কারক কাকে বলে, কত প্রকার ও কী কী? | বিভক্তি

কারক ব্যাকরণের একটি অন্যতম অংশ। কারক শব্দের অর্থ—যা ক্রিয়া সম্পাদন করে। কর্তা বা ক্রিয়ার সঙ্গে অনেককিছু মিলেই একটি বাক্যের পূর্ণ অর্থ প্রকাশ করে। এর প্রত্যেকটি অংশই কারক।
কারক ৬ প্রকার—১. কর্তৃকারক  ২. কর্মকারক  ৩. করণ কারক  ৪. সম্প্রদান কারক  ৫. অপাদান কারক  ৬. অধিকরণ কারক।

জামাল সাহেব রোজ সকালে ভান্ডার থেকে নিজ হাতে এতিমদেরকে টাকা দান করেন।
এখানে :
জামাল সাহেব—কর্তৃসম্বন্ধ
টাকা—কর্মসম্বন্ধ
হাত—করণসম্বন্ধ
এতিমদেরকে—সম্প্রদানসম্বন্ধ
ভান্ডার থেকে—অপাদানসম্বন্ধ
রোজ সকালে—অধিকরণসম্বন্ধ

বিভক্তি : বাক্যে অবস্থিত একটি শব্দের সঙ্গে অন্য শব্দের সংযোগ ঘটানোর জন্যে যে শব্দাংশ শব্দের সঙ্গে যুক্ত হয় তাকে বিভক্তি বলে। বিভক্তি ছাড়া বাক্যের যথাযথ অর্থ প্রকাশ করা সম্ভব নয়। ভিখারিকে ভিক্ষে দাও। এখানে ভিখারি শব্দের সঙ্গে কে বিভক্তি যুক্ত হয়েছে। বিভক্তি যুক্ত না হলে অবস্থা দাঁড়াত—ভিখারি ভিক্ষে দাও। তখন এই বাক্যের অর্থ স্পষ্ট হতো না।

বিভক্তিসংকেত
প্রথমাঅ, এ, য়, তে
দ্বিতীয়াকে, রে, এরে
তৃতীয়াদ্বারা, দিয়ে, কর্তৃক
চতুর্থীকে, রে, এরে
পঞ্চমীহতে, থেকে, চেয়ে
ষষ্ঠীর, এর
সপ্তমীএ, য়, তে, এতে
বিভক্তিসমূহ

কর্তৃকারক

বাক্যের অন্তর্গত যে বিশেষ্য বা সর্বনাম পদ ক্রিয়া সম্পাদন করে তাকে কর্তৃকারক বলে। ক্রিয়াকে কে বা কারা দ্বারা প্রশ্ন করলে যে উত্তর পাওয়া যায় তাকে কর্তৃকারক বলে।
১. জিসান বই পড়ে। (কে বই পড়ে?)

কর্তৃকারক ৪ প্রকার :

মুখ্যকর্তা

যে নিজেই ক্রিয়া সম্পাদন করে তাকে মুখ্যকর্তা বলে।
১. পাখিরা আকাশে ওড়ে।
২. মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে।

প্রযোজক কর্তা

মূল কর্তা যখন অন্যকে দিয়ে ক্রিয়া সম্পাদন করায় তখন তাকে (মূল কর্তা) প্রযোজক কর্তা বলে।
মা শিশুকে চাঁদ দেখাচ্ছেন। এখানে মা প্রযোজক কর্তা।

প্রযোজ্য কর্তা

মূল কর্তা যাকে দিয়ে ক্রিয়া সম্পাদন করায় তাকে প্রযোজ্য কর্তা বলে।
১. মা শিশুকে চাঁদ দেখাচ্ছেন।
২. শিক্ষক ছাত্রকে পড়াচ্ছেন।

ব্যতিহার কর্তা

বাক্যের দুটি কর্তা যখন একইসঙ্গে একই কাজ করে তখন তাকে ব্যতিহার কর্তা বলে।
১. রাজায়-রাজায় লড়াই হয়।
২. বাঘে-মহিষে এক ঘাটে জল খায়।

কর্তৃকারকে বিভিন্ন বিভক্তির প্রয়োগ

প্রথমা বিভক্তি : শিহাব বই পড়ে
দ্বিতীয়া বিভক্তি : সুমনকে কাজ করতে হবে।
তৃতীয়া বিভক্তি : রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক গীতাঞ্জলি রচিত হয়েছে।
ষষ্ঠী বিভক্তি : আমার যাওয়া হবে না।
সপ্তমী বিভক্তি : পাগলে কী না বলে।

কর্মকারক

যাকে আশ্রয় করে কর্তা ক্রিয়া সম্পাদন করে তাকে কর্মকারক বলে। ক্রিয়াকে কী বা কাকে দ্বারা প্রশ্ন করলে যে উত্তর পাওয়া যায় সেটাই কর্মকারক।
১. রাজিব বই পড়ছে (কী পড়ছে?)।
২. হাতি কলাগাছ খায় (কী খায়?)।

কর্মকারকে বিভিন্ন বিভক্তির প্রয়োগ

প্রথমা বিভক্তি : ডাক্তার ডাকো।
দ্বিতীয়া বিভক্তি : আমি তাকে সংবাদ দিয়েছি।
ষষ্ঠী বিভক্তি : ছেলেটি বলের সঙ্গে যুদ্ধ করছে।
সপ্তমী বিভক্তি : জিজ্ঞাসিব জনে জনে

