সন্ধি শব্দের  অর্থ মিলন। পাশাপাশি অবস্থিত দুটি ধ্বনির মিলনকে সন্ধি বলে। সন্ধির ফলে শব্দের মাধুর্য বৃদ্ধি পায়। তবে মূল শব্দের অর্থ তেমন লোপ পায় না।

বাংলা শব্দের সন্ধি

বাংলা শব্দের মাধুর্য বৃদ্ধির জন্যে যে সন্ধির উদ্ভব তাকে বাংলা শব্দের সন্ধি বলে। বাংলা শব্দের সন্ধি ২ প্রকার—স্বরসন্ধি, ব্যঞ্জনসন্ধি।

স্বরসন্ধি

স্বরধ্বনির সঙ্গে স্বরধ্বনির মিলনের ফলে যে সন্ধি হয় তাকে স্বরসন্ধি বলে। স্বরসন্ধিতে ধ্বনি লোপ পেয়ে নতুন ধ্বনি গঠনের নিয়ম :
১. অ+এ = এ          শত+এক = শতেক।
২. আ+আ = আ     সোনা+আলি = সোনালি।
৩. আ+উ = উ         মিথ্যা+উক = মিথ্যুক।
৪. ই+এ = ই            কুড়ি+এক = কুড়িক।

মাঝে মাঝে শেষের ধ্বনিটি লোপ পায়। যেমন—যা+ইচ্ছা+তাই = যাচ্ছেতাই।

ব্যঞ্জনসন্ধি

স্বরধ্বনি ও ব্যঞ্জনধ্বনি, ব্যঞ্জনধ্বনি ও ব্যঞ্জনধ্বনি, ব্যঞ্জনধ্বনি ও স্বরধ্বনির মিলনে যে সন্ধি হয় তাকে ব্যঞ্জনসন্ধি বলে।
১. প্রথম ধ্বনি অঘোষ ও পরের ধ্বনিটি ঘোষ হলে দুটির মিলনে ঘোষ ধ্বনির দ্বিত্ব হয়। যেমন—ছোট+দা = ছোড়দা।
২. হলন্ত র্ ধ্বনির পরে অন্য ব্যঞ্জনধ্বনি থাকলে র্ ধ্বনি লোপ পেয়ে পরের ধ্বনির দ্বিত্ব হয়। যেমন—চার+টি = চাট্টি, ধর্+না = ধন্না, দুর+ছাই = দুচ্ছাই।
৩. চ বর্গীয় ধ্বনির (চ, ছ, জ, ঝ, ঞ) আগে ত বর্গীয় ধ্বনি থাকলে ত বর্গীয় ধ্বনিটি লোপ পায় এবং চ বর্গীয় ধ্বনির দ্বিত্ব হয়। যেমন—বদ্+ জাত = বজ্জাত, হাত+ছানি = হাচ্ছানি।
৪. প ধ্বনির পরে ‘চ’ বা ‘স’ ও তারপরে ত থাকলে ‘চ’ ও ‘ত’ ধ্বনি মিলে তালব্য শ হয়। যেমন—পাঁচ+শ = পাঁশ্‌শ, সাত+শ = সাশ্‌শ, পাঁচ+সিকা = পাঁশশিকা।
৫. হলন্ত ধ্বনির সঙ্গে স্বরধ্বনি যুক্ত হলে স্বরের কোনো লোপ ঘটে না। যেমন—বোন+আই = বোনাই, চুন+আরি = চুনারি, বার+এক = বারেক।
৬. স্বরধ্বনির পরে ব্যঞ্জনধ্বনি থাকলে স্বরধ্বনিটি লোপ পায়। যেমন—কাঁচা+কলা = কাঁচকলা, নাতি+বউ = নাতবউ, ঘোড়া+দৌড় = ঘোড়দৌড়।

তৎসম শব্দের সন্ধি

সংস্কৃত থেকে হুবহু বাংলায় আসা শব্দগুলো সংস্কৃত ব্যাকরণের নিয়মেই গঠিত। তৎসম শব্দ বা সংস্কৃত থেকে আসা সন্ধিবদ্ধ শব্দগুলো তিনটি উপায়ে গঠিত—স্বরসন্ধি, ব্যঞ্জনসন্ধি ও বিসর্গ সন্ধি।

