সাধু শব্দ নয়। আপনি নির্দ্বিধায় লেখালিখি শব্দটি চলিত বাক্যে ব্যবহার করতে পারেন। লেখালেখি নাকি লেখালিখি লিখবেন তা নিয়ে আর দুশ্চিন্তা নেই আশা করি।

ণত্ববিধান ও ষত্ববিধান : কখন কোথায় প্রয়োগ করবেন

দেশি, তদ্ভব ও বিদেশি শব্দে ণত্ববিধানের প্রয়োগ নেই। শুধু তৎসম শব্দে ণত্ববিধানের প্রয়োগ রয়েছে। তৎসম শব্দে মূর্ধন্য ণ ব্যবহারের নিয়মকে ণত্ববিধান বলে।

নিয়মসমূহ :
১. ট বর্গীয় (ট, ঠ, ড, ঢ) ধ্বনির আগে তৎসম শব্দে সবসময় মূর্ধন্য ণ বসে।
যেমন—কণ্টক, লুণ্ঠন, মণ্ড, কণ্ঠ, ভণ্ড, মণ্ডূক, মণ্ডলী।

২. তৎসম শব্দে ঋ, র, ষ ধ্বনির পরে মূর্ধন্য ণ বসে। যেমন—ব্যাকরণ, কুঋণ, ভাষণ, কারণ, আহরণ, বর্ণনাতীত, কর্ণ, চূর্ণ।

৩. ঋ, র, ষ বর্ণের পরে স্বরধ্বনি, ‘য়, ব, হ, ং’ এবং ক বর্গীয় (ক, খ, গ, ঘ, ঙ) ও প বর্গীয় (প, ফ, ব, ভ, ম) এক বা একাধিক ধ্বনি থাকলে পরবর্তী দন্ত্য ন মূর্ধন্য ণ হয়ে যায়।
যেমন—কৃপণ, হরিণ, অর্পণ, ব্রাহ্মণ, শ্রাবণ, গ্রামীণ, গ্রহণ, শ্রবণ, নির্বাণ।

দ্রষ্টব্য— সমাসবদ্ধ পদে সাধারণত ণত্ববিধান খাটে না।

দেশি, তদ্ভব ও বিদেশি শব্দে ষত্ববিধানের প্রয়োগ নেই। শুধু তৎসম শব্দে ষত্ববিধানের প্রয়োগ আছে। তৎসম শব্দে মূর্ধন্য ষ ব্যবহারের নিয়মকে ষত্ববিধান বলে।

ষত্ববিধিসমূহ :
১. ঋ বা ঋ-কারের পরে সাধারণত মূর্ধন্য ষ বসে। যেমন—কৃষক, বৃষ্টি, সৃষ্টি, দৃষ্টি, ঋষি, কৃষি,

২. তৎসম শব্দে র ধ্বনি বা রেফের পরে কোথাও কোথাও মূর্ধন্য ষ বসে। যেমন—বর্ষণ, ঘর্ষণ, চিকীর্ষা, বিমর্ষ।

৩. আগে অ, আ ছাড়া অন্য স্বরধ্বনি অর্থাৎ ই, ঈ, উ, ঊ, এ, ও থাকলে তার পরে সাধারণত মূর্ধন্য ষ বসে। যেমন— শিষ্ট, পোষক, ভীষণ, বিষম, পরিষেবা, পরিশিষ্ট, পোষ্য, দোষ, কলুষ, চতুষ্পদ, চতুষ্কোণ।

৪. ক বর্ণের পরে সাধারণত দন্ত্য স না হয়ে মূর্ধন্য ষ হয়। যেমন—রক্ষা, ভিক্ষা, লক্ষ্য, বুভুক্ষা। ক ও ষ ধ্বনি মিলে ক্ষ হয়।

৫. ট ও ঠ ধ্বনির যুক্তবর্ণে সবসময় মূর্ধন্য ষ হবে। যেমন—কষ্ট, নষ্ট, অপুষ্টি, রুষ্ট, অনিষ্ট, নিষ্ঠা।

৬. কিছু শব্দে স্বভাবতই মূর্ধন্য ষ বসে। যেমন—অভিলাষ, আষাঢ়, চাষ, পাষাণ, পৌষ, ষণ্ড, ষষ্ঠ, ষোড়শ।

শৌখিন, অঘ্রাণ, অঘ্রান, ইঙ্গিত, বিরূপ

শৌখিন—বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে শৌখিন  বানানটিকে শুদ্ধ হিসেবে দেখানো হয়েছে। শৌখিন শব্দের উৎপত্তি আরবি শৌকিন থেকে। সৌখিন ভুল বানান।

অঘ্রাণ—অঘ্রাণ শব্দের অর্থ হচ্ছে ঘ্রাণহীন।
ন+ √ঘ্রা+অন = অঘ্রাণ। তৎসম শব্দে ণত্ব বিধান অনুযায়ী র ধ্বনির পরে স্বরধ্বনি থাকলে পরের দন্ত্য ন মূর্ধন্য ণ হয়ে যায়।

অঘ্রান—অঘ্রান হচ্ছে বাংলা পঞ্জিকার অষ্টম মাস।
অঘ্রান শব্দটি অগ্রহায়ণ শব্দের চলিত রূপ। অঘ্রান তদ্ভব শব্দ যার উৎপত্তি সংস্কৃত অগ্রহায়ণ থেকে। তদ্ভব শব্দে ণত্ব বিধান প্রযোজ্য নয়।

ইঙ্গিত—ইঙ্গিত শব্দের অর্থ হচ্ছে সংকেত, ইশারা। √ইন্‌গ্+ত = ইঙ্গিত।
ইঙ্গিত শব্দটি সন্ধির নিয়মে গঠিত নয় বলে ঙ-এর স্থানে অনুস্বার (ং) বসবে না।

বিরূপ—বাংলা একাডেমির অভিধান অনুযায়ী বিরূপ শুদ্ধ বানান। বি+রূপ = বিরূপ। রূপ শব্দের অর্থ হচ্ছে শ্রী, অবস্থা। বিরূপ শব্দের অর্থ হচ্ছে প্রতিকূল, শ্রীহীন, হীন রূপ। আমরা অনেকে প্রতিকূল অর্থে বিরুপ লিখে থাকি যা সঠিক নয়।

অনুস্বার (ং) ও ঙ-এর ব্যবহার

সন্ধিতে ম বর্ণের পরে ক, খ, গ, ঘ, য, র, ল, ব, শ, স, হ ইত্যাদি বর্ণের যে-কোনো একটি বর্ণ থাকলে সন্ধিবদ্ধ শব্দে পূর্বের ম-এর স্থানে সাধারণত অনুস্বার (ং) হয়।
যেমন—
১. সম্+কীর্ণ = সংকীর্ণ
২. সম্+কলন = সংকলন
৩. সম্+কর = সংকর
৪. সম্+কট = সংকট
৫. সম্+গীত = সংগীত
৬. সম্+গঠন = সংগঠন
৭. সম্+গতি = সংগতি
৮. সম্+ঘাত = সংঘাত
৯. সম্+ঘটক = সংঘটক
১০. সম্+ঘর্ষ = সংঘর্ষ
১১. সম্+যম = সংযম
১২. সম্+যুক্ত = সংযুক্ত
১৩. সম্+যোগ = সংযোগ
১৪. সম্+রক্ষণ = সংরক্ষণ
১৫. সম্+শয় = সংশয়
১৬. সম্+হার = সংহার
১৭. সম্+হতি = সংহতি
১৮. সম্+বাদ = সংবাদ
১৯. সম্+সার = সংসার
২০. সম্+লাপ = সংলাপ
২১. অহম্+কার = অহংকার
২২. ভয়ম্+কর = ভয়ংকর

তবে কিছু ক্ষেত্রে ম-এর পরে যে-কোনো বর্গীয় বর্ণ থাকলে ম ধ্বনিটি সেই বর্গের নাসিক্য ধ্বনি হয়।
যেমন—
১. শম্+কা =শঙ্কা
২. সম্+চয় = সঞ্চয়
৩. সম্+তাপ = সন্তাপ