করণ কারক

ক্রিয়া সম্পাদনের ক্ষেত্রে যা প্রধান সহায় তাকে করণ কারক বলে। ক্রিয়াকে দ্বারা, দিয়ে, কর্তৃক ইত্যাদি প্রশ্ন করলে যে উত্তর পাওয়া যায় তাকে করণ কারক বলে, অর্থাৎ কর্তা যার দ্বারা ক্রিয়া সম্পাদন করে সে-ই করণ কারক।
১. ছেলেরা বল খেলে (বল দ্বারা খেলে)।
২. আম্ফানে সব লন্ডভন্ড হয়ে গেল (আম্ফানের দ্বারা)।
৩. মায়ের কথা মধুমাখা (মধু দিয়ে মাখা)।

করণ কারকে বিভিন্ন বিভক্তির প্রয়োগ

প্রথমা বিভক্তি : ছেলেরা বল খেলে।
তৃতীয়া বিভক্তি : মন দিয়ে করো সবে বিদ্যা অর্জন।
পঞ্চমী বিভক্তি : এই ব্যাবসা হতে তোমার বেশ লাভ হবে।
ষষ্ঠী বিভক্তি : কুকুরটাকে লাঠির আঘাত কোরো না।
সপ্তমী বিভক্তি : আকাশ মেঘে ঢাকা।

সম্প্রদান কারক

যখন স্বত্ব ত্যাগ করে কাউকে কোনোকিছু দান করা হয় তখন দান গ্রহণকারী ব্যক্তিকেই সম্প্রদান কারক বলে।
১. ভিখারিকে ভিক্ষে দাও।
২. অন্ধজনে দেহ আলো।
৩. ক্ষুধার্তকে খাবার দাও।

সম্প্রদান কারকে বিভিন্ন বিভক্তির প্রয়োগ

প্রথমা বিভক্তি : গুরুদক্ষিণা দাও।
চতুর্থী বিভক্তি : অসহায়কে সাহায্য করো।
ষষ্ঠী বিভক্তি : গরিবদের অন্ন দাও।
সপ্তমী বিভক্তি : দীনে দয়া করো।

তবে সম্পূর্ণ স্বত্ব ত্যাগ করে না দিলে তা সম্প্রদান কারক হবে না। যেমন—ধোপাকে কাপড় দাও। এখানে স্বত্ব ত্যাগ করে দেওয়া হচ্ছে না।

অপাদান কারক

যা কোনোকিছু থেকে বিচ্যুত, পতিত, গৃহীত, জাত, রক্ষিত, বিরত, দূরীভূত, উৎপন্ন তাকে অপাদান কারক বলে। সাধারণভাবে ক্রিয়াকে ‘কোথা হতে’ দ্বারা প্রশ্ন করলে যে উত্তর পাওয়া যায় তাকে অপাদান কারক বলে।
বিচ্যুত : গাছ থেকে পাতা ঝরে।
পতিত : মেঘে বৃষ্টি হয়।
গৃহীত : ঝিনুক থেকে মুক্তো মেলে।
জাত : খেত থেকে সবজি পাই।
রক্ষিত : বিপদে মোরে রক্ষা করো।
বিরত : পাপে বিরত হও।
দূরীভূত : দেশ থেকে করোনা বিদায় হলো।
উৎপন্ন : তিলে তেল হয়।
ভীত : সুন্দরবনে বাঘের ভয় আছে।

অপাদান কারকে বিভিন্ন বিভক্তির প্রয়োগ

প্রথমা বিভক্তি : উড়োজাহাজ বিমানবন্দর ছাড়ল।
দ্বিতীয়া বিভক্তি : মাকে খুব ভয় পাই।
তৃতীয়া বিভক্তি : শিশুটির চোখ দিয়ে জল পড়তে লাগল।
পঞ্চমী বিভক্তি : ঝিনুক থেকে মুক্তো মেলে।
ষষ্ঠী বিভক্তি : বাঘের ভয়ে সবাই আতঙ্কিত।
সপ্তমী বিভক্তি : দুধে ঘি হয়।

অধিকরণ কারক

যে স্থানে, যে কালে বা যে বিষয়ে ক্রিয়া সম্পন্ন হয় তাকে অধিকরণ কারক বলে। ক্রিয়াকে কখন, কোথায়, কীসে ইত্যাদি দ্বারা প্রশ্ন করলে যে উত্তর পাওয়া যায় তা-ই অধিকরণ কারক। যেমন—বনে বাঘ আছে, শীতে তালের রস পাওয়া যায়। অধিকরণ কারক ৪ প্রকার :

ঐকদেশিক/স্থানাধিকরণ

যে স্থানে ক্রিয়া সম্পন্ন হয় তাকে ঐকদেশিক/স্থানাধিকরণ কারক বলে।
১. বনে বাঘ আছে (বনের কোনো এক জায়গায়)।
২. পুকুরে মাছ আছে (পুকুরের কোনো এক অংশে)।

কালাধিকরণ

যে কাল বা সময়ে ক্রিয়া সম্পন্ন হয় তাকে কালাধিকেণ কারক বলে।
১. বসন্তে নানান ফুল ফোটে।
২. মাঘ মাসে বেশ শীত থাকে।

বিষয়াধিকরণ

যে বিষয়ে দক্ষতা বা অক্ষমতা প্রকাশ করা হয় তাকে বিষয়াধিকরণ কারক বলে।
১. রাতুল অঙ্কে কাঁচা।
২. সে বাংলায় বেশ দক্ষ।

ভাবাধিকরণ

একটি ক্রিয়া অন্যটির ওপর নির্ভর করলে নির্ভরশীল ক্রিয়াটি ভাববাচকে রূপান্তরিত হয়ে অধিকরণ হলে তাকে ভাবাধিকরণ কারক বলে।
১. কান্নায় শোক মন্দীভূত হয়।

অধিকরণ কারকে বিভিন্ন বিভক্তির প্রয়োগ

প্রথমা বিভক্তি : আমি আগামীকাল বাড়ি যাব।
দ্বিতীয়া বিভক্তি : মন আমার নাচেরে আজিকে
তৃতীয়া বিভক্তি : খিলিপান (এর ভেতরে ভরে) দিয়ে ওষুধ খাবে।
পঞ্চমী বিভক্তি : বাড়ি থেকে নদী দেখা যায়।
সপ্তমী বিভক্তি : বনে বাঘ আছে।



সন্ধি কাকে বলে, কত প্রকার ও কী কী?