স্বরসন্ধি

স্বরধ্বনির সঙ্গে স্বরধ্বনির মিলনে যে সন্ধি হয় তাকে স্বরসন্ধি বলে।
১. অ-আ, আ-আ, কিংবা আ-অ আগে-পরে যা-ই থাক দুটি মিলে সবসময় আ-কার হয়।
অ+অ = আ            প্রাণ+অধিক = প্রাণাধিক।
অ+আ = আ           সিংহ+আসন = সিংহাসন।
আ+অ = আ           আশা+অতীত = আশাতীত।
আ+আ = আ          কারা+আগার = কারাগার।

২. অ-কার বা আ-কারের পরে হ্রস্ব ই বা দীর্ঘ ঈ থাকলে দুটি মিলে এ-কার হয়।
অ+ই = এ              শুভ+ইচ্ছা = শুভেচ্ছা।
আ+ই = এ             যথা+ইষ্ট = যথেষ্ট।
অ+ঈ = এ             পরম+ঈশ = পরমেশ।
আ+ঈ = এ            মহা+ঈশ = মহেশ।

৩. অ কিংবা আ-ধ্বনির পরে হ্রস্ব উ বা দীর্ঘ ঊ যে-কোনো একটি থাকলে তা ও-কারে রূপান্তরিত হয়।
অ+উ = ও            নীল+উৎপল = নীলোৎপল।
আ+উ = ও           মহা+উৎসব = মহোৎসব।
অ+ঊ = ও           গৃহ+ঊর্ধ্ব = গৃহোর্ধ্ব।
আ+ঊ = ও          চল+ঊর্মি = চলোর্মি।

৪. অ কিংবা আ-ধ্বনির পরে ঋ-ধ্বনি থাকলে উভয় মিলে ‘অর’ হয় এবং রেফরূপে পরের বর্ণের সঙ্গে যুক্ত হয়।
অ+ঋ = অর             দেব+ঋষি = দেবর্ষি।
আ+ঋ = অর            মহা+ঋষি = মহর্ষি।

৫. অ কিংবা আ-ধ্বনির পরে ‘ঋত’ থাকলে দুটি মিলে ‘আর’ হয় এবং আগের ধ্বনিতে আ-কার—পরের ধ্বনিতে রেফ যুক্ত হয়।
অ+ঋ = আর           ভয়+ঋত = ভয়ার্ত।
আ+ঋ = আর          ক্ষুধা+ঋত = ক্ষুধার্ত।

৬. অ কিংবা আ-ধ্বনির সঙ্গে এ বা ঐ ধ্বনি যে-কোনো  যুক্ত হলে উভয় মিলে ঐ-কার হয় এবং তা প্রথম ধ্বনির সঙ্গে যুক্ত হয়।

অ+এ = ঐ     জন+এক = জনৈক।
আ+এ = ঐ    সদা+এব = সদৈব।
অ+ঐ = ঐ     মত+ঐক্য = মতৈক্য।
আ+ঐ = ঐ    মহা+ঐশ্বর্য = মহৈশ্বর্য।

৭. অ কিংবা আ-ধ্বনির পরে ও বা ঔ-ধ্বনি থাকলে উভয় মিলে ঔ-কার হয় এবং তা প্রথম ধ্বনির সঙ্গে যুক্ত হয়।
অ+ও = ঔ      বন+ওষধি = বনৌষধি।
আ+ও = ঔ     মহা+ওষধি = মহৌষধি।
অ+ঔ = ঔ     পরম+ঔষধ = পরমৌষধ।
আ+ঔ = ঔ    মহা+ঔষধ = মহৌষধ।

৮. হ্রস্ব ই-কার কিংবা দীর্ঘ ঈ-কারের পরে হ্রস্ব ই-কার বা দীর্ঘ ঈ-কার থাকলে উভয় মিলে দীর্ঘ ঈ-কার হয়।
ই+ই = ঈ        রবি+ইন্দ্র = রবীন্দ্র।
ই+ঈ = ঈ       পরি+ঈক্ষা = পরীক্ষা।
ঈ+ই = ঈ       সতী+ইন্দ্র = সতীন্দ্র।
ঈ+ঈ = ঈ       সতী+ঈশ = সতীশ।

৯. হ্রস্ব ই-কার কিংবা দীর্ঘ ঈ-কারের পরে হ্রস্ব ই-কার, দীর্ঘ ঈ-কার ছাড়া অন্য স্বর থাকলে উভয় মিলে য বা য-ফলা (্য) হয়।
ই+অ = য্+অ       অতি+অন্ত = অত্যন্ত।
ই+আ = য্+আ     ইতি+আদি = ইত্যাদি।
ই+উ = য্+উ        অতি+উক্তি = অত্যুক্তি।
ই+ঊ = য্+ঊ       প্রতি+ঊষ = প্রত্যূষ।
ই+এ = য্+এ        প্রতি+এক = প্রত্যেক।
ঈ+অ = য্+অ      নদী+অম্বু = নদ্যম্বু।