সন্ধিবদ্ধ না হলে ঙ-এর স্থানে অনুস্বার (ং) হবে না।
যেমন—অঙ্ক, অঙ্গ, সঙ্গী, লঙ্ঘন, কঙ্কাল, আতঙ্ক, শৃঙ্খলা, প্রসঙ্গ।

দ্রষ্টব্যবাংলাবাংলাদেশ বানানে অনুস্বার অক্ষুণ্ন থাকবে।

সংগৃহীত, নিরবচ্ছিন্ন, প্রবহমান, বিদ্যুদায়ন, আহ্লাদী

সংগৃহীত—বাংলা একাডেমির অভিধানে সংগৃহীত বানানটিকে স্থান দেওয়া হয়েছে। সম্+ √গ্রহ্+ত = সংগৃহীত। সংগৃহিত বা সংগ্রহিত বানান দুটি শুদ্ধ নয় যা আমরা অনেকেই লিখে থাকি।

নিরবচ্ছিন্ন—আধুনিক বাংলা অভিধানে নিরবচ্ছিন্ন বানানটিকে শুদ্ধ হিসেবে দেখানো হয়েছে। নির্+অবচ্ছিন্ন = নিরবচ্ছিন্ন। নির্+অবিচ্ছিন্ন নয়।

বিদ্যুদায়ন—বাংলা একাডেমির নতুন অভিধানে বিদ্যুদায়ন বানানটিকে শুদ্ধ ও অপ্রচলিত বানান হিসেবে দেখানো হয়েছে। বিদ্যুৎ+আয়ন = বিদ্যুদায়ন। সন্ধিতে ত্ এর পরে স্বরধ্বনি থাকলে পূর্বের ত পরিবর্তিত হয়ে দ হয়ে যায়।

প্রবহমান—পরিবর্তিত বানান অনুযায়ী প্রবহমান শুদ্ধ বানান। প্র+ √বহ্+মান = প্রবহমান। বহমান শব্দের সাথে প্র উপসর্গ যুক্ত হয়ে প্রবহমান শব্দটি গঠিত হয়েছে।

আহ্লাদী—সাম্প্রতিক সংস্করণের অভিধান অনুযায়ী আহ্লাদী শুদ্ধ বানান। আহ্লাদ+ইন্ = আহ্লাদী। ইন্ প্রত্যয়যুক্ত শব্দের শেষে সাধারণত দীর্ঘ ঈ-কার বসে।

আপৎ, বিপৎ, আপদ্, বিপদ

আপৎ, বিপৎ—আপৎ ও বিপৎ হচ্ছে সমাস ও সন্ধিতে ক, খ, চ, ছ, ত, থ, প, ফ, শ, ষ, স ইত্যাদি বর্ণের আগে ব্যবহৃত যথাক্রমে আপদ্ ও বিপদ-এর রূপ।

উপরিউক্ত যে-কোনো বর্ণের আগে আপদ্, বিপদ-এর পরিবর্তে আপৎ, বিপৎ বসবে।
যেমন—
১. আপদ্+কাল = আপৎকাল
২. বিপদ্+সংকেত = বিপৎসংকেত
৩. বিপদ্+সংকুল = বিপৎসংকুল
৪. বিপদ্+সীমা = বিপৎসীমা

আপদ্, বিপদ—আপদ্ ও বিপদ হচ্ছে সমাস ও সন্ধিতে গ, ঘ, ঙ, জ, ঝ, ড, ঢ, দ, ধ, ন, ব, ভ, ম, য, য়, র, ল, হ ইত্যাদি বর্ণের আগে ব্যবহৃত যথাক্রমে আপৎ ও বিপৎ-এর রূপ।

উপরিউক্ত যে-কোনো বর্ণের আগে আপৎ, বিপৎ-এর পরিবর্তে যথাক্রমে আপদ্ ও বিপদ বসবে।
যেমন—
১. আপদ্+গ্রস্ত = আপদগ্রস্ত
২. আপদ্+ধর্ম = আপদধর্ম
৩. বিপদ্+গর্ভ = বিপদগর্ভ
৪. বিপদ্+ভঞ্জন = বিপদভঞ্জন
৫. বিপদ+আপন্ন = বিপদাপন্ন
৬. বিপদ্+গ্রস্ত = বিপদগ্রস্ত

দ্রষ্টব্য —১. সন্ধিতে দ ধ্বনির পরে জ ধ্বনি এলে জ ধ্বনি অক্ষুণ্ন থাকে এবং আগের দ পরিবর্তিত হয়ে জ হয়ে যায়। যেমন—বিপদ্+জনক = বিপজ্জনক। ২. স্বরধ্বনি থাকলেও দ্বিতীয় নিয়ম প্রযোজ্য হবে।

নেই/নিই, দেই/দিই-এর পার্থক্য ও ব্যবহার

অনেক বাক্যেই আমাদেরকে নেই/নিই, দেই/দিই শব্দগুলো ব্যবহার করতে হয়। আসুন জেনে নেওয়া যাক এদের পার্থক্য।

নেওয়া/গ্রহণ অর্থে উত্তম পুরুষের ক্ষেত্রে ‘নিই’ বসবে। আমি  ও আমরা উত্তম পুরুষের অন্তর্ভুক্ত।
যেমন—
◾আমি যখন বরফখণ্ডটি হাতে নিই, তখনই তা গলতে শুরু করে।
◾আমি প্রতিদিন তাকে কোলে নিই।
◾আমরাই প্রথম এই উদ্যোগ নিই।

না-বোধক বা নেতিবাচক অর্থে ‘নেই‘ বসবে। যেমন—
◾আমার আর তিলমাত্র বাঁচার সাধ নেই।
◾চোরটার পালানোর শক্তিটুকুও নেই।

একইরকমভাবে চলিত বাক্যে উত্তম পুরুষে দেওয়া অর্থে ‘দিই’ ব্যবহৃত হবে—দেই নয়। যেমন—
◾যখন তাকে খেলনা দিই, তখন সে দৌড়ে আসে।
◾আমি তাকে সবসময় পরামর্শ দিই।

দ্রষ্টব্য—সাধু বাক্যে প্রদান বা দেওয়া অর্থে ‘দেই’ ব্যবহৃত হয়।

হৃৎ ও হৃদ্-এর পার্থক্য ও ব্যবহার

হৃৎ—হৃৎ হচ্ছে সন্ধি ও সমাসে ক, খ, চ, ছ, ত, থ, প, ফ, শ, ষ, স ইত্যাদি বর্ণের আগে ব্যবহৃত হৃদ্-এর রূপ।

উপরিউক্ত যে-কোনো বর্ণের আগে হৃদ্-এর পরিবর্তে হৃৎ বসবে।
যেমন—
১. হৃদ্+কমল = হৃৎকমল
২. হৃদ্+কম্প = হৃৎকম্প
৩. হৃদ্+ পিণ্ড = হৃৎপিণ্ড
৪. হৃদ্+স্পন্দন = হৃৎস্পন্দন

হৃদ্—হৃদ্ হচ্ছে সন্ধি ও সমাসে গ, ঘ, ঙ, জ, ঝ, ড, ঢ, দ, ধ, ন, ব, ভ, ম, য, য়, র, ল, হ ইত্যাদি বর্ণের আগে ব্যবহৃত হৃৎ-এর রূপ।

উপরিউক্ত যে-কোনো বর্ণের আগে হৃৎ-এর স্থানে হৃদ্ বসবে।
যেমন—
১. হৃদ্+রোগ = হৃদ্‌রোগ
২. হৃদ্+গত = হৃদ্‌গত
৩. হৃদ্+যন্ত্র = হৃদ্‌যন্ত্র

দ্রষ্টব্য—স্বরধ্বনি থাকলেও শেষের নিয়ম প্রযোজ্য হবে।

বেশি, বেশী, ভাবি, ভাবী

বেশি—বেশি শব্দের অর্থ হচ্ছে অধিক, অতিশয়। অধিক, অতিশয় অর্থে ব্যবহৃত বেশি শব্দটি ফারসি শব্দ। বিদেশি শব্দের রীতি অনুযায়ী এই শব্দে হ্রস্ব-ই কার বসবে।
যেমন—
১. শিমুলের বাবা বেশিদিন আগে মারা যায়নি।
২. বেশিরভাগ মানুষই করোনা নিয়ে তেমন সচেতন নয়।