সন্ধি শব্দের  অর্থ মিলন। পাশাপাশি অবস্থিত দুটি ধ্বনির মিলনকে সন্ধি বলে। সন্ধির ফলে শব্দের মাধুর্য বৃদ্ধি পায়। তবে মূল শব্দের অর্থ তেমন লোপ পায় না।

বাংলা শব্দের সন্ধি

বাংলা শব্দের মাধুর্য বৃদ্ধির জন্যে যে সন্ধির উদ্ভব তাকে বাংলা শব্দের সন্ধি বলে। বাংলা শব্দের সন্ধি ২ প্রকার—স্বরসন্ধি, ব্যঞ্জনসন্ধি।

স্বরসন্ধি

স্বরধ্বনির সঙ্গে স্বরধ্বনির মিলনের ফলে যে সন্ধি হয় তাকে স্বরসন্ধি বলে। স্বরসন্ধিতে ধ্বনি লোপ পেয়ে নতুন ধ্বনি গঠনের নিয়ম :
১. অ+এ = এ          শত+এক = শতেক।
২. আ+আ = আ     সোনা+আলি = সোনালি।
৩. আ+উ = উ         মিথ্যা+উক = মিথ্যুক।
৪. ই+এ = ই            কুড়ি+এক = কুড়িক।

মাঝে মাঝে শেষের ধ্বনিটি লোপ পায়। যেমন—যা+ইচ্ছা+তাই = যাচ্ছেতাই।

ব্যঞ্জনসন্ধি

স্বরধ্বনি ও ব্যঞ্জনধ্বনি, ব্যঞ্জনধ্বনি ও ব্যঞ্জনধ্বনি, ব্যঞ্জনধ্বনি ও স্বরধ্বনির মিলনে যে সন্ধি হয় তাকে ব্যঞ্জনসন্ধি বলে।
১. প্রথম ধ্বনি অঘোষ ও পরের ধ্বনিটি ঘোষ হলে দুটির মিলনে ঘোষ ধ্বনির দ্বিত্ব হয়। যেমন—ছোট+দা = ছোড়দা।
২. হলন্ত র্ ধ্বনির পরে অন্য ব্যঞ্জনধ্বনি থাকলে র্ ধ্বনি লোপ পেয়ে পরের ধ্বনির দ্বিত্ব হয়। যেমন—চার+টি = চাট্টি, ধর্+না = ধন্না, দুর+ছাই = দুচ্ছাই।
৩. চ বর্গীয় ধ্বনির (চ, ছ, জ, ঝ, ঞ) আগে ত বর্গীয় ধ্বনি থাকলে ত বর্গীয় ধ্বনিটি লোপ পায় এবং চ বর্গীয় ধ্বনির দ্বিত্ব হয়। যেমন—বদ্+ জাত = বজ্জাত, হাত+ছানি = হাচ্ছানি।
৪. প ধ্বনির পরে ‘চ’ বা ‘স’ ও তারপরে ত থাকলে ‘চ’ ও ‘ত’ ধ্বনি মিলে তালব্য শ হয়। যেমন—পাঁচ+শ = পাঁশ্‌শ, সাত+শ = সাশ্‌শ, পাঁচ+সিকা = পাঁশশিকা।
৫. হলন্ত ধ্বনির সঙ্গে স্বরধ্বনি যুক্ত হলে স্বরের কোনো লোপ ঘটে না। যেমন—বোন+আই = বোনাই, চুন+আরি = চুনারি, বার+এক = বারেক।
৬. স্বরধ্বনির পরে ব্যঞ্জনধ্বনি থাকলে স্বরধ্বনিটি লোপ পায়। যেমন—কাঁচা+কলা = কাঁচকলা, নাতি+বউ = নাতবউ, ঘোড়া+দৌড় = ঘোড়দৌড়।

তৎসম শব্দের সন্ধি

সংস্কৃত থেকে হুবহু বাংলায় আসা শব্দগুলো সংস্কৃত ব্যাকরণের নিয়মেই গঠিত। তৎসম শব্দ বা সংস্কৃত থেকে আসা সন্ধিবদ্ধ শব্দগুলো তিনটি উপায়ে গঠিত—স্বরসন্ধি, ব্যঞ্জনসন্ধি ও বিসর্গ সন্ধি।

স্বরসন্ধি

স্বরধ্বনির সঙ্গে স্বরধ্বনির মিলনে যে সন্ধি হয় তাকে স্বরসন্ধি বলে।
১. অ-আ, আ-আ, কিংবা আ-অ আগে-পরে যা-ই থাক দুটি মিলে সবসময় আ-কার হয়।
অ+অ = আ            প্রাণ+অধিক = প্রাণাধিক।
অ+আ = আ           সিংহ+আসন = সিংহাসন।
আ+অ = আ           আশা+অতীত = আশাতীত।
আ+আ = আ          কারা+আগার = কারাগার।