১০. হ্রস্ব উ-কার কিংবা দীর্ঘ ঊ-কারের পরে হ্রস্ব উ বা দীর্ঘ ঊ থাকলে দুটি মিলে দীর্ঘ ঊ-কার হয়।
উ+উ = ঊ        মরু+উদ্যান = মরূদ্যান।
উ+ঊ = ঊ       বহু+ঊর্ধ্ব = বহূর্ধ্ব।
ঊ+উ = ঊ       বধূ+উৎসব = বধূৎসব।
ঊ+ঊ = ঊ      ভূ+ঊর্ধ্ব = ভূর্ধ্ব।

১১. হ্রস্ব উ-কার কিংবা দীর্ঘ ঊ-কারের পরে হ্রস্ব উ বা দীর্ঘ ঊ ছাড়া অন্য কোনো স্বর থাকলে হ্রস্ব উ/দীর্ঘ ঊ-এর স্থানে ব-ফলা বসে এবং তা প্রথম ধ্বনির সঙ্গে যুক্ত হয়।
উ+অ = ব+অ        সু+অল্প = স্বল্প।
উ+আ = ব+আ      সু+আগত = স্বাগত।
উ+ই = ব+ই           অনু+ইত = অন্বিত।
উ+ঈ = ব+ঈ          তনু+ঈ = তন্বী।
উ+এ = ব+এ         অনু+এষণ = অন্বেষণ।

১২. ঋ-কারের পরে ঋ ছাড়া অন্য স্বর থাকলে ঋ-ধ্বনির জায়গায় ‘র’ হয় তা র-ফলা হিসেবে যুক্ত হয়।
পিতৃ+আদেশ = পিত্রাদেশ।
পিতৃ+আলয় = পিত্রালয়।

১৩. এ, ঐ, ও, ঔ-কারের পরে এ, ঐ-কারের স্থানে অয়, আয় এবং ও, ঔ-কারের স্থানে যথাক্রমে অব, আব বসে।
এ+অ = অয়্+এ      নে+অন = নয়ন।
ঐ+অ = আয়্+অ    গৈ+অক = গায়ক।
ও+অ = অব্+অ      লো+অন = লবণ।
ঔ+অ = আব+অ    পৌ+অক = পাবক।
ও+আ = অব্+আ    গো+আদি = গবাদি।
ও+এ = অব+এ       গো+এষণা = গবেষণা।
ও+ই = অব্+ই         পো+ইত্র = পবিত্র।
ঔ+ই = আব্+ই       নৌ+ইক = নাবিক।
ঔ+উ = আব+উ     ভৌ+উক = ভাবুক।

১৪. কিছু সন্ধি কোনো নিয়ম অনুযায়ী হয় না, এগুলোকে নিপাতনে সিদ্ধ সন্ধি বলে। যেমন—কুল+অটা = কুলটা, প্র+উঢ় = প্রৌঢ়, অন্য+অন্য = অন্যান্য, মার্ত+অণ্ড = মার্তণ্ড, শুদ্ধ+ওদন = শুদ্ধোদন, গো+অক্ষ = গবাক্ষ।

ব্যঞ্জনসন্ধি

ব্যঞ্জনধ্বনি+স্বরধ্বনি, ব্যঞ্জনধ্বনি+ব্যঞ্জনধ্বনি, স্বরধনি+ব্যঞ্জনধ্বনিতে মিলে যে সন্ধি হয় তাকে ব্যঞ্জনসন্ধি বলে।

ব্যঞ্জনধ্বনি+স্বরধ্বনি

১. ক, চ, ট, ত, প ইত্যাদির পরে স্বরধ্বনি থাকলে ব্যঞ্জনধ্বনিগুলো যথাক্রমে গ্, জ্, ড (ড়্), দ, ব-তে রূপান্তরিত হয়।
ক্+অ = গ        দিক্+অন্ত = দিগন্ত।
চ্+অ = জ        ণিচ্+অন্ত = ণিজন্ত।
ট্+আ = ড়       ষট্+আনন = ষড়ানন।
ত্+অ = দ        তৎ+অবধি = তদবধি।
প্+অ = ব        সুপ্+অন্ত = সুবন্ত।

স্বরধ্বনি+ব্যঞ্জনধ্বনি

স্বরধ্বনির পরে ছ থাকলে সেই ব্যঞ্জনধ্বনির দ্বিত্ব (চ্ছ) হয়।
অ+ছ = চ্ছ       এক+ছত্র = একচ্ছত্র।
আ+ছ = চ্ছ      কথা+ছলে = কথাচ্ছলে।
ই+ছ = চ্ছ         পরি+ছদ = পরিচ্ছদ।

ব্যঞ্জনধ্বনি+ব্যঞ্জনধ্বনি

১. ত্ এবং দ্-এর পরে চ, ছ থাকলে ত্ এবং দ্-এর পরিবর্তে চ্ বসে।
ত্+চ = চ্চ       সৎ+চিন্তা = সচ্চিন্তা।
ত্+ছ = চ্ছ      উৎ+ছেদ = উচ্ছেদ।
দ্+চ = চ্চ        বিপদ+চয় = বিপচ্চয়।
দ্+ছ = চ্ছ       বিপদ+ছায়া = বিপচ্ছায়া।

২. ত্ এবং দ্-এর পরে জ্ বা ঝ থাকলে ত্ বা দ্-এর স্থানে জ্ বসে।
ত্+জ = জ্জ      সৎ+জন = সজ্জন।
দ্+জ = জ্জ      বিপদ+জনক = বিপজ্জনক।
ত্+ঝ = জ্ঝ       কুৎ+ঝটিকা = কুজ্ঝটিকা।

৩. ত্ এবং দ্-এর পরে তালব্য শ থাকলে ত্ বা দ্-এর স্থানে চ হয় এবং তালব্য শ-এর স্থানে ছ হয়।
ত্+শ = চ্ছ       উৎ+শ্বাস = উচ্ছ্বাস।

৪. ত্ এবং দ্-এর পরে ড থাকলে ত্ ও দ্-এর পরিবর্তে ড্ বসে।
ত্+ড = ড্ড      উৎ+ডীন = উড্ডীন।

৫. ত্ এবং দ্-এর পরে হ থাকলে ত্ বা দ্-এর স্থানে দ এবং হ-এর স্থানে ধ বসে।
ত্+হ = দ্+ধ       উৎ+হার = উদ্ধার।
দ্+হ = দ্+ধ        পদ্+হতি = পদ্ধতি।

৬. ত্ এবং দ্-এর পরে ল থাকলে ত্ ও দ্-এর পরিবর্তে ল বসে।
ত্+ল = ল্ল         উৎ+লাস = উল্লাস।
দ্+ল = ল্ল          উদ্+লিখিত = উল্লিখিত।

৭. ব্যঞ্জনধ্বনিসমূহের যে-কোনো বর্গের অঘোষ অল্পপ্রাণ ধ্বনি ও ঘোষ মহাপ্রাণ ধ্বনি কিংবা ঘোষ অল্পপ্রাণ তালব্য ধ্বনি (য>জ), ঘোষ অল্পপ্রাণ ওষ্ঠ্য ধ্বনি (ব),  ঘোষ কম্পনজাত দন্তমূলীয় ধ্বনি (র) বা ঘোষ অল্পপ্রাণ ওষ্ঠ্য ব্যঞ্জনধ্বনি (ব) থাকলে প্রথম অঘোষ অল্পপ্রাণ ধ্বনি ঘোষ অল্পপ্রাণরূপে উচ্চারিত হয়।
ক্+দ = গ্+দ       বাক্+দান = বাগ্‌দান।
ট্+য = ড্+য        ষট+যন্ত্র = ষড়যন্ত্র।
ত্+ঘ = দ্+ঘ        উৎ+ঘাটন = উদ্‌ঘাটন।
ত্+য = দ্+য        উৎ+যোগ = উদ্‌যোগ/উদ্যোগ।
ত্+ব = দ্+ব        উৎ+বোধন = উদ্‌বোধন।
ত্+র = দ্+র        তৎ+রূপ = তদ্রূপ।
  
 ৮. ঙ, ঞ, ণ, ন, ম পরে থাকলে পূর্ববর্তী অঘোষ অল্পপ্রাণ স্পর্শধ্বনি সেই বর্গের ঘোষ স্পর্শধ্বনি কিংবা নাসিক্যধ্বনি হয়।
ক্+ন = গ/ঙ+ন      দিক+নির্ণয় = দিগ্‌নির্ণয়/দিঙ্‌নির্ণয়।
ত্+ম = দ/ন+ম       তৎ+মধ্যে = তদ্‌মধ্যে/তন্মধ্যে।

৯. ম-এর পরে যে-কোনো বর্গীয় ধ্বনি থাকলে ম্ ধ্বনিটি সেই বর্গের নাসিক্যধ্বনি হয়।
ম্+ক = ঙ+ক্        শম্+কা = শঙ্কা।
ম্+চ্  = ঞ+চ্        সম্+চয় = সঞ্চয়।
ম্+ত্ = ন্+ত্          সম্+তাপ = সন্তাপ।

দ্রষ্টব্য—আধুনিক বাংলায় ম্-এর পরে কণ্ঠ বর্গীয় ধ্বনি থাকলে ম্-এর স্থানে সাধারণত অনুস্বার (ং) হয়।
সম্+গত = সংগত,    অহম্+কার = অহংকার।

১০. ম-এর পরে অন্তঃস্থ ধ্বনি য, র, ল, ব কিংবা শ, ষ, স, হ থাকলে ম-এর জায়গায় অনুস্বার (ং) বসে। যেমন—সম্+যোগ = সংযোগ, সম্+সার = সংসার

১১. চ্ ও জ্-এর পরের নাসিক্যধ্বনি তালব্যধ্বনিতে রূপান্তরিত হয়।
চ্+ন = চ্+ঞ           যাচ্+না = যাচ্‌ঞা।
জ্+ন = জ্+ঞ        যজ্+ন = যজ্ঞ।

১২. দ ও ধ-এর পরে বর্গের প্রথম বা দ্বিতীয় বর্ণ থাকলে ‘দ’ ও ‘ধ’ অঘোষ অল্পপ্রাণ ধ্বনি হয়।
দ্>ত্             তদ্+কাল = তৎকাল।
ধ্>ত্             ক্ষুধ্+পিপাসা = ক্ষুৎপিপাসা।

১৩. দ্ কিংবা ধ্-এর পরে স থাকলে দ্ ও ধ্-এর স্থানে অঘোষ অল্পপ্রাণ ধ্বনি হয়। যেমন—বিপদ্+সংকেত = বিপৎসংকেত,  তদ্+সম = তৎসম।

১৪. ষ-এর পরে ত্ বা থ্ থাকলে তা যথাক্রমে ‘ট’ ও ‘ঠ’-তে রূপান্তরিত হয়।
যেমন—কৃষ্+তি = কৃষ্টি,    ষষ্+থ = ষষ্ঠ।

বিশেষ নিয়মে সাধিত সন্ধি :
উৎ+স্থান = উত্থান, সম্+কার = সংস্কার।
পরি+কার = পরিষ্কার, সম্+কৃত = সংস্কৃত।

কতগুলো নিপাতনে সিদ্ধ সন্ধি :
পর+পর = পরস্পর, বন+পতি = বনস্পতি।
গো+পদ = গোষ্পদ, আ+চর্য = আশ্চর্য।
বৃহৎ+পতি = বৃহস্পতি, তৎ+কর = তস্কর।
মনস্+ঈষা = মনীষা, ষট্+দশ = ষোড়শ।
এক্+দশ = একাদশ, পতৎ+অঞ্জলি = পতঞ্জলি।

বিসর্গ সন্ধি

সংস্কৃত ছাড়া অন্য শব্দে বিসর্গ সন্ধি নেই। সংস্কৃত সন্ধির নিয়মে পদের অন্তস্থিত র্ ও স্ অনেক ক্ষেত্রে অঘোষ উষ্মধ্বনি অর্থাৎ হ ধ্বনির মতো উচ্চারিত হয় এবং তা বিসর্গরূপে লেখা হয়। র্ ও স ব্যঞ্জনধ্বনির অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় বিসর্গ সন্ধিও ব্যঞ্জনসন্ধির অন্তর্গত। সহজ কথায় বিসর্গ হচ্ছে র্ ও স-এর সংক্ষিপ্ত রূপ।
বিসর্গ সন্ধি দুইভাবে গঠিত হয়—বিসর্গ+স্বর, বিসর্গ+ব্যঞ্জন।

বিসর্গ ও স্বরের সন্ধি

অ ধ্বনির পরে অবস্থিত অঘোষ উষ্মধ্বনি বিসর্গের পরে অ ধ্বনি থাকলে অ, ঃ,  অ মিলে ও-কার হয়। যেমন—
ততঃ+অধিক = ততোধিক। 

বিসর্গ ও ব্যঞ্জনের সন্ধি

১. অ-কারের পরে অবস্থিত স্-জাত বিসর্গের পর ঘোষ অল্পপ্রাণ ও ঘোষ মহাপ্রাণ ব্যঞ্জনধ্বনি, নাসিক্যধ্বনি বা য, ব, র, ল, হ থাকলে অ-কার ও স্-জাত বিসর্গ উভয় স্থানে ও-কার হয়। যেমন—
তিরঃ+ধান = তিরোধান, মনঃ+রম = মনোরম।
তপঃ+বন = তপোবন।

২. অ-কারের পরে অবস্থিত র্-জাত বিসর্গের পরে উপরিউক্ত ধ্বনিসমূহের যে-কোনো একটি থাকলে বিসর্গের স্থানে র্ বসে। যেমন—
অন্তঃ+গত = অন্তর্গত, পুনঃ+আয় = পুনরায়।
অহঃ+অহ = অহরহ , পুনঃ+জন্ম = পুনর্জন্ম।

৩. অ কিংবা আ ছাড়া অন্য স্বরের পরে বিসর্গ থাকলে ও তার সঙ্গে অ, আ, বর্গীয় ঘোষবর্ণ অল্পপ্রাণ ও ঘোষ মহাপ্রাণ নাসিক্যধ্বনি কিংবা য, র, ল, ব, হ থাকলে বিসর্গের স্থানে র বসে।
যেমন—আশীঃ+বাদ = আশীর্বাদ, দুঃ+যোগ = দুর্যোগ।

দ্রষ্টব্য—ই বা উ ধ্বনির পরের বিসর্গের সঙ্গে র ধ্বনির সন্ধি হলে বিসর্গের বিলোপ ঘটে এবং বিসর্গের আগের হ্রস্ব স্বর দীর্ঘ হয়।
যেমন—নিঃ+রব = নীরব, নিঃ+রস = নীরস।

৪. বিসর্গের পরে অঘোষ অল্পপ্রাণ কিংবা মহাপ্রাণ তালব্য ব্যঞ্জনধ্বনি থাকলে বিসর্গের স্থানে তালব্য শিস ধ্বনি হয়। অঘোষ অল্পপ্রাণ বা অঘোষ মহাপ্রাণ মূর্ধন্য ব্যঞ্জন থাকলে বিসর্গের স্থানে মূর্ধন্য শিস ধ্বনি হয়, অঘোষ অল্পপ্রাণ কিংবা অঘোষ মহাপ্রাণ দন্ত্য ব্যঞ্জনের স্থানে দন্ত্য শিস ধ্বনি হয়।
ঃ+চ/ছ = শ+চ/ছ      শিরঃ+ছেদ = শিরশ্ছেদ।
ঃ+ট/ঠ = ষ+ট/ঠ       নিঃ+ঠুর = নিষ্ঠুর।
ঃ+ত/থ = স+ত/থ      দুঃ+থ = দুস্থ।

৫. অঘোষ অল্পপ্রাণ কিংবা অঘোষ মহাপ্রাণ কণ্ঠ্য বা ওষ্ঠ্য ব্যঞ্জন (ক, খ, প, ফ) পরে থাকলে অ বা আ ধ্বনির পরে অবস্থিত বিসর্গের স্থানে অঘোষ দন্ত্য শিস ধ্বনি (স্) হয় এবং অ বা আ ছাড়া অন্য স্বরধ্বনির পরে অবস্থিত বিসর্গের স্থানে অঘোষ মূর্ধন্য শিস ধ্বনি (ষ) হয়।
অ ধ্বনির পরে বিসর্গ+ক = স্+ক  নমঃ+কার = নমস্কার।
অ ধ্বনির পরে বিসর্গ+খ = স্+খ   পদঃ+খলন = পদস্খলন।
ই ধ্বনির পরে বিসর্গ+ক = ষ+ক     নিঃ+কর = নিষ্কর।
উ ধ্বনির পরে বিসর্গ+ক = ষ+ক     দুঃ+কর = দুষ্কর।

৬. কখনো কখনো সন্ধির ক্ষেত্রে বিসর্গ লোপ পায় না। যেমন—প্রাতঃ+কাল = প্রাতঃকাল, মনঃ+কষ্ট = মনঃকষ্ট।

কয়েকটি বিশেষ বিসর্গ সন্ধির উদাহরণ :
বাচঃ+পতি = বাচস্পতি, অহঃ+নিশা = অহর্নিশ।