বেশী—বেশী শব্দের অর্থ হচ্ছে বেশধারী। বেশ+ইন্ = বেশী। ইন্ প্রত্যয়ান্ত শব্দের শেষে দীর্ঘ ঈ-কার বসে।
যেমন—
১. ভদ্রবেশী লোকটির আসল রূপ কেউ জানে না।
২. মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র ছদ্মবেশী লোকটিকে প্রাসাদে ডাকলেন।

ভাবি—ভাবি শব্দের অর্থ হচ্ছে ভাইয়ের পত্নী, চিন্তা করি (উত্তম পুরুষে)। ভাবি (ভাইয়ের পত্নী) শব্দের উৎপত্তি সংস্কৃত ভ্রাতৃজায়া থেকে। অতৎসম শব্দ হওয়ার কারণে শব্দটিতে হ্রস্ব ই-কার বসবে।
যেমন—
১. তোমার কথা আমি রোজই ভাবি।
২. শায়লা সম্পর্কে আমার ভাবি হয়।

ভাবী—ভাবী শব্দের অর্থ হচ্ছে ভবিষ্যৎ, অনাগতকাল, ভবিষ্যতে ঘটবে এমন। √ভূ+ইন্ = ভাবী। ইন্ প্রত্যয়ান্ত শব্দের শেষে দীর্ঘ ঈ-কার বসে।
যেমন—
১. সে আমার ভাবী স্ত্রী।
২. তোমার জয় অবশ্যম্ভাবী।
২. ভাবীকালের কথা কে বলতে পারে!

বচন কাকে বলে, কত প্রকার ও কী কী?

বচন অর্থ সংখ্যার ধারণা। এটি ব্যাকরণের এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বচন মূলত বিশেষ্য বা সর্বনামকে নির্দিষ্ট করে। বচন দুই প্রকার—১. একবচন  ২. বহুবচন।

একবচন

একবচন সাধারণত বিশেষ্য বা সর্বনামের একটি সংখ্যা নির্দেশ করে।
দৃষ্টান্ত :
১. মেয়েটি ইশকুলে যায়।
২. চোরটা পালিয়ে গেল।

বহুবচন

বিশেষ্য বা সর্বনামের সংখ্যা দুইয়ের বেশি হলে তাকে বহুবচন বলে।

গণ, বৃন্দ, মণ্ডলী, বর্গ—গণ, বৃন্দ, মণ্ডলী, বর্গ ইত্যাদি শব্দগুলো মানুষের (উন্নত প্রাণিবাচক) বহুবচনে ব্যবহৃত হয়।
দৃষ্টান্ত :
১. জনগণ সরকারের থেকে তাদের প্রাপ্য অধিকার চায়।
২. সভায় গুরুত্বপূর্ণ নেতৃবৃন্দ ভাষণ দেবেন।
৩. একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়নে শিক্ষকমণ্ডলী অনেক ভূমিকা পালন করেন।
৪. অনুষ্ঠানে সমাজের সম্মানিত ব্যক্তিবর্গ হাজির হয়েছেন।

সকল, কুল, সব, সমূহ, গুলো, গুলা, গুলি—সকল, কুল, সব, সমূহ, গুলো, গুলা, গুলি ইত্যাদি শব্দগুলো প্রাণিবাচক ও অপ্রাণিবাচক বহুবচন প্রকাশে ব্যবহৃত হয়।
দৃষ্টান্ত :
১. আমার মাতৃকুলের সবাই আমাকে খুব স্নেহ করেন।
২. পক্ষিকুলের মধ্যে কোকিলের গান সবচেয়ে মিষ্টি।
৩. পণ্যগুলো তার ঠিকানায় পৌঁছে দাও।
৪. মানুষগুলো মাঝে মাঝে পশুর মতো হিংস্র হয়ে যায়!
৫. পর্বতসকলের মধ্যে হিমালয় শ্রেষ্ঠ।
৬. সকল প্রাণীই মরণশীল।
৭. ভাইসব, আমার কথা মন দিয়ে শুনুন।
৮. পাখিসব করে রব।
৯. আমার পাণ্ডুলিপিসমূহ অনাদরে পড়ে আছে।

দ্রষ্টব্যগুলা প্রমিত নিয়মে ব্যবহৃত হয় না।

রা—সাধারণত মানুষের (উন্নত প্রাণিবাচক) বহুবচনে ‘রা’ ব্যবহৃত হয়। তবে মাঝে মাঝে অন্যান্য প্রাণীদের ক্ষেত্রেও ‘রা‘ ব্যবহৃত হতে পারে।
দৃষ্টান্ত :
১. ছাত্ররা গুলির প্রতিবাদে ক্লাস বর্জন করেছে।
২. পাখিরা মুক্ত আকাশে উড়ে বেড়াতে চায়।

মালা, পুঞ্জ, রাজি, রাশি, গুচ্ছ, আবলি, দাম, নিকর, নিচয়—মালা, পুঞ্জ, রাজি, রাশি, গুচ্ছ, আবলি, দাম নিকর, নিচয় ইত্যাদি শব্দগুলো অপ্রাণিবাচক বহুবচন নির্দেশ করে।
দৃষ্টান্ত :
১. বিস্তীর্ণ পর্বতমালা দেখলে প্রাণ জুড়িয়ে যায়।
২. মেঘপুঞ্জ ক্ষণিকের—স্থায়ী নয়।
৩. আকাশের তারকারাজির মোহনীয় রূপ সবার মন কাড়ে।
৪. সে সমুদ্রের বালুরাশিতে গড়াগড়ি দিতে লাগল।
৫. একগুচ্ছ মালা গেঁথেছি তোমার জন্য।
৬. আমি রবীন্দ্রনাথের রচনাবলি সংগ্রহ করেছি।
৭. আঙিনায় কুসুমদাম/কুসুমনিচয় মৌ মৌ করছে।
৮জলে কমলনিকর ফুটে রয়েছে।

পাল, যূথ—পাল ও যূথ শব্দ দুটি জন্তুর বহুবচনে ব্যবহৃত হয়।
দৃষ্টান্ত :
১. গোরুর পাল ঘরে ফিরছে।
২. হস্তিযূথ বন সাবাড় করে দিয়েছে।

কেন নাকি কেনো : কোনটি সঠিক ও কেন ?

কেন নাকি কেনো, কোনটি কোথায় ব্যবহার করতে হবে সেটা নিয়ে বেশ ঝামেলায় পড়তে হয়। এটা সহজে মনে রাখার জন্যে আপনাকে যে-কোনো একটি মনে রাখলেই হবে। চলুন সহজ উপায় জেনে নেওয়া যাক।

বাংলা অ-কারান্ত শব্দের শেষে ‘ও’ উচ্চারিত হলে বাংলা একাডেমির মতে কিছুক্ষেত্রে ও-কার লেখার সুযোগ  রয়েছে।
তবে সব ক্ষেত্রেই ও-কার লেখা উচিত নয়।
উপরিউক্ত শব্দ দুটির ব্যবহারে পার্থক্য রয়েছে।

কেন—কেন শব্দের উচ্চারণ হচ্ছে ‘ক্যানো’।
কেন শব্দের অর্থ হচ্ছে—কীজন্য, কী কারণে, কী হেতু, কী উদ্দেশ্যে।
কারণ, উদ্দেশ্য, হেতু বোঝালেকেন‘ বসবে।
দৃষ্টান্ত : 
১. আবার কেন ফিরে এসেছ?
২. সিজান কেন তোমাকে মারল?
৩. তুমি আজ বিদ্যালয়ে যাওনি কেন?

কেনো—কেনো শব্দের উচ্চারণ হচ্ছে ‘কেনো’।
কেনো শব্দের অর্থ হচ্ছে—ক্রয় করো।
কেনো শব্দটি কেনা/ক্রয়ের অনুজ্ঞা।
তাই ক্রয়ের অনুজ্ঞা অর্থে ‘কেনো‘ বসবে।
দৃষ্টান্ত : 
১. কেদারাটি কেনো; তাতে তোমার বরং লাভই হবে।
২. জীবন বাঁচাতে মাস্ক (মুখাবরণ) কেনো।

কেন নাকি কেনো, কোনটি সঠিক সেটা নিয়ে আর দ্বিধা নেই আশা করি।

সর্বজনীন নাকি সার্বজনীন : কোনটি সঠিক?

সর্বজনীন নাকি সার্বজনীন, কোনটি কোথায় ব্যবহার করতে হবে সেটা নিয়ে বেশ ঝামেলায় পড়তে হয়। এটা সহজে মনে রাখার জন্যে আপনাকে যে-কোনো একটি মনে রাখলেই হবে। চলুন সহজ উপায় জেনে নেওয়া যাক।

সর্বজনীন—সর্বজনীন শব্দের অর্থ হচ্ছে ‘সকলের জন্য হিতকর’, ‘সকলের জন্য প্রযোজ্য’।
সকলের জন্য হিতকর বা সকলের জন্য প্রযোজ্য অর্থে সর্বজনীন শব্দটি ব্যবহৃত হবে।
দৃৃৃষ্টান্ত :
১. ১লা বৈশাখ বাঙালির সর্বজনীন উৎসব।
২. তোমার এই কাজ হবে সমাজের জন্য সর্বজনীন।
৩. এই মুহূর্তে পুনরায় লকডাউন করা দেশের জন্য সর্বজনীন কাজ হবে।

সার্বজনীন—সার্বজনীন শব্দের অর্থ হচ্ছে সকলের মধ্যে প্রবীণ বা শ্রেষ্ঠ। সকলের মধ্যে প্রবীণ বা শ্রেষ্ঠ অর্থে সার্বজনীন শব্দটি ব্যবহৃত হবে।
দৃষ্টান্ত :
১. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন তৎকালীন উপমহাদেশের সার্বজনীন কবি।
২. ড. আনিসুজ্জামানের মতো সার্বজনীন শিক্ষাবিদের মৃত্যু জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।

সর্বজনীন নাকি সার্বজনীন লিখতে হবে তা নিয়ে আর সমস্যা নেই আশা করি। বাংলা একাডেমির মতে এটাই যথাযথ পার্থক্য।

মত নাকি মতো, কোনটি শুদ্ধ ও কেন?

মত নাকি মতো, এই দুইয়ের মধ্যে কোনটি সঠিক সেটা নিয়ে অনেকেই জিজ্ঞেস করেন। একসময় নিম্নোক্ত দুটি অর্থেই ‘মত’ বানানটি ব্যবহৃত হতো। তবে উচ্চারণ ও অর্থগত বিভ্রান্তি এড়াতে বাংলা একাডেমি সামান্য পরিবর্তন এনেছে। তবে বহুকাল আগে থেকে আমরা একটি বানানে অভ্যস্ত বলে নতুন বানানটিকে খুব অপরিচিত মনে হয়। শব্দ দুটি দেখলে যদিও অনেকটা একরকম মনে হয়।
তবে এদের প্রয়োগে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে।
আসুন জেনে নিই এদের প্রয়োগ।

মত—মত শব্দের উচ্চারণ হচ্ছে ‘মত্’।
মত শব্দের অর্থ—অভিমত, সম্মতি, নিজের ভাবনা।
অভিমত, সম্মতি, ভাবনা অর্থে মত শব্দটি ব্যবহৃত হবে।
দৃষ্টান্ত :
১. এ ব্যাপারে তোমার মত কী?
২. এ বিয়েতে তার মত নেই।
৩. সবকিছুতে তার মতের প্রয়োজন নেই।

মতো—মতো শব্দের উচ্চারণ হচ্ছে ‘মতো’।
মতো শব্দের অর্থ—তুল্য, সাদৃশ্য।
তুল্য বা সাদৃশ্য অর্থে মতো শব্দটি ব্যবহৃত হবে।
দৃষ্টান্ত :
১. তার মতো ভালো মানুষ সমাজে নেই।
২. তার মতো হতে যেয়ো না।
৩. ঠিকমতো পড়াশোনা করো।
৪. সময়মতো অনুষ্ঠান হবে।

মত নাকি তো, কোনটি সঠিক সেটা নিয়ে আর দ্বিধা নেই আশা করি।

ঃ (বিসর্গ) /: (কোলন)-এর ব্যবহার

কোলনবিসর্গ দুটি ভিন্ন জিনিস। এ দুটির ব্যবহারও ভিন্ন। কিন্তু প্রতিনিয়ত আমরা কোলন এবং বিসর্গের ভুল ব্যবহার করে চলেছি। আসুন জেনে নেওয়া যাক কোলন ও বিসর্গের ব্যবহার।

কোলন (:) হচ্ছে একটি যতিচিহ্ন, এটি কোনো বর্ণ নয়।
সাধারণত কোনো শব্দ বা বাক্যের অপূর্ণ অংশের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ অংশের সমন্বয় সাধনের জন্য কোলন ব্যবহার করা হয়। কোলন কখনও শব্দের অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হবে না।

প্রয়োগ :
১. নাম : শুভংকর রায়
২. ঠিকানা : দিঘলিয়া
৩. মুঠোফোন নম্বর : ০১৩২৪৫৬…

বিসর্গ (ঃ) হচ্ছে একটি বর্ণ, এটি কোনো যতিচিহ্ন নয়। শব্দের অংশ হিসেবে বিসর্গ ব্যবহার করা হয়। শব্দের বাইরে অন্য কোথাও বিসর্গের ব্যবহার নেই।
১. আন্তঃনগর
২. দুঃসাহসিক
৩. দুঃখিত

ঃ (বিসর্গ) /. (ডট)-এর ব্যবহার

বাংলা ভাষায় ডট (.) ছেদচিহ্ন হিসাবে ব্যবহৃত হয় না।
বাংলায় ডট (.) ব্যবহৃত হয় শব্দকে সংক্ষেপে লিখতে, যদিও ডটকে বাংলা যতিচিহ্ন হিসাবে গণনা করা হয় না।
আমরা শব্দকে সংক্ষেপে লেখার জন্য প্রায়ই বিসর্গ (ঃ) ব্যবহার করে থাকি যেটা একেবারেই ভুল। শব্দকে সংক্ষেপ করতে বিসর্গ ব্যবহারের কোনো নিয়ম নেই।
বাংলায় শব্দকে সংক্ষেপে লেখার জন্য ডট (.) ব্যবহারের বিধান রয়েছে।

প্রয়োগ
◾মো. (যদিও আমরা অনেকে সনদে থাকার কারণে ‘মোঃ’ ব্যবহার করে আসছি)= মোহাম্মদ
◾বি. দ্র. = বিশেষ দ্রষ্টব্য
◾ডা. = ডাক্তার (চিকিৎসক)
◾ড. = ডক্টর (পিএইচডি ডিগ্রিধারী ব্যক্তি)

শুধু শব্দে বিসর্গ ব্যবহৃত হবে যেমন—ইতঃপূর্বে, অন্তঃসত্ত্বা, অন্তঃস্থ।

পরা নাকি পড়া, কোনটি শুদ্ধ ও কেন?

পরা নাকি পড়া, কোনটা কোথায় লিখতে হবে সেটা নিয়ে অধিকাংশ মানুষই সচেতন নন। প্রায়ই অনেককে লিখতে দেখি ‘অনেকদিন পর আজ শাড়ি পড়লাম’, ‘আমি রাস্তায় পরে গিয়েছি’। কিন্তু একবার ভাবুন তো কেউ শাড়ি পড়ে কি না। আবার রাস্তায় কেউ পরে না।
এগুলো যেমন ভুল তেমনই দৃষ্টিকটু। এই ভুলের উৎপত্তি ভুল উচ্চারণ থেকে। আসুন জেনে নিই পরা ও পড়া-এর ব্যবহার।

পরা—পরা শব্দের অর্থ হচ্ছে পরিধান করা অর্থাৎ শরীরের বাইরের অংশে কোনো বস্তু ব্যবহার করা।
দৃষ্টান্ত :
১. শাড়িটি পরে এসো।
২. চশমা পরলে তোমাকে বেশ লাগে।
৩. চুড়ি পরলে তোমাকে তিলোত্তমা লাগে।
৪. আসামিকে বেড়ি পরানো হয়েছে।

পড়া—পড়া শব্দের অর্থ পাঠ করা, পতিত হওয়া, স্মরণ হওয়া, জেগে ওঠা, গোচরীভূত হওয়া।
দৃষ্টান্ত :
১. ইন্দিরা বই পড়ছে।
২. ছেলেটি পা পিছলে পড়ে গেল।
৩. আমি বনলতার প্রেমে পড়লাম।
৪. হঠাৎ বাবার কথা মনে পড়ল।
৫. সে চলে গেল অথচ আমার চোখেই পড়ল না।
৬. ঝড়ে প্রচুর আম পড়েছে।
৭. সাজু খুব বিপদে পড়েছে।
৮. শিয়ালটা ফাঁদে পড়েছে।
৯. চোরটা ধরা পড়েছে।

আবার এটার স্বরে সামান্য পরিবর্তন হলেও অনেকে ভুল করে বসেন। অনেকেই লেখেন যে, ‘আমি তোমার সঙ্গে পড়ে একবার দেখা করব’, কিন্তু পড়ে মানে পড়াশোনা করে  বা পড়ার পরে। পরবর্তীকালে অর্থে পরে শুদ্ধ—পড়ে নয়। পরা নাকি পড়া, কোনটা কোথায় ব্যবহার করবেন সেটা নিয়ে আর সমস্যা নেই আশা করি।

পদাশ্রিত নির্দেশক – টি, টা, খানা, খানি প্রভৃতির ব্যবহার

প্রায় প্রতিটি বাক্যেই আমাদেরকে পদাশ্রিত নির্দেশক ব্যবহার করতে হয়। বহুল ব্যবহৃত পদাশ্রিত নির্দেশকগুলো হচ্ছে—টি, টা, খানা, খানি, টুকু, টুকুন, টাক, পাটি, কেতা, তা, গোটা।

টি, টা—সাধারণত গণনা করা যায় এমন ব্যক্তি বা বস্তুর নির্দেশক হিসেবে টি, টা ব্যবহৃত হয়। তবে অল্প কিছু জায়গায় গণনা-অযোগ্য বস্তুর ক্ষেত্রেও টি, টা ব্যবহৃত হতে পারে।
সাধারণত আদরার্থে ‘টি’ ব্যবহৃত হয়; খুব বেশি প্রিয় না হলে ‘টা’ ব্যবহৃত হয়।
দৃষ্টান্ত :
১. আমার ছেলেটি এত দুষ্টু।
২. ঝাড়ুটা দাও তো।
৩. বাবুকে বলটা দাও।
৪. তোমার ন্যাকামিটা রাখো।
৫. আমায় একটা গান শোনাও।
৬. চোরটাকে বেঁধে রাখো।
৭. এর মধ্যে কোনটি তোমার?
৮. আমার পাখিটা শিস দিতে শিখেছে।
৯. বিন্দুর ছেলেটা ভারি বজ্জাত।
১০. আপাতত পড়াশোনাটা চালিয়ে যাও।

দ্রষ্টব্য—টি, টা সবসময় শব্দের সাথে বসবে; তবে অর্থ বিভ্রান্তির সম্ভাবনা থাকলে টা, টি হাইফেনযোগে বসানো যেতে পারে যেমন—চা-টা দাও। আমরা অনেকেই টি, টা, খানা প্রভৃতি ফাঁকা রেখে লিখি যেটা একেবারেই ঠিক নয়।

খানা—গণনাযোগ্য এবং গণনার অযোগ্য ব্যক্তি বা বস্তুর নির্দেশক হিসেবে ‘খানা’ ব্যবহৃত হয়।
দৃষ্টান্ত :
১. দুখানা পরোটা দাও।
২. ভাবখানা এমন যে ভাজা মাছও উলটে খেতে জানে না।
৩. তিনখানা চিঠি লিখেছিলাম তারে।
৪. আমার দেহখানা বুঝি আর চলে না।

খানি—স্বল্পতা বোঝাতে ‘খানি’ ব্যবহৃত হয়।
দৃষ্টান্ত :
১. একখানি ছোটো খেত আমি একেলা।
২. বৃষ্টি একটুখানি শান্তির পরশ জোগায়।
৩. তোমার একটুখানি হাসি আমার হৃদয় ছুঁয়ে যায়।

টুকু, টুকুন, টাক—এই পদাশ্রিত নির্দেশক তিনটি স্বল্পতা নির্দেশক।
দৃষ্টান্ত :
১. এতটুকু খাবারে সবার হবে না।
২. এতটুকুন বাচ্চার সে কী বুদ্ধি!
৩. পোয়াটাক দুধ দাও।
৪. এতটুকু বুদ্ধি যার নেই, সে ব্যাবসা করবে কীভাবে?

পাটি, কেতা, তা, গোটা—এই চারটি পদাশ্রিত নির্দেশক নির্দিষ্টতা/সম্পূর্ণ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
দৃষ্টান্ত :
১. দুই পাটি জুতা দেখান তো।
২. এই পাঁচ কেতা জমির দাম লক্ষ টাকা।
৩. গোটা পাঁচেক আম নিয়ে এসো।
৪. দুই তা কাগজ দিন।
৫. ৩২ পাটি দাঁত বের করে হাসবে না তো।
৬. গোটা আমটাই সাবাড় করে দিলে!
৭. আরও কুল পাড়ো গোটা ছয়।

ভাল নাকি ভালো, কোনটি শুদ্ধ ও কেন?

ভাল নাকি ভালো? কোনটি সঠিক বানান এটা নিয়ে অনেকের মাঝেই দ্বিধা দেখা যায়। অনেকে জানতেও চান যে, আসলে কোনটি সঠিক। একসময় মূলত ‘ভাল’ বানানটি দিয়ে নিম্নোক্ত দুটি বিষয়ই বোঝানো হতো।
তবে শব্দ দুটির উচ্চারণগত সুবিধা আনতে ও অর্থগত বিভ্রান্তি দূর করতে বাংলা একাডেমি নিম্নোক্ত বিষয় দুটির উচ্চারণ অনুযায়ী আলাদা প্রমিত বানান তৈরি করেছে।

ভাল—ভাল শব্দটির অর্থ হচ্ছে ললাট, ভাগ্য, কপাল। ভাল শব্দের উচ্চারণ দাঁড়ায়—ভাল্, অর্থাৎ এখানে ‘ল’ বর্ণের সঙ্গে কোনো স্বর যুক্ত হচ্ছে না।
কপাল বা ভাগ্য অর্থে ভাল শব্দটি ব্যবহৃত হবে।
দৃষ্টান্ত :
১. তার ভালে কিছুই নেই।
২. এমন ভাল নিয়ে যেন আর কেউ না জন্মায়।

ভালো—ভালো শব্দটির অর্থ হচ্ছে উত্তম, উৎকৃষ্ট, শুভ। ভালো শব্দের উচ্চারণ দাঁড়ায়—ভালো, অর্থাৎ এখানে ‘ভাল’ শব্দের সঙ্গে স্বর যুক্ত হচ্ছে।
উত্তম, উৎকৃষ্ট, শুভ ছাড়াও যে-কোনো ইতিবাচক অর্থে ভালো শব্দটি ব্যবহৃত হবে।
দৃষ্টান্ত :
১. রাহাত বড্ড ভালো ছেলে।
২. মৃণালিনী পড়াশোনায় বেশ ভালো।
৩. আপন-ভালো সকলেই চায়।
৪. তার শারীরিক অবস্থা ভালো না।
৫. এখন তোমার বাড়ি চলে যাওয়াটাই ভালো হবে।
৬. ভালো খাবার সবাই চায়।
৭. ভালোবাসায় হার বলে কিছু নেই।
৮. আমার মন ভালো নেই।
৯. আমার জন্যে কিছু ভালো আম এনো।
১০. সে বেশ ভালো রান্না করে।
১১. তার কপাল বেশ ভালো।
১২. এর মধ্যে তুমি কী ভালোটা দেখলে?
১৩. এত কম টাকায় ভালো জিনিস পাওয়া দুষ্কর।
১৪. ভালো মানুষে এমন কাজ করতে পারে না।
১৫. রিফাত পরীক্ষায় খুব ভালো ফলাফল করেছে।
১৬. একটা ভালো মেয়ে দেখে ছেলেটার বিয়ে দিয়ে দাও।
১৭. ভালো জিনিসের দাম বেশিই হয়।
১৮. রহিম সাহেবের মতো ভালো মানুষ এলাকায় বিরল।
১৯. আমার বাবা অনেক ভালো মনের মানুষ।

দুটি অর্থে একই বানান, অর্থাৎ ‘ভাল’ লিখলে কিছু কিছু জায়গায় অর্থবিভ্রান্তির সম্ভাবনা থাকে—আর পাঠক আপনার লেখার প্রকৃত অর্থ উদ্ধারে ব্যর্থ হতে পারে। এমনকি আমি নিজেও মাঝে মাঝে এমন লেখা পড়ে থমকে যাই যে, আসলে লেখক কী বোঝাতে চাচ্ছেন।
তাই লেখাকে সহজবোধ্য করে তুলতে ভাগ্য অর্থে ভাল ও উৎকৃষ্ট অর্থে ভালো লেখা সমীচীন। ভাল নাকি ভালো, কোনটি সঠিক সে দ্বিধা আজই দূর করে ফেলুুন।

ভিতর/ভেতর, পিছন/পেছন, উঠা/ওঠা, উপর/ওপর

ভেতর, পেছন, ওঠা, ওপর—এই চারটি হচ্ছে চলিত শব্দ।
চলিত বাক্যে ভেতর, পেছন, ওঠা, ওপর লিখুন।
দৃষ্টান্ত :
১. কয়েদিকে কারাগারের ভেতরে ঢুকিয়ে তালাবদ্ধ করে দেওয়া হলো।
২. এভাবে চললে আজীবন পেছনে পড়ে থাকবে।
৩. তারা উভয়েই ধোঁয়া-ওঠা চায়ের পেয়ালার দিকে তাকিয়ে গল্প করা শুরু করলো।
৪. তার ওপর আর ভরসা নেই।

ভিতর, পিছন, উঠা, উপর—ভিতর, পিছন, উঠা, উপর হচ্ছে সাধু শব্দ।
সাধু শব্দে বাক্য লিখলে এগুলো ব্যবহার করুন।
দৃষ্টান্ত :
১. পর্বতের ভিতর হইতে এক বিরাট সর্প বাহির হইয়া আসিল।
২. পিছন হইতে দ্বাররক্ষক তাহাকে আঘাত করিয়া বসিল।
৩. চুনির দ্বারা বৃক্ষশাখে উঠা সম্ভবপর নহে।
৪. তাহার উপরেই দায়িত্ব অর্পণ করা হইল।

লেখা নাকি লিখা : কোনটি সঠিক ও কেন?

লেখা নাকি লিখা, এই দুইয়ের মধ্যে কোনটি সঠিক বানান সেটা নিয়ে অনেকেই দ্বিধায় পড়ে যান। এই সমস্যার মূল কারণ হচ্ছে মুখের ভাষাকে লেখার ভাষায় প্রয়োগ করা। আমরা সারাক্ষণ যে শব্দগুলো ব্যবহার করি সেগুলো ভুল হলেও ধীরে ধীরে তা আমাদের কাছে মনের অজান্তেই স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।

এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বানানের যাচ্ছেতাই প্রয়োগের কারণে মানুষ এগুলোকে শুদ্ধ ও স্বাভাবিক ধরে নিচ্ছে এবং নির্বিচারে তার প্রয়োগ করছে। ফলে দিনদিন এগুলোতে অভ্যস্ত হয়ে ভুল প্রয়োগ করছে।

এই যে, গেছি, বলসি, খাইসি প্রভৃতি বানানগুলোর কথা-ই ধরুন না। অনেকে রীতিমতো এগুলো একরকম প্রচলিত বানিয়ে ফেলেছে।  এই শব্দ দুটির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। চলুন লেখা নাকি লিখা—এদের মধ্যে কোনটি শুদ্ধ বা অশুদ্ধ তা জেনে নেওয়া যাক।

লেখা—লেখা হচ্ছে বিশেষ্য হিসেবে চলিত শব্দ। চলিত বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহারের প্রয়োজন হলে “লেখা” শব্দটি ব্যবহার করতে হবে।
দৃষ্টান্ত :
১. তার হাতের লেখা খুব সুন্দর।
২. মেয়েলি হাতের লেখা দেখেই অনুমান করা যায়।
৩. আমি লেখাটা শেষ করে তোমার কথা শুনব।
৪. লেখাপড়া বন্ধ না করে চালিয়ে যাও।
৫. বঙ্কিমচন্দ্রের লেখা পড়তে আমার খুব কষ্ট হয়।

তবে ক্রিয়াপদে প্রায়ই রূপ পরিবর্তন হয়ে ল-য়ে হ্রস্ব ই-কার ব্যবহৃত হয়ে থাকে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে অপরিবর্তিত থাকে।
দৃষ্টান্ত :
১. রাহিন তার ভাইকে চিঠি লিখেছে।
২. মাসুম খুব ভালো গল্প লেখে।
৩. আমি একটা কবিতা লিখেছি।
৪. আমি খুব শীঘ্রই তোমাকে চিঠি লিখে জানাব।

লিখা—লিখা হচ্ছে বিশেষ্য হিসেবে সাধু শব্দ। সাধু বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে লেখা’র পরিবর্তে লিখা বসে।
দৃষ্টান্ত :
১. তাহার লিখা আমার বোধগম্য নহে।
২. তাহার হস্তলিখা পরিপাট্য-বিবর্জিত।
৩. উপন্যাস লিখা সহজ কার্য নহে।

ক্রিয়াপদে রূপান্তরের সময় ল-য়ে হ্রস্ব ই-কার বজায় থাকে।
দৃষ্টান্ত :
১. মহেন্দ্রবাবু পত্র লিখিয়া চাকরের দ্বারা প্রেরণ করিলেন।
২. লিখিব লিখিব করিতেছি বটে কিন্তু সম্ভবপর হইয়া উঠিতেছে না।
৩. তিনি এমন কথা লিখিবেন ইহা আমার ভাবনারও অতীত।
৪. কবিতায় আর কী লিখিব, রক্ত দিয়া লিখিয়া তোমার নাম।

সুপ্রিয় পাঠক, লেখা নাকি লিখা, কোনটি কোথায় ব্যবহার করতে হবে সেটা বুঝতে পেরেছেন আশা করি।

মান্ধাতার আমল অর্থ কী এবং এর উৎপত্তি কীভাবে?

মান্ধাতার আমল কথাটি আমরা কমবেশি সবাই শুনেছি। অতি প্রাচীন বোঝাতে আমরা সাধারণত মান্ধাতার আমল কথাটি ব্যবহার করে থাকি। কিন্তু মান্ধাতার আমল কথাটি কীভাবে এলো? এর পেছনে রয়েছে একটি পৌরাণিক কাহিনি। মান্ধাতা ছিলেন সূর্য বংশের এক রাজা।

রামচন্দ্রও পরে একই বংশে জন্মেছিলেন। সেই হিসাবে বলা যায় মান্ধাতা রামচন্দ্রের পূর্বপুরুষ ছিলেন। মান্ধাতার বাবা ছিলেন সূর্য বংশের রাজা যুবনাশ্ব। তাঁর কোনো পুত্রসন্তান ছিল না। পুত্রসন্তান লাভের আশায় তিনি জঙ্গলে ঋষির আশ্রমে গিয়ে তপস্যা শুরু করেন। যুবনাশ্বের তপস্যায় মুগ্ধ হয়ে ঋষিরা তাঁর জন্য যজ্ঞ করতে রাজি হলেন।

যজ্ঞ শেষ হওয়ায় পর ঋষিরা এক কলসি মন্ত্রপূত জল রেখে দিলেন যা খেলে যুবনাশ্বের রানির পুত্রসন্তান হবে। কিন্তু একথা যুবনাশ্ব জানতেন না। রাতে পিপাসা পেলে তিনি কলসির জল খেয়ে ফেলেন। সকালে উঠে ঋষিরা কলসিতে অল্প জল পেয়ে যুবনাশ্বকে জিজ্ঞাসা করলেন। যুবনাশ্ব উত্তর দিলেন যে জল তিনিই পান করেছেন।

ঋষিরা বললেন জল যেহেতু যুবনাশ্ব পান করেছে সেহেতু পুত্রসন্তান যুবনাশ্বের গর্ভেই হবে। এর প্রায় ১০০ বছর পর যুবনাশ্বের পেটের বাম দিক বিদীর্ণ করে মান্ধাতা ভূমিষ্ঠ হন। কিন্তু কোনো নারীর গর্ভে জন্ম না হওয়ায় মান্ধাতা কার দুধ খেয়ে বড়ো হবেন তা নিয়ে সমস্যা দেখা দেয়। সেই সমস্যা সমাধানে এগিয়ে এলেন দেবরাজ ইন্দ্র।

ইন্দ্র তাঁর হাতের আঙুল মান্ধাতার মুখের ভেতরে দিয়ে বললেন “মাম ধাস্যতি”, যার অর্থ আমাকে পান করো। সেখান থেকে তাঁর নাম হয় মামধাতা বা মান্ধাতা। কথিত আছে যে ইন্দ্রের সেই আঙুলটি ছিল অমৃতক্ষরা। অমৃতগুণে মান্ধাতা খুব অল্প সময়েই বড়ো হয়ে যান। অল্পদিনেই মান্ধাতা পড়াশোনা ও অস্ত্রবিদ্যায় পারদর্শী হয়ে ওঠেন।

বাবা যুবনাশ্বের মৃত্যুর পর মান্ধাতা রাজা হন। যুদ্ধে তিনি পুরো পৃথিবী জয় করেন। এরপর তিনি ভাবলেন পুরো পৃথিবীই তিনি জয় করে ফেলেছেন তাহলে স্বর্গ জয় করা কেন বাদ রাখবেন। তারপর তিনি স্বর্গ জয়ের লক্ষ্যে বের হলেন। কিন্তু দেবরাজ ইন্দ্র জানালেন তিনি (মান্ধাতা) এখনও পুরো পৃথিবী জয় করতে পারেননি, কারণ লবণাসুর এখনও মান্ধাতার অধীনতা মেনে নেয়নি।

মান্ধাতা চললেন লবণাসুরকে বধ করতে। মান্ধাতা লবণাসুরের সাথে এ যুদ্ধেই নিহত হয়েছিলেন। মান্ধাতা রাজত্ব করতেন পুরাণে বর্ণিত চার যুগের প্রথম যুগে অর্থাৎ সত্যযুগে। বছরের হিসেবে সত্যযুগ প্রায় ৩৫ লক্ষ বছর আগের সময়।

তবে প্রচলিত অর্থে মান্ধাতার আমল বলতে কোনো নির্দিষ্ট সময় বিবেচনা করা হয় না, সাধারণত অনেক প্রাচীন বোঝাতে মান্ধাতার আমল কথাটি ব্যবহৃত হয় এবং সেটা এই কাহিনির পরিপ্রেক্ষিতে। 

 

কি না নাকি কিনা : কোনটি সঠিক ও কেন?

কি না নাকি কিনা, কোনটি সঠিক সেটা নিয়ে বেশ সংশয়ে থাকতে হয়। আপাতদৃষ্টিতে দুটির অর্থ অনেকটা একরকম হলেও প্রয়োগে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে।

‘কিনা’ হচ্ছে বাক্যালংকার। বাক্যালংকার বাক্যের অপরিহার্য উপাদান নয়। মূলত বাক্যের অর্থের মাধুর্য রক্ষার জন্য বাক্যালংকার ব্যবহৃত হয়।

কিনা‘ ছাড়াও যদি বাক্যের অর্থ স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায় তাহলে সেখানে বাক্যের মাধুর্য রক্ষার জন্য ‘কিনা‘ ব্যবহৃত হবে।
১. তুমি কিনা আমাকে ধোঁকা দিলে?
২. সে কিনা আমাকে ভয় দেখায়! 

পক্ষান্তরে ‘কি না‘ হচ্ছে বাক্যের অপরিহার্য উপাদান। এই ‘কি না‘ ছাড়া বাক্যের অর্থ অস্পষ্ট থেকে যাবে।
বাক্যের অর্থ অস্পষ্ট থাকলে, সন্দেহ বা সংশয় প্রকাশে সেখানে ‘কি না‘ ব্যবহৃত হবে।
১. সে আজ ঢাকায় যাবে কি না তা আমার জানা নেই।
২. তুমি আমার সঙ্গে যাবে কি না ?

সুপ্রিয় পাঠক, আশা করি ‘কি না’ নাকি ‘কিনা’, সেটা বুঝতে পেরেছেন। বাংলা একাডেমির অভিধানসহ অন্যান্য ব্যাকরণে এটাই পাওয়া যায়।

কি নাকি কী : কোনটি শুদ্ধ ও কেন?

অধিকাংশ লেখাতেই আমরা ‘কি‘ ও ‘কী‘ শব্দ দুটি প্রায়ই ব্যবহার করে থাকি এবং অনেকেই ‘কি’ নাকি ‘কী’ লিখবেন সেটা নিয়ে বেশ ঝামেলায় পড়েন। শব্দ দুটির উচ্চারণ এক হলেও প্রায়োগিক অর্থের ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। শব্দ দুটির ভুল প্রয়োগের কারণে বাক্যের অর্থ একেবারেই বদলে যেতে পারে। উপরন্তু পাঠক আপনার লেখার মর্মার্থ উদ্ধার করতে অনেকসময় ঝামেলায়ও পড়তে পারে।
এবার জেনে নেওয়া যাক ‘কি‘ নাকি ‘কী‘, কখন কোথায় লিখবেন।

প্রশ্নের উত্তর যদি ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ দ্বারা দেওয়া সম্ভব হয় সেক্ষেত্রে ‘কি‘ বসে।

১. তুমি কি কালই চলে যাবে?
উত্তর : হ্যাঁ যাব/না, যাব না।
২. তোমার বাবা কি বাড়িতে আছেন?
উত্তর : হ্যাঁ আছেন/না, নেই।
৩. তুমি কি ব্যস্ত আছ?
উত্তর : হ্যাঁ আছি/না, নেই।
৪. সে কি আজও আমাকে মনে রেখেছে?
উত্তর : হ্যাঁ রেখেছে/না, রাখেনি।
৫. আপনি কি আমার জন্যে অপেক্ষা করবেন?
উত্তর : হ্যাঁ করব/না, করব না।

প্রশ্নের উত্তর যদি ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ দ্বারা দেওয়া সম্ভব না হয় অর্থাৎ উত্তর যদি বর্ণনামূলক হয় সেক্ষেত্রে ‘কী‘ বসে।
১. তোমার কী প্রয়োজন?
উত্তর : মহারাজ, দুমুঠো ভাত জুটলে তাতেই হবে।
২. তুমি কী খাবে?
উত্তর : চা অথবা কফি যে-কোনো একটা হলেই চলবে।
৩. তুমি তাকে কী বলেছ?
উত্তর : তেমন কিছুই বলিনি/সামান্য কিছু বলেছি।
৪. সে আমার সম্পর্কে কী বলেছে?
উত্তর : তেমন কিছুই বলেনি/অনেককিছুই বলেছে।
৫. তোমার বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কী পড়ান?
উত্তর : বাংলা, গণিত ও ইংরেজি।

দুই শব্দের মধ্যে তুলনায় ‘কি’ বসে।
১. মাঘ কি পৌষ হবে, তখন আমি বাড়িতে এলাম।
২. কি দিন কি রাত, সে সবসময় কাজ করে।

বাক্যের মাধুর্য বৃদ্ধির জন্যে ‘কি’ সাধারণত বাক্যের শেষে ব্যবহৃত হয়। এটা অপরিহার্য নয়।
১. তোমার কথাই ভাবছিলাম আর কি।
২. কোনোরকমে দিন যাচ্ছে আর কি।

মাঝে মাঝে বিস্ময় প্রকাশে ‘কি’ বাক্যের প্রথম দিকেও বসতে পারে।
১. এ কি তুমি কখন এলে?
২. এ কি সত্য সকলই সত্য, হে আমার চিরভক্ত।

প্রশ্নবোধক বাক্য ছাড়াও অন্য বাক্যে ‘কী’ বসে।
১. জানি না সে কী করছে।
২. কী অপরূপ সকাল!

নিম্নোক্ত শব্দগুলোতে সবসময় হ্রস্ব ই-কার(ি) বসবে—কিরে, বইকি, এমনকি,

অধিকাংশ লেখাতেই আমরা ‘কি‘ ও ‘কী‘ শব্দ দুটি প্রায়ই ব্যবহার করে থাকি এবং অনেকেই ‘কি’ নাকি ‘কী’ লিখবেন সেটা নিয়ে বেশ ঝামেলায় পড়েন। শব্দ দুটির উচ্চারণ এক হলেও প্রায়োগিক অর্থের ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। শব্দ দুটির ভুল প্রয়োগের কারণে বাক্যের অর্থ একেবারেই বদলে যেতে পারে। উপরন্তু পাঠক আপনার লেখার মর্মার্থ উদ্ধার করতে অনেকসময় ঝামেলায়ও পড়তে পারে।
এবার জেনে নেওয়া যাক ‘কি‘ নাকি ‘কী‘, কখন কোথায় লিখবেন।

প্রশ্নের উত্তর যদি ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ দ্বারা দেওয়া সম্ভব হয় সেক্ষেত্রে ‘কি‘ বসে।

১. তুমি কি কালই চলে যাবে?
উত্তর : হ্যাঁ যাব/না, যাব না।
২. তোমার বাবা কি বাড়িতে আছেন?
উত্তর : হ্যাঁ আছেন/না, নেই।
৩. তুমি কি ব্যস্ত আছ?
উত্তর : হ্যাঁ আছি/না, নেই।
৪. সে কি আজও আমাকে মনে রেখেছে?
উত্তর : হ্যাঁ রেখেছে/না, রাখেনি।
৫. আপনি কি আমার জন্যে অপেক্ষা করবেন?
উত্তর : হ্যাঁ করব/না, করব না।

প্রশ্নের উত্তর যদি ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ দ্বারা দেওয়া সম্ভব না হয় অর্থাৎ উত্তর যদি বর্ণনামূলক হয় সেক্ষেত্রে ‘কী‘ বসে।
১. তোমার কী প্রয়োজন?
উত্তর : মহারাজ, দুমুঠো ভাত জুটলে তাতেই হবে।
২. তুমি কী খাবে?
উত্তর : চা অথবা কফি যে-কোনো একটা হলেই চলবে।
৩. তুমি তাকে কী বলেছ?
উত্তর : তেমন কিছুই বলিনি/সামান্য কিছু বলেছি।
৪. সে আমার সম্পর্কে কী বলেছে?
উত্তর : তেমন কিছুই বলেনি/অনেককিছুই বলেছে।
৫. তোমার বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কী পড়ান?
উত্তর : বাংলা, গণিত ও ইংরেজি।

দুই শব্দের মধ্যে তুলনায় ‘কি’ বসে।
১. মাঘ কি পৌষ হবে, তখন আমি বাড়িতে এলাম।
২. কি দিন কি রাত, সে সবসময় কাজ করে।

বাক্যের মাধুর্য বৃদ্ধির জন্যে ‘কি’ সাধারণত বাক্যের শেষে ব্যবহৃত হয়। এটা অপরিহার্য নয়।
১. তোমার কথাই ভাবছিলাম আর কি।
২. কোনোরকমে দিন যাচ্ছে আর কি।

মাঝে মাঝে বিস্ময় প্রকাশে ‘কি’ বাক্যের প্রথম দিকেও বসতে পারে।
১. এ কি তুমি কখন এলে?
২. এ কি সত্য সকলই সত্য, হে আমার চিরভক্ত।

প্রশ্নবোধক বাক্য ছাড়াও অন্য বাক্যে ‘কী’ বসে।
১. জানি না সে কী করছে।
২. কী অপরূপ সকাল!

নিম্নোক্ত শব্দগুলোতে সবসময় হ্রস্ব ই-কার(ি) বসবে—কিরে, বইকি, এমনকি, কিনা, কি না, নাকি।

সঠিক নাকি ঠিক : কোনটি শুদ্ধ বানান?

সঠিক নাকি ঠিক, এই দুইয়ের মধ্যে দুটিই শুদ্ধ নাকি একটি শুদ্ধ তা নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে।
মাঝে মাঝে অনেকে এটা নিয়ে বাগ্‌যুদ্ধও বাধিয়ে ফেলেন রীতিমতো। অনেকের মতে সঠিক শব্দটি বাহুল্যদোষে আক্রান্ত। সঠিক শব্দটি উপসর্গযোগে গঠিত। ঠিক শব্দের সাথে উপসর্গ যুক্ত হয়ে সঠিক শব্দটি গঠিত হয়েছে। উপসর্গের অর্থ হচ্ছে অধিকতর, অতিশয়, সঙ্গে।

অর্থগত দ্যোতনা বিচারে সঠিক শব্দটির অর্থ দাঁড়ায় ‘অতিশয় বা অধিকতর ঠিক’। মূলত ঠিক শব্দের অর্থে জোর প্রদানের জন্য উপসর্গ যুক্ত হয়েছে।
সঠিক শব্দের উপসর্গ বাহুল্য হলে অভিধান থেকে এমন উপসর্গযুক্ত কয়েকডজন শব্দই বাদ দিতে হবে। তাছাড়া বাংলা একাডেমির সবশেষ সংস্করণের অভিধানেও সঠিক বানানটিকে শুদ্ধ হিসেবে দেখানো হয়েছে।

কিছু কিছু উপসর্গ আছে যেগুলো আপাতদৃষ্টিতে অনর্থক মনে হলেও তারা শব্দের যথাযথ অর্থ প্রকাশে সহায়তা করে। সঠিক শব্দটির তুলনায় ঠিক শব্দটির প্রয়োগক্ষেত্র ব্যাপক। তবে সঠিক  শব্দটিকে ভুল বলার সুযোগ নেই

সঠিক—সঠিক শব্দের অর্থ হচ্ছে নির্ভুল, প্রকৃত।
দৃষ্টান্ত :
১. সে আমাকে সঠিক তথ্যই দিয়েছিল।
২. তোমার উত্তর একেবারেই সঠিক।

ঠিক—ঠিক শব্দের অর্থ হচ্ছে সত্য, নির্ভুল, স্থিরীকৃত, কম বা বেশি নয় এমন, সম্পূর্ণ, হুবহু, প্রস্তুত, পরিপাটি।
দৃষ্টান্ত :
১. তোমার কথাই ঠিক।
২. রহিমার বাবা তার (রহিমার) বিয়ে ঠিক করেছেন।
৩. ঠিকমতো ওষুধ খেয়ো।
৪. সুন্দরবনে যাওয়ার জন্যে নৌকা ঠিক করা হয়েছে।
৫. পরীক্ষার খাতায় ঠিক ঠিক উত্তর লিখবে।
৬. ঠিক দশটার সময় সে বাড়ি এসে পৌঁছাল।
৭. আঞ্জুমান সব কাজ ঠিকমতো করে।

সুপ্রিয় পাঠক, উদাহরণগুলো পড়ে নিশ্চয় সঠিক নাকি ঠিক, কোনটি কোথায় ব্যবহার করতে হবে তা অনুমান করতে পেরেছেন।
সঠিক শব্দটি ভুল নয়, আপনি নির্দ্বিধায় সঠিক শব্দটি ব্যবহার করতে পারেন।