দিক ও দিগ-এর ব্যবহার

দিকদিক হচ্ছে সমাস ও সন্ধিতে ক, খ, চ, ছ, ত, থ, প, ফ, শ, ষ, স ইত্যাদি বর্ণের আগে ব্যবহৃত দিগ-এর আরেক রূপ।
উপরিউক্ত যে-কোনো বর্ণের আগে দিগ-এর পরিবর্তে দিক বসবে। যেমন—
১. দিক্+চক্র = দিকচক্র
২. দিক্+পাল = দিকপাল
৩. দিক্+শূল = দিকশূল

দিগদিগ হচ্ছে সমাস ও সন্ধিতে গ, ঘ, ঙ, জ, ঝ, ড, ঢ, দ, ধ, ন, ব, ভ, ম, য, য়, র, ল, হ ইত্যাদি বর্ণের আগে ব্যবহৃত দিক-এর রূপ।
উপরিউক্ত যে-কোনো বর্ণের আগে দিক-এর স্থানে দিগ বসবে।
যেমন—
১. দিক্+অন্ত = দিগন্ত
২. দিক্+অন্তর = দিগন্তর
৩. দিক্+অম্বর = দিগম্বর
৪. দিক্+গজ = দিগ্‌গজ
৫. দিক্+দর্শন = দিগ্‌দর্শন
৬. দিক্+দিগন্ত = দিগ্‌দিগন্ত
৭. দিক্+বিদিক = দিগ্‌বিদিক
৮. দিক্+ভ্রম = দিগ্‌ভ্রম

দ্রষ্টব্যক. সন্ধিতে ঙ, ঞ, ণ, ন, ম ধ্বনি পরে থাকলে আগের অঘোষ অল্পপ্রাণ স্পর্শধ্বনি সেই বর্গীয় নাসিক্যধ্বনি হয়।
যেমন—
১. দিক্+নির্ণয় = দিঙ্‌নির্ণয়
২. দিক্+নাগ = দিঙ্‌নাগ

খ. স্বরধ্বনি থাকলেও দ্বিতীয় নিয়ম প্রযোজ্য হবে।

মধ্যে ও মাঝে-এর পার্থক্য

মধ্যে ও মাঝে শব্দ দুটি প্রায় একই অর্থ প্রকাশ করে। কিছু ক্ষেত্রে একটিকে অপরটির পরিপূরক হিসেবে ব্যবহার করা গেলেও সবখানেই মধ্যে ও মাঝে একে অন্যের পরিপূরক নয়।

মধ্যে—অভ্যন্তর বা দুটির তুলনায় সাধারণত মধ্যে শব্দটি ব্যবহৃত হয়। যেমন—
১. সে চুপিচুপি ঘরের মধ্যে প্রবেশ করল।
২. দুইমাসের মধ্যে কাজটি শেষ কোরো।

মাঝে—কেন্দ্রবিন্দু বা সময়কাল বোঝাতে সাধারণত মাঝে শব্দটি ব্যবহৃত হয়। যেমন—
১. মাঝে মাঝে সে গ্রামে বেড়াতে আসে।
২. সে মরুভূমির মাঝে পানির জন্য দৌড়াতে লাগল।
৩. এখন সে সুখে আছে, মাঝে তো কারাগারেও ছিল।

দ্রষ্টব্য—মাঝে মাঝে’র পরিবর্তে ‘মাঝে মধ্যে’ও ব্যবহার করা যায়।

কিছু ক্ষেত্রে উভয় শব্দই ব্যবহার করা যায়। যেমন—
১. ওদের মধ্যে/মাঝে রাতুলই বুদ্ধিমান।
২. তাঁর মধ্যে/মাঝে বিশেষ কিছু আছে যা আমাকে আকৃষ্ট করে।

উপসর্গ কাকে বলে, কত প্রকার ও কী কী?

উপসর্গ হচ্ছে অব্যয়সূচক শব্দাংশ বা ধ্বনি যা অন্য শব্দের আগে যুক্ত হয়ে নতুন অর্থবোধক শব্দ গঠন করে। উপসর্গ নিজে স্বাধীন শব্দ বা পদ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে না—অন্য শব্দের সঙ্গে যুক্ত হয়। উপসর্গের অর্থবাচকতা নেই কিন্তু অর্থদ্যোতকতা আছে

১. বাংলা উপসর্গ : বাংলা ভাষার নিজস্ব (খাঁটি বাংলা) উপসর্গ মোট ২১ টি।

নামঅর্থদ্যোতনাউদাহরণ
নয়, মন্দতাঅকাজ, অমিল, অসীম
অঘাবোকাঅঘামার্কা, অঘারাম, অঘাচণ্ডী
অজনিতান্ত (মন্দ)অজমূর্খ, অজপুকুর, অজপাড়াগাঁ
অনামন্দতা, অভাব, অদ্ভুত অনাবৃষ্টি, অনাসৃষ্টি, অনামুখো
আড়বাঁকা, প্রায়আড়পাগলা, আড়চোখা, আড়মোড়া
আননয়, বিক্ষিপ্ত আনকোরা, আনচান, আনমনা
আবঅস্পষ্টতাআবছায়া, আবডাল,
ইতিএ বা এর, পুরাতন ইতিকর্তব্য, ইতিকথা, ইতিহাস
উনকমউনপাঁজুরে, উনপঞ্চাশ
কুমন্দতাকুনজর, কুমতলব, কুখ্যাত, কুদৃষ্টি
নিনেই, নেতিবাচক নিখুঁত, নিখাদ
পাতিক্ষুদ্রপাতিলেবু, পাতিহাঁস, পাতিনেতা
ভরপূর্ণভরপেট, ভরদুপুর
রামবড়ো, উৎকৃষ্ট রামছাগল, রামদা
সাউৎকৃষ্টসাজোয়া
হাঅভাবহাঘরে, হাপিত্যেশ, হাভাতে
অভাব, বাজে, নিকৃষ্ট আধোয়া, আগাছা, আকাল
কদ্নিকৃষ্ট কদাচার, কদাকার, কদর্য
বিনেই, নিন্দনীয় বিপথ, বিকল, বিফল
সঙ্গে, অতিশয়সরব, সঠিক, সজোর, সপরিবার
সুভালো, উৎকৃষ্ট সুখবর, সুদিন, সুপাঠ্য

২. সংস্কৃত উপসর্গ : সংস্কৃত থেকে বাংলায় এসেছে এমন উপসর্গ মোট ২০ টি।

নামঅর্থদ্যোতনাউদাহরণ
প্রপ্রকৃষ্ট, সম্যক, আধিক্য, খ্যাতিপ্রচলন, প্রদান, প্রভাব, প্রতাপ, প্রগাঢ় , প্রস্থান
পরাবিপরীত, আতিশয্য পরাভব, পরাজয়, পরাশক্তি, পরাভূত
অপবিপরীত, অপকর্ষ, দূরীকরণ অপচয়, অপমান, অপকার, অপসারণ
সম্সন্নিবেশ, সম্যক, অভিমুখী, আতিশয্য সংগঠন, সংকলন, সঞ্চয়, সমাদর, সমর্থন
নিআধিক্য, পুরোপুরি, নিচে নিপীড়ন, নিদারুণ, নিশ্চুপ, নিস্তব্ধ, নিবিষ্ট, নিপাত, নিক্ষেপ
অবনিম্নমুখিতা, মন্দ, সম্যকঅবরোধ, অবতরণ, অবগাহন, অবনতি, অবজ্ঞা, অবক্ষয়
অনুপরে, নিরন্তরতা, অভিমুখী, সাদৃশ্য অনুতাপ, অনুশোচনা, অনুগামী, অনুসরণ, অনুকূল, অনুলিপি
নিঃঅভাব, বিশেষভাবে, বহির্মুখিতা নিরক্ষর, নিরপরাধ, নিরহংকার, নিষ্পন্ন
দুঃমন্দ, অভাব, কঠিন, আধিক্য দুঃসাহস, দুর্দান্ত, দুর্দমনীয়, দুর্নীতি, দুস্তর, দুষ্কর্ম
বিসম্যক, বিপরীত, ভিন্ন, অভাব বিফল, বিকর্ষণ, বিবর্ণ, বিশৃঙ্খল, বিকার, বিজ্ঞান
অধিপ্রধান, মধ্যে অধিপতি, অধিনায়ক, অধিকার, অধিষ্ঠিত
সুভালো, সহজ, আতিশয্য সুগন্ধ, সুগঠিত, সুমতি, সুনাম, সুতীব্র
উৎওপরের দিক, অপকর্ষ, আতিশয্য উল্লিখিত, উন্নতি, উদ্‌বোধন
পরিচতুর্দিক, সম্পূর্ণ পরিভ্রমণ, পরিক্রমা, পরিতৃপ্ত, পরিত্যক্ত
প্রতিবিপরীত, সাদৃশ্য, পৌনঃপুনিকতা প্রতিপক্ষ, প্রতিরক্ষা, প্রতিদিন, প্রতিচ্ছবি, প্রতিদান
উপনিকট, অপ্রধান, সম্যক উপকূল, উপকণ্ঠ, উপভাষা, উপভোগ, উপাচার্য, উপবন
পর্যন্ত, ঈষৎ আকণ্ঠ, আমরণ, আনত, আরক্ত
অভিসম্যক, গমনঅভিব্যক্তি, অভিযান, অভিসার
অপিব্যাকরণের সূত্রঅপিনিহিতি
অতিআতিশয্য, অতিক্রম অতিশয়, অতিমানব, অতিপ্রাকৃত

৩. ফারসি উপসর্গ : বাংলায় বহুল ব্যবহৃত ফারসি উপসর্গগুলো হলো :

নামঅর্থদ্যোতনাউদাহরণ
কারকাজকারবার, কারখানা, কারসাজি
খোশআনন্দদায়কখোশগল্প, খোশমেজাজ
দরকম, নিম্নস্থদরকাঁচা, দরদালান, দরপাট্টা
নানয়নারাজ, নাচার, নাবালক, নাহক
নিমঅর্ধ বা প্রায় নিমরাজি, নিমখুন
ফিপ্রত্যেকফি-বছর, ফি-হপ্তা
সহ বা সঙ্গে বকলম, বমাল
বদমন্দ, উগ্রবদমেজাজ, বদনাম, বদনসিব, বদমায়েশ, বদভ্যাস
বেনেই, খারাপ, ভিন্ন বেআক্কেল, বেহুঁশ, বেশরম, বেতার, বেকার

৪. আরবি উপসর্গ : বাংলায় বহুল ব্যবহৃত আরবি উপসর্গগুলো হলো :

নামঅর্থদ্যোতনাউদাহরণ
আমসর্বসাধারণআমজনতা, আমদরবার, আমরাস্তা
খাসব্যক্তিগতখাসকামরা, খাসমহল, খাসদখল
লানা, নেই লাপাত্তা, লাখেরাজ, লাওয়ারিশ
গরনেই, ভুল গরমিল, গররাজি, গরহাজির

৫. ইংরেজি উপসর্গ : বাংলায় বহুল ব্যবহৃত ইংরেজি উপসর্গগুলো হলো :

নামঅর্থদ্যোতনাউদাহরণ
ফুলপুরোফুলপ্যান্ট, ফুলমোজা
হাফঅর্ধেকহাফটিকিট, হাফপ্যান্ট
হেডপ্রধান হেডমাস্টার, হেডপণ্ডিত
সাবঅধীন, অপ্রধান সাব-রেজিস্ট্রার, সাব-অর্ডিনেট, সাব-অফিস, সাব-জোনাল

৬. উর্দু ও হিন্দি উপসর্গ : বাংলায় ব্যবহৃত হিন্দি ও উর্দু উপসর্গ ১ টি।

নামঅর্থদ্যোতনাউদাহরণ
হরপ্রত্যেক, বিভিন্ন হররোজ, হরকিসিম, হরহামেশা

ল্লিখিত উদ্‌বোধন দুটি বহুল ব্যবহৃত উপসর্গযুক্ত শব্দ যা আমরা ভুুল করি।

দূ ও দু-এর ব্যবহার

দ-য়ে দীর্ঘ ঊ-কারযুক্ত শব্দের বানান ভুল না করলেও দ-য়ে হ্রস্ব উ-কারযুক্ত শব্দের বানান আমরা প্রায়ই ভুল করি। চলুন জেনে নিই এই ভুল থেকে বাঁচার একটি সহজ উপায়।

দূ—দূরত্ব বোঝায় এমন সকল শব্দে দ বর্ণের সাথে দীর্ঘ ঊ-কার যুক্ত হবে। যেমন—দূর, দূরত্ব, দূরবর্তী, দূরবীক্ষণ, দূরপাল্লা, দূরদৃষ্টি, দূরদর্শী। ব্যতিক্রম—দুরবিন।

দু—দু বা দুঃ হচ্ছে উপসর্গ। দু বা দুঃ দ্বারা মন্দ ও কষ্টসাধ্য বিষয় নির্দেশ করে। যেমন—দুর্দান্ত, দুর্দিন, দুর্বিপাক, দুর্বোধ্য, দুর্বল, দুর্দমনীয়, দুর্যোগ, দুর্নীতি, দুর্ঘটনা, দুঃখ, দুর্বিষহ, দুর্বিনীত, দুঃসাধ্য, দুঃসহ, দুঃস্বপ্ন, দুরবস্থা, দুরাত্মা, দুঃসময়, দুরারোগ্য, দুরাশা, দুরাচার, দুর্ধর্ষ, দুর্গন্ধ, দুর্গম, দুর্দশা, দুর্নাম, দুর্ব্যবহার, দুর্ভিক্ষ, দুর্ভোগ, দুশ্চিন্তা, দুস্থ, দুষ্প্রাপ্য।

ম-ফলার উচ্চারণ

১. পদের প্রথমে ম-ফলা থাকলে সে বর্ণের উচ্চারণে কিছুটা ঝোঁক পড়ে এবং সামান্য নাসিক্যস্বর হয়। যেমন—
শ্মশান (শঁশান্), স্মরণ (শঁরোন্)।

কখনো কখনো ম-ফলা অনুচ্চারিত থাকতেও পারে। যেমন—স্মৃতি (সৃঁতি)।

২. পদের মধ্যে বা শেষে ম-ফলা যুক্ত হলে উচ্চারণে সে বর্ণের দ্বিত্ব হয় এবং সামান্য নাসিক্যস্বর হয়। যেমন—আত্মীয় (আত্‌তিঁয়ো), পদ্ম (পদ্‌দোঁ), বিস্ময় (বিশ্‌শঁয়), ভস্ম (ভশ্‌শোঁ), রশ্মি (রোশ্‌শিঁ)।

৩. গ, ঙ, ট, ণ, ন বা ল বর্ণের সঙ্গে ম-ফলা যুক্ত হলে ম-এর উচ্চারণ বজায় থাকে। যুক্ত ব্যঞ্জনের প্রথম বর্ণের স্বর লুপ্ত হয়। যেমন—বাগ্মী (বাগ্‌মি), মৃন্ময় (মৃন্‌ময়), জন্ম (জন্‌মো), গুল্ম (গুল্‌মো), যুগ্ম (জুগ্‌মো)।