২. অ-কার বা আ-কারের পরে হ্রস্ব ই বা দীর্ঘ ঈ থাকলে দুটি মিলে এ-কার হয়।
অ+ই = এ              শুভ+ইচ্ছা = শুভেচ্ছা।
আ+ই = এ             যথা+ইষ্ট = যথেষ্ট।
অ+ঈ = এ             পরম+ঈশ = পরমেশ।
আ+ঈ = এ            মহা+ঈশ = মহেশ।

৩. অ কিংবা আ-ধ্বনির পরে হ্রস্ব উ বা দীর্ঘ ঊ যে-কোনো একটি থাকলে তা ও-কারে রূপান্তরিত হয়।
অ+উ = ও            নীল+উৎপল = নীলোৎপল।
আ+উ = ও           মহা+উৎসব = মহোৎসব।
অ+ঊ = ও           গৃহ+ঊর্ধ্ব = গৃহোর্ধ্ব।
আ+ঊ = ও          চল+ঊর্মি = চলোর্মি।

৪. অ কিংবা আ-ধ্বনির পরে ঋ-ধ্বনি থাকলে উভয় মিলে ‘অর’ হয় এবং রেফরূপে পরের বর্ণের সঙ্গে যুক্ত হয়।
অ+ঋ = অর             দেব+ঋষি = দেবর্ষি।
আ+ঋ = অর            মহা+ঋষি = মহর্ষি।

৫. অ কিংবা আ-ধ্বনির পরে ‘ঋত’ থাকলে দুটি মিলে ‘আর’ হয় এবং আগের ধ্বনিতে আ-কার—পরের ধ্বনিতে রেফ যুক্ত হয়।
অ+ঋ = আর           ভয়+ঋত = ভয়ার্ত।
আ+ঋ = আর          ক্ষুধা+ঋত = ক্ষুধার্ত।

৬. অ কিংবা আ-ধ্বনির সঙ্গে এ বা ঐ ধ্বনি যে-কোনো  যুক্ত হলে উভয় মিলে ঐ-কার হয় এবং তা প্রথম ধ্বনির সঙ্গে যুক্ত হয়।

অ+এ = ঐ     জন+এক = জনৈক।
আ+এ = ঐ    সদা+এব = সদৈব।
অ+ঐ = ঐ     মত+ঐক্য = মতৈক্য।
আ+ঐ = ঐ    মহা+ঐশ্বর্য = মহৈশ্বর্য।

৭. অ কিংবা আ-ধ্বনির পরে ও বা ঔ-ধ্বনি থাকলে উভয় মিলে ঔ-কার হয় এবং তা প্রথম ধ্বনির সঙ্গে যুক্ত হয়।
অ+ও = ঔ      বন+ওষধি = বনৌষধি।
আ+ও = ঔ     মহা+ওষধি = মহৌষধি।
অ+ঔ = ঔ     পরম+ঔষধ = পরমৌষধ।
আ+ঔ = ঔ    মহা+ঔষধ = মহৌষধ।

৮. হ্রস্ব ই-কার কিংবা দীর্ঘ ঈ-কারের পরে হ্রস্ব ই-কার বা দীর্ঘ ঈ-কার থাকলে উভয় মিলে দীর্ঘ ঈ-কার হয়।
ই+ই = ঈ        রবি+ইন্দ্র = রবীন্দ্র।
ই+ঈ = ঈ       পরি+ঈক্ষা = পরীক্ষা।
ঈ+ই = ঈ       সতী+ইন্দ্র = সতীন্দ্র।
ঈ+ঈ = ঈ       সতী+ঈশ = সতীশ।

৯. হ্রস্ব ই-কার কিংবা দীর্ঘ ঈ-কারের পরে হ্রস্ব ই-কার, দীর্ঘ ঈ-কার ছাড়া অন্য স্বর থাকলে উভয় মিলে য বা য-ফলা (্য) হয়।
ই+অ = য্+অ       অতি+অন্ত = অত্যন্ত।
ই+আ = য্+আ     ইতি+আদি = ইত্যাদি।
ই+উ = য্+উ        অতি+উক্তি = অত্যুক্তি।
ই+ঊ = য্+ঊ       প্রতি+ঊষ = প্রত্যূষ।
ই+এ = য্+এ        প্রতি+এক = প্রত্যেক।
ঈ+অ = য্+অ      নদী+অম্বু = নদ্যম্বু।

১০. হ্রস্ব উ-কার কিংবা দীর্ঘ ঊ-কারের পরে হ্রস্ব উ বা দীর্ঘ ঊ থাকলে দুটি মিলে দীর্ঘ ঊ-কার হয়।
উ+উ = ঊ        মরু+উদ্যান = মরূদ্যান।
উ+ঊ = ঊ       বহু+ঊর্ধ্ব = বহূর্ধ্ব।
ঊ+উ = ঊ       বধূ+উৎসব = বধূৎসব।
ঊ+ঊ = ঊ      ভূ+ঊর্ধ্ব = ভূর্ধ্ব।

১১. হ্রস্ব উ-কার কিংবা দীর্ঘ ঊ-কারের পরে হ্রস্ব উ বা দীর্ঘ ঊ ছাড়া অন্য কোনো স্বর থাকলে হ্রস্ব উ/দীর্ঘ ঊ-এর স্থানে ব-ফলা বসে এবং তা প্রথম ধ্বনির সঙ্গে যুক্ত হয়।
উ+অ = ব+অ        সু+অল্প = স্বল্প।
উ+আ = ব+আ      সু+আগত = স্বাগত।
উ+ই = ব+ই           অনু+ইত = অন্বিত।
উ+ঈ = ব+ঈ          তনু+ঈ = তন্বী।
উ+এ = ব+এ         অনু+এষণ = অন্বেষণ।

