কারক ব্যাকরণের একটি অন্যতম অংশ। কারক শব্দের অর্থ—যা ক্রিয়া সম্পাদন করে। কর্তা বা ক্রিয়ার সঙ্গে অনেককিছু মিলেই একটি বাক্যের পূর্ণ অর্থ প্রকাশ করে। এর প্রত্যেকটি অংশই কারক।
কারক ৬ প্রকার—১. কর্তৃকারক  ২. কর্মকারক  ৩. করণ কারক  ৪. সম্প্রদান কারক  ৫. অপাদান কারক  ৬. অধিকরণ কারক।

জামাল সাহেব রোজ সকালে ভান্ডার থেকে নিজ হাতে এতিমদেরকে টাকা দান করেন।
এখানে :
জামাল সাহেব—কর্তৃসম্বন্ধ
টাকা—কর্মসম্বন্ধ
হাত—করণসম্বন্ধ
এতিমদেরকে—সম্প্রদানসম্বন্ধ
ভান্ডার থেকে—অপাদানসম্বন্ধ
রোজ সকালে—অধিকরণসম্বন্ধ

বিভক্তি : বাক্যে অবস্থিত একটি শব্দের সঙ্গে অন্য শব্দের সংযোগ ঘটানোর জন্যে যে শব্দাংশ শব্দের সঙ্গে যুক্ত হয় তাকে বিভক্তি বলে। বিভক্তি ছাড়া বাক্যের যথাযথ অর্থ প্রকাশ করা সম্ভব নয়। ভিখারিকে ভিক্ষে দাও। এখানে ভিখারি শব্দের সঙ্গে কে বিভক্তি যুক্ত হয়েছে। বিভক্তি যুক্ত না হলে অবস্থা দাঁড়াত—ভিখারি ভিক্ষে দাও। তখন এই বাক্যের অর্থ স্পষ্ট হতো না।

বিভক্তিসংকেত
প্রথমাঅ, এ, য়, তে
দ্বিতীয়াকে, রে, এরে
তৃতীয়াদ্বারা, দিয়ে, কর্তৃক
চতুর্থীকে, রে, এরে
পঞ্চমীহতে, থেকে, চেয়ে
ষষ্ঠীর, এর
সপ্তমীএ, য়, তে, এতে
বিভক্তিসমূহ

কর্তৃকারক

বাক্যের অন্তর্গত যে বিশেষ্য বা সর্বনাম পদ ক্রিয়া সম্পাদন করে তাকে কর্তৃকারক বলে। ক্রিয়াকে কে বা কারা দ্বারা প্রশ্ন করলে যে উত্তর পাওয়া যায় তাকে কর্তৃকারক বলে।
১. জিসান বই পড়ে। (কে বই পড়ে?)

কর্তৃকারক ৪ প্রকার :

মুখ্যকর্তা

যে নিজেই ক্রিয়া সম্পাদন করে তাকে মুখ্যকর্তা বলে।
১. পাখিরা আকাশে ওড়ে।
২. মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে।

প্রযোজক কর্তা

মূল কর্তা যখন অন্যকে দিয়ে ক্রিয়া সম্পাদন করায় তখন তাকে (মূল কর্তা) প্রযোজক কর্তা বলে।
মা শিশুকে চাঁদ দেখাচ্ছেন। এখানে মা প্রযোজক কর্তা।

প্রযোজ্য কর্তা

মূল কর্তা যাকে দিয়ে ক্রিয়া সম্পাদন করায় তাকে প্রযোজ্য কর্তা বলে।
১. মা শিশুকে চাঁদ দেখাচ্ছেন।
২. শিক্ষক ছাত্রকে পড়াচ্ছেন।

ব্যতিহার কর্তা

বাক্যের দুটি কর্তা যখন একইসঙ্গে একই কাজ করে তখন তাকে ব্যতিহার কর্তা বলে।
১. রাজায়-রাজায় লড়াই হয়।
২. বাঘে-মহিষে এক ঘাটে জল খায়।

কর্তৃকারকে বিভিন্ন বিভক্তির প্রয়োগ

প্রথমা বিভক্তি : শিহাব বই পড়ে
দ্বিতীয়া বিভক্তি : সুমনকে কাজ করতে হবে।
তৃতীয়া বিভক্তি : রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক গীতাঞ্জলি রচিত হয়েছে।
ষষ্ঠী বিভক্তি : আমার যাওয়া হবে না।
সপ্তমী বিভক্তি : পাগলে কী না বলে।

কর্মকারক

যাকে আশ্রয় করে কর্তা ক্রিয়া সম্পাদন করে তাকে কর্মকারক বলে। ক্রিয়াকে কী বা কাকে দ্বারা প্রশ্ন করলে যে উত্তর পাওয়া যায় সেটাই কর্মকারক।
১. রাজিব বই পড়ছে (কী পড়ছে?)।
২. হাতি কলাগাছ খায় (কী খায়?)।

কর্মকারকে বিভিন্ন বিভক্তির প্রয়োগ

প্রথমা বিভক্তি : ডাক্তার ডাকো।
দ্বিতীয়া বিভক্তি : আমি তাকে সংবাদ দিয়েছি।
ষষ্ঠী বিভক্তি : ছেলেটি বলের সঙ্গে যুদ্ধ করছে।
সপ্তমী বিভক্তি : জিজ্ঞাসিব জনে জনে

করণ কারক

ক্রিয়া সম্পাদনের ক্ষেত্রে যা প্রধান সহায় তাকে করণ কারক বলে। ক্রিয়াকে দ্বারা, দিয়ে, কর্তৃক ইত্যাদি প্রশ্ন করলে যে উত্তর পাওয়া যায় তাকে করণ কারক বলে, অর্থাৎ কর্তা যার দ্বারা ক্রিয়া সম্পাদন করে সে-ই করণ কারক।
১. ছেলেরা বল খেলে (বল দ্বারা খেলে)।
২. আম্ফানে সব লন্ডভন্ড হয়ে গেল (আম্ফানের দ্বারা)।
৩. মায়ের কথা মধুমাখা (মধু দিয়ে মাখা)।

করণ কারকে বিভিন্ন বিভক্তির প্রয়োগ

প্রথমা বিভক্তি : ছেলেরা বল খেলে।
তৃতীয়া বিভক্তি : মন দিয়ে করো সবে বিদ্যা অর্জন।
পঞ্চমী বিভক্তি : এই ব্যাবসা হতে তোমার বেশ লাভ হবে।
ষষ্ঠী বিভক্তি : কুকুরটাকে লাঠির আঘাত কোরো না।
সপ্তমী বিভক্তি : আকাশ মেঘে ঢাকা।

সম্প্রদান কারক

যখন স্বত্ব ত্যাগ করে কাউকে কোনোকিছু দান করা হয় তখন দান গ্রহণকারী ব্যক্তিকেই সম্প্রদান কারক বলে।
১. ভিখারিকে ভিক্ষে দাও।
২. অন্ধজনে দেহ আলো।
৩. ক্ষুধার্তকে খাবার দাও।

সম্প্রদান কারকে বিভিন্ন বিভক্তির প্রয়োগ

প্রথমা বিভক্তি : গুরুদক্ষিণা দাও।
চতুর্থী বিভক্তি : অসহায়কে সাহায্য করো।
ষষ্ঠী বিভক্তি : গরিবদের অন্ন দাও।
সপ্তমী বিভক্তি : দীনে দয়া করো।

তবে সম্পূর্ণ স্বত্ব ত্যাগ করে না দিলে তা সম্প্রদান কারক হবে না। যেমন—ধোপাকে কাপড় দাও। এখানে স্বত্ব ত্যাগ করে দেওয়া হচ্ছে না।

অপাদান কারক

যা কোনোকিছু থেকে বিচ্যুত, পতিত, গৃহীত, জাত, রক্ষিত, বিরত, দূরীভূত, উৎপন্ন তাকে অপাদান কারক বলে। সাধারণভাবে ক্রিয়াকে ‘কোথা হতে’ দ্বারা প্রশ্ন করলে যে উত্তর পাওয়া যায় তাকে অপাদান কারক বলে।
বিচ্যুত : গাছ থেকে পাতা ঝরে।
পতিত : মেঘে বৃষ্টি হয়।
গৃহীত : ঝিনুক থেকে মুক্তো মেলে।
জাত : খেত থেকে সবজি পাই।
রক্ষিত : বিপদে মোরে রক্ষা করো।
বিরত : পাপে বিরত হও।
দূরীভূত : দেশ থেকে করোনা বিদায় হলো।
উৎপন্ন : তিলে তেল হয়।
ভীত : সুন্দরবনে বাঘের ভয় আছে।

অপাদান কারকে বিভিন্ন বিভক্তির প্রয়োগ

প্রথমা বিভক্তি : উড়োজাহাজ বিমানবন্দর ছাড়ল।
দ্বিতীয়া বিভক্তি : মাকে খুব ভয় পাই।
তৃতীয়া বিভক্তি : শিশুটির চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগল।
পঞ্চমী বিভক্তি : ঝিনুক থেকে মুক্তো মেলে।
ষষ্ঠী বিভক্তি : বাঘের ভয়ে সবাই আতঙ্কিত।
সপ্তমী বিভক্তি : দুধে ঘি হয়।

অধিকরণ কারক

যে স্থানে, যে কালে বা যে বিষয়ে ক্রিয়া সম্পন্ন হয় তাকে অধিকরণ কারক বলে। ক্রিয়াকে কখন, কোথায়, কীসে ইত্যাদি দ্বারা প্রশ্ন করলে যে উত্তর পাওয়া যায় তা-ই অধিকরণ কারক। যেমন—বনে বাঘ আছে, শীতে তালের রস পাওয়া যায়। অধিকরণ কারক ৪ প্রকার :

ঐকদেশিক/স্থানাধিকরণ

যে স্থানে ক্রিয়া সম্পন্ন হয় তাকে ঐকদেশিক/স্থানাধিকরণ কারক বলে।
১. বনে বাঘ আছে (বনের কোনো এক জায়গায়)।
২. পুকুরে মাছ আছে (পুকুরের কোনো এক অংশে)।

কালাধিকরণ

যে কাল বা সময়ে ক্রিয়া সম্পন্ন হয় তাকে কালাধিকেণ কারক বলে।
১. বসন্তে নানান ফুল ফোটে।
২. মাঘ মাসে বেশ শীত থাকে।

বিষয়াধিকরণ

যে বিষয়ে দক্ষতা বা অক্ষমতা প্রকাশ করা হয় তাকে বিষয়াধিকরণ কারক বলে।
১. রাতুল অঙ্কে কাঁচা।
২. সে বাংলায় বেশ দক্ষ।

ভাবাধিকরণ

একটি ক্রিয়া অন্যটির ওপর নির্ভর করলে নির্ভরশীল ক্রিয়াটি ভাববাচকে রূপান্তরিত হয়ে অধিকরণ হলে তাকে ভাবাধিকরণ কারক বলে।
১. কান্নায় শোক মন্দীভূত হয়।

অধিকরণ কারকে বিভিন্ন বিভক্তির প্রয়োগ

প্রথমা বিভক্তি : আমি আগামীকাল বাড়ি যাব।
দ্বিতীয়া বিভক্তি : মন আমার নাচেরে আজিকে
তৃতীয়া বিভক্তি : খিলিপান (এর ভেতরে ভরে) দিয়ে ওষুধ খাবে।
পঞ্চমী বিভক্তি : বাড়ি থেকে নদী দেখা যায়।
সপ্তমী বিভক্তি : বনে বাঘ আছে।