১২. ঋ-কারের পরে ঋ ছাড়া অন্য স্বর থাকলে ঋ-ধ্বনির জায়গায় ‘র’ হয় তা র-ফলা হিসেবে যুক্ত হয়।
পিতৃ+আদেশ = পিত্রাদেশ।
পিতৃ+আলয় = পিত্রালয়।

১৩. এ, ঐ, ও, ঔ-কারের পরে এ, ঐ-কারের স্থানে অয়, আয় এবং ও, ঔ-কারের স্থানে যথাক্রমে অব, আব বসে।
এ+অ = অয়্+এ      নে+অন = নয়ন।
ঐ+অ = আয়্+অ    গৈ+অক = গায়ক।
ও+অ = অব্+অ      লো+অন = লবণ।
ঔ+অ = আব+অ    পৌ+অক = পাবক।
ও+আ = অব্+আ    গো+আদি = গবাদি।
ও+এ = অব+এ       গো+এষণা = গবেষণা।
ও+ই = অব্+ই         পো+ইত্র = পবিত্র।
ঔ+ই = আব্+ই       নৌ+ইক = নাবিক।
ঔ+উ = আব+উ     ভৌ+উক = ভাবুক।

১৪. কিছু সন্ধি কোনো নিয়ম অনুযায়ী হয় না, এগুলোকে নিপাতনে সিদ্ধ সন্ধি বলে। যেমন—কুল+অটা = কুলটা, প্র+উঢ় = প্রৌঢ়, অন্য+অন্য = অন্যান্য, মার্ত+অণ্ড = মার্তণ্ড, শুদ্ধ+ওদন = শুদ্ধোদন, গো+অক্ষ = গবাক্ষ।

ব্যঞ্জনসন্ধি

ব্যঞ্জনধ্বনি+স্বরধ্বনি, ব্যঞ্জনধ্বনি+ব্যঞ্জনধ্বনি, স্বরধনি+ব্যঞ্জনধ্বনিতে মিলে যে সন্ধি হয় তাকে ব্যঞ্জনসন্ধি বলে।

ব্যঞ্জনধ্বনি+স্বরধ্বনি

১. ক, চ, ট, ত, প ইত্যাদির পরে স্বরধ্বনি থাকলে ব্যঞ্জনধ্বনিগুলো যথাক্রমে গ্, জ্, ড (ড়্), দ, ব-তে রূপান্তরিত হয়।
ক্+অ = গ        দিক্+অন্ত = দিগন্ত।
চ্+অ = জ        ণিচ্+অন্ত = ণিজন্ত।
ট্+আ = ড়       ষট্+আনন = ষড়ানন।
ত্+অ = দ        তৎ+অবধি = তদবধি।
প্+অ = ব        সুপ্+অন্ত = সুবন্ত।

স্বরধ্বনি+ব্যঞ্জনধ্বনি

স্বরধ্বনির পরে ছ থাকলে সেই ব্যঞ্জনধ্বনির দ্বিত্ব (চ্ছ) হয়।
অ+ছ = চ্ছ       এক+ছত্র = একচ্ছত্র।
আ+ছ = চ্ছ      কথা+ছলে = কথাচ্ছলে।
ই+ছ = চ্ছ         পরি+ছদ = পরিচ্ছদ।

ব্যঞ্জনধ্বনি+ব্যঞ্জনধ্বনি

১. ত্ এবং দ্-এর পরে চ, ছ থাকলে ত্ এবং দ্-এর পরিবর্তে চ্ বসে।
ত্+চ = চ্চ       সৎ+চিন্তা = সচ্চিন্তা।
ত্+ছ = চ্ছ      উৎ+ছেদ = উচ্ছেদ।
দ্+চ = চ্চ        বিপদ+চয় = বিপচ্চয়।
দ্+ছ = চ্ছ       বিপদ+ছায়া = বিপচ্ছায়া।

২. ত্ এবং দ্-এর পরে জ্ বা ঝ থাকলে ত্ বা দ্-এর স্থানে জ্ বসে।
ত্+জ = জ্জ      সৎ+জন = সজ্জন।
দ্+জ = জ্জ      বিপদ+জনক = বিপজ্জনক।
ত্+ঝ = জ্ঝ       কুৎ+ঝটিকা = কুজ্ঝটিকা।

৩. ত্ এবং দ্-এর পরে তালব্য শ থাকলে ত্ বা দ্-এর স্থানে চ হয় এবং তালব্য শ-এর স্থানে ছ হয়।
ত্+শ = চ্ছ       উৎ+শ্বাস = উচ্ছ্বাস।

৪. ত্ এবং দ্-এর পরে ড থাকলে ত্ ও দ্-এর পরিবর্তে ড্ বসে।
ত্+ড = ড্ড      উৎ+ডীন = উড্ডীন।

৫. ত্ এবং দ্-এর পরে হ থাকলে ত্ বা দ্-এর স্থানে দ এবং হ-এর স্থানে ধ বসে।
ত্+হ = দ্+ধ       উৎ+হার = উদ্ধার।
দ্+হ = দ্+ধ        পদ্+হতি = পদ্ধতি।

৬. ত্ এবং দ্-এর পরে ল থাকলে ত্ ও দ্-এর পরিবর্তে ল বসে।
ত্+ল = ল্ল         উৎ+লাস = উল্লাস।
দ্+ল = ল্ল          উদ্+লিখিত = উল্লিখিত।

৭. ব্যঞ্জনধ্বনিসমূহের যে-কোনো বর্গের অঘোষ অল্পপ্রাণ ধ্বনি ও ঘোষ মহাপ্রাণ ধ্বনি কিংবা ঘোষ অল্পপ্রাণ তালব্য ধ্বনি (য>জ), ঘোষ অল্পপ্রাণ ওষ্ঠ্য ধ্বনি (ব),  ঘোষ কম্পনজাত দন্তমূলীয় ধ্বনি (র) বা ঘোষ অল্পপ্রাণ ওষ্ঠ্য ব্যঞ্জনধ্বনি (ব) থাকলে প্রথম অঘোষ অল্পপ্রাণ ধ্বনি ঘোষ অল্পপ্রাণরূপে উচ্চারিত হয়।
ক্+দ = গ্+দ       বাক্+দান = বাগ্‌দান।
ট্+য = ড্+য        ষট+যন্ত্র = ষড়যন্ত্র।
ত্+ঘ = দ্+ঘ        উৎ+ঘাটন = উদ্‌ঘাটন।
ত্+য = দ্+য        উৎ+যোগ = উদ্‌যোগ/উদ্যোগ।
ত্+ব = দ্+ব        উৎ+বোধন = উদ্‌বোধন।
ত্+র = দ্+র        তৎ+রূপ = তদ্রূপ।
  
 ৮. ঙ, ঞ, ণ, ন, ম পরে থাকলে পূর্ববর্তী অঘোষ অল্পপ্রাণ স্পর্শধ্বনি সেই বর্গের ঘোষ স্পর্শধ্বনি কিংবা নাসিক্যধ্বনি হয়।
ক্+ন = গ/ঙ+ন      দিক+নির্ণয় = দিগ্‌নির্ণয়/দিঙ্‌নির্ণয়।
ত্+ম = দ/ন+ম       তৎ+মধ্যে = তদ্‌মধ্যে/তন্মধ্যে।

৯. ম-এর পরে যে-কোনো বর্গীয় ধ্বনি থাকলে ম্ ধ্বনিটি সেই বর্গের নাসিক্যধ্বনি হয়।
ম্+ক = ঙ+ক্        শম্+কা = শঙ্কা।
ম্+চ্  = ঞ+চ্        সম্+চয় = সঞ্চয়।
ম্+ত্ = ন্+ত্          সম্+তাপ = সন্তাপ।

দ্রষ্টব্য—আধুনিক বাংলায় ম্-এর পরে কণ্ঠ বর্গীয় ধ্বনি থাকলে ম্-এর স্থানে সাধারণত অনুস্বার (ং) হয়।
সম্+গত = সংগত,    অহম্+কার = অহংকার।

১০. ম-এর পরে অন্তঃস্থ ধ্বনি য, র, ল, ব কিংবা শ, ষ, স, হ থাকলে ম-এর জায়গায় অনুস্বার (ং) বসে। যেমন—সম্+যোগ = সংযোগ, সম্+সার = সংসার

১১. চ্ ও জ্-এর পরের নাসিক্যধ্বনি তালব্যধ্বনিতে রূপান্তরিত হয়।
চ্+ন = চ্+ঞ           যাচ্+না = যাচ্‌ঞা।
জ্+ন = জ্+ঞ        যজ্+ন = যজ্ঞ।

১২. দ ও ধ-এর পরে বর্গের প্রথম বা দ্বিতীয় বর্ণ থাকলে ‘দ’ ও ‘ধ’ অঘোষ অল্পপ্রাণ ধ্বনি হয়।
দ্>ত্             তদ্+কাল = তৎকাল।
ধ্>ত্             ক্ষুধ্+পিপাসা = ক্ষুৎপিপাসা।

১৩. দ্ কিংবা ধ্-এর পরে স থাকলে দ্ ও ধ্-এর স্থানে অঘোষ অল্পপ্রাণ ধ্বনি হয়। যেমন—বিপদ্+সংকেত = বিপৎসংকেত,  তদ্+সম = তৎসম।

১৪. ষ-এর পরে ত্ বা থ্ থাকলে তা যথাক্রমে ‘ট’ ও ‘ঠ’-তে রূপান্তরিত হয়।
যেমন—কৃষ্+তি = কৃষ্টি,    ষষ্+থ = ষষ্ঠ।

বিশেষ নিয়মে সাধিত সন্ধি :
উৎ+স্থান = উত্থান, সম্+কার = সংস্কার।
পরি+কার = পরিষ্কার, সম্+কৃত = সংস্কৃত।

কতগুলো নিপাতনে সিদ্ধ সন্ধি :
পর+পর = পরস্পর, বন+পতি = বনস্পতি।
গো+পদ = গোষ্পদ, আ+চর্য = আশ্চর্য।
বৃহৎ+পতি = বৃহস্পতি, তৎ+কর = তস্কর।
মনস্+ঈষা = মনীষা, ষট্+দশ = ষোড়শ।
এক্+দশ = একাদশ, পতৎ+অঞ্জলি = পতঞ্জলি।

বিসর্গ সন্ধি

সংস্কৃত ছাড়া অন্য শব্দে বিসর্গ সন্ধি নেই। সংস্কৃত সন্ধির নিয়মে পদের অন্তস্থিত র্ ও স্ অনেক ক্ষেত্রে অঘোষ উষ্মধ্বনি অর্থাৎ হ ধ্বনির মতো উচ্চারিত হয় এবং তা বিসর্গরূপে লেখা হয়। র্ ও স ব্যঞ্জনধ্বনির অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় বিসর্গ সন্ধিও ব্যঞ্জনসন্ধির অন্তর্গত। সহজ কথায় বিসর্গ হচ্ছে র্ ও স-এর সংক্ষিপ্ত রূপ।
বিসর্গ সন্ধি দুইভাবে গঠিত হয়—বিসর্গ+স্বর, বিসর্গ+ব্যঞ্জন।

বিসর্গ ও স্বরের সন্ধি

অ ধ্বনির পরে অবস্থিত অঘোষ উষ্মধ্বনি বিসর্গের পরে অ ধ্বনি থাকলে অ, ঃ,  অ মিলে ও-কার হয়। যেমন—
ততঃ+অধিক = ততোধিক। 

বিসর্গ ও ব্যঞ্জনের সন্ধি

১. অ-কারের পরে অবস্থিত স্-জাত বিসর্গের পর ঘোষ অল্পপ্রাণ ও ঘোষ মহাপ্রাণ ব্যঞ্জনধ্বনি, নাসিক্যধ্বনি বা য, ব, র, ল, হ থাকলে অ-কার ও স্-জাত বিসর্গ উভয় স্থানে ও-কার হয়। যেমন—
তিরঃ+ধান = তিরোধান, মনঃ+রম = মনোরম।
তপঃ+বন = তপোবন।

২. অ-কারের পরে অবস্থিত র্-জাত বিসর্গের পরে উপরিউক্ত ধ্বনিসমূহের যে-কোনো একটি থাকলে বিসর্গের স্থানে র্ বসে। যেমন—
অন্তঃ+গত = অন্তর্গত, পুনঃ+আয় = পুনরায়।
অহঃ+অহ = অহরহ , পুনঃ+জন্ম = পুনর্জন্ম।

৩. অ কিংবা আ ছাড়া অন্য স্বরের পরে বিসর্গ থাকলে ও তার সঙ্গে অ, আ, বর্গীয় ঘোষবর্ণ অল্পপ্রাণ ও ঘোষ মহাপ্রাণ নাসিক্যধ্বনি কিংবা য, র, ল, ব, হ থাকলে বিসর্গের স্থানে র বসে।
যেমন—আশীঃ+বাদ = আশীর্বাদ, দুঃ+যোগ = দুর্যোগ।

দ্রষ্টব্য—ই বা উ ধ্বনির পরের বিসর্গের সঙ্গে র ধ্বনির সন্ধি হলে বিসর্গের বিলোপ ঘটে এবং বিসর্গের আগের হ্রস্ব স্বর দীর্ঘ হয়।
যেমন—নিঃ+রব = নীরব, নিঃ+রস = নীরস।

৪. বিসর্গের পরে অঘোষ অল্পপ্রাণ কিংবা মহাপ্রাণ তালব্য ব্যঞ্জনধ্বনি থাকলে বিসর্গের স্থানে তালব্য শিস ধ্বনি হয়। অঘোষ অল্পপ্রাণ বা অঘোষ মহাপ্রাণ মূর্ধন্য ব্যঞ্জন থাকলে বিসর্গের স্থানে মূর্ধন্য শিস ধ্বনি হয়, অঘোষ অল্পপ্রাণ কিংবা অঘোষ মহাপ্রাণ দন্ত্য ব্যঞ্জনের স্থানে দন্ত্য শিস ধ্বনি হয়।
ঃ+চ/ছ = শ+চ/ছ      শিরঃ+ছেদ = শিরশ্ছেদ।
ঃ+ট/ঠ = ষ+ট/ঠ       নিঃ+ঠুর = নিষ্ঠুর।
ঃ+ত/থ = স+ত/থ      দুঃ+থ = দুস্থ।

৫. অঘোষ অল্পপ্রাণ কিংবা অঘোষ মহাপ্রাণ কণ্ঠ্য বা ওষ্ঠ্য ব্যঞ্জন (ক, খ, প, ফ) পরে থাকলে অ বা আ ধ্বনির পরে অবস্থিত বিসর্গের স্থানে অঘোষ দন্ত্য শিস ধ্বনি (স্) হয় এবং অ বা আ ছাড়া অন্য স্বরধ্বনির পরে অবস্থিত বিসর্গের স্থানে অঘোষ মূর্ধন্য শিস ধ্বনি (ষ) হয়।
অ ধ্বনির পরে বিসর্গ+ক = স্+ক  নমঃ+কার = নমস্কার।
অ ধ্বনির পরে বিসর্গ+খ = স্+খ   পদঃ+খলন = পদস্খলন।
ই ধ্বনির পরে বিসর্গ+ক = ষ+ক     নিঃ+কর = নিষ্কর।
উ ধ্বনির পরে বিসর্গ+ক = ষ+ক     দুঃ+কর = দুষ্কর।

৬. কখনো কখনো সন্ধির ক্ষেত্রে বিসর্গ লোপ পায় না। যেমন—প্রাতঃ+কাল = প্রাতঃকাল, মনঃ+কষ্ট = মনঃকষ্ট।

কয়েকটি বিশেষ বিসর্গ সন্ধির উদাহরণ :
বাচঃ+পতি = বাচস্পতি, অহঃ+নিশা = অহর্নিশ।

হোটেল, মোটেল ও রেস্টুরেন্টের পার্থক্য

হোটেল, মোটেল ও রেস্টুরেন্ট ইত্যাদি শব্দগুলো আমাদের কারো কাছেই অপরিচিত নয়। তবে প্রায়ই অনেকে জিজ্ঞেস করেন যে আসলে হোটেল, মোটেল ও রেস্টুরেন্টের মধ্যে কোনো পার্থক্য আছে কি না, আর থাকলেও তা কতটুকু। চলুন বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।

হোটেল

আমরা বাঙালিরা অনেকে হোটেল বলতে ‘মায়ের দোয়া ভাতের হোটেল’—এমন কিছু দেখে অভ্যস্ত। তবে বাস্তবে পার্থক্যটা অনেক। যদিও সব হোটেলের বৈশিষ্ট্য এক নয় তবুও প্রায় সব হোটেলেরই সাধারণ কিছু বৈশিষ্ট্য আছে।

হোটেলে প্রধানত থাকার সুবিধা থাকে। এছাড়া অবস্থানরত ব্যক্তিদের জন্যে খাবারের ব্যবস্থাও থাকে। অনেক হোটেলে, বিশেষ করে আধুনিক হোটেলগুলোতে পার্টি, সভা, সেমিনার, বিনোদন ও সুইমিংপুল প্রভৃতির ব্যবস্থা থাকে। বেশিরভাগ হোটেলই বহুতল হয়ে থাকে।

হোটেলে প্রায় ৫০টা থেকে ২০০টা পর্যন্ত কক্ষ থাকে। হোটেলে প্রতিটি কক্ষ-সংলগ্ন বারান্দা থাকে এবং তা দিয়ে মানুষ যাতায়াত করে। হোটেলে কর্মচারীর সংখ্যা মোটেল ও রেস্টুরেন্টের কর্মচারীর সংখ্যার তুলনায় অনেক বেশি থাকে। বিভিন্ন প্রকারের কর্মচারী থাকে আধুনিক হোটেলগুলোতে। হোটেলে গাড়ি রাখার ব্যবস্থা খুব সীমিত থাকে।

মোটেল

হোটেলের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মোটেলের বৈশিষ্ট্যের কিছুটা মিল থাকলেও বেশকিছু পার্থক্য রয়েছে। মোটেলে খুব অল্প সংখ্যক কক্ষ থাকে। মূলত পর্যটন এলাকাগুলোতে মোটেলের সংখ্যা বেশি। মোটেল সাধারণত দুইতলাবিশিষ্ট হয়ে থাকে।

মোটেলে আবাসন-সুবিধা থাকে এবং অবস্থানরতদের খাবারের ব্যবস্থাও থাকে। মোটেলের সামনে গাড়ি রাখার জন্যে বড়ো প্রশস্ত জায়গা থাকে। মোটেলে অবস্থানের খরচ হোটেলে অবস্থানের খরচের তুলনায় কম।

মোটেলে সাধারণত একটি লম্বা বারান্দা থাকে যা দিয়ে অবস্থানকারীরা সরাসরি কক্ষে প্রবেশ করতে পারে। মোটেলের কর্মচারীর সংখ্যা হোটেলের কর্মচারীর সংখ্যার চেয়ে অনেক কম কারণ মোটেলের কক্ষের সংখ্যাও অনেক কম হয়ে থাকে।

রেস্টুরেন্ট

রেস্টুরেন্টের বৈশিষ্ট্য হোটেল ও মোটেলের বৈশিষ্ট্যের তুলনায় আলাদা। রেস্টুরেন্টে সাধারণত বিভিন্ন ধরনের খাবার সরবরাহ করা হয়ে থাকে। এখানে থাকার কোনো ব্যবস্থা থাকে না। রান্নাঘর ছাড়া একটি বা দুটি বড়ো কক্ষ থাকে যা চেয়ার-টেবিলে প্রায় ভরা থাকে।

রেস্টুরেন্টে কর্মচারীর সংখ্যা কম হয়ে থাকে তবে আধুনিক রেস্টুরেন্টগুলোতে কর্মচারীর সংখ্যা একটু বেশি। বাবুর্চি, ওয়েটার (সরবরাহকারী) ছাড়া সাধারণত একজন ম্যানেজার বা ব্যবস্থাপক থাকে। রেস্টুরেন্টে খাওয়া শেষ হলে চলে যেতে হয় তবে অনেক রেস্টুরেন্টে খাওয়ার আগে বা পরেও কিছুক্ষণ সময় কাটানোর সুযোগ থাকে।

রেস্টুরেন্টে সাধারণত গাড়ি রাখার ব্যবস্থা থাকে না। এখানে বাহ্যিক বিনোদনেরও ব্যবস্থা থাকে না। বর্তমানে অনেক রেস্টুরেন্ট বাড়িতে খাবার পাঠানোর সেবাও দিয়ে থাকে।
সুপ্রিয় পাঠক, আশা করি হোটেল, মোটেল ও রেস্টুরেন্টের মধ্যে কী কী পার্থক্য আছে তা বুঝতে পেরেছেন।

সমাস কাকে বলে, কত প্রকার ও কী কী?

সমাস কাকে বলে সেটা প্রায় সবারই জানা। তবুও আরেকবার মনে করিয়ে দিই। সমাস শব্দের অর্থ সংক্ষেপণ, মিলন, একপদীকরণ। কতগুলো পরস্পরসম্পর্কিত পদ যখন একসঙ্গে হয়ে নতুন একটি পদ গঠন করে তখন তাকে সমাস বলে। সমাসের ফলে ব্যবহৃত শব্দের সংখ্যা কমে যায়, অর্থাৎ কম শব্দ ব্যবহার করে একই অর্থ প্রকাশ করা যায়।

মূলত একাধিক শব্দকে সংক্ষেপ করতে সমাসের উদ্ভব। সমাসের মাধ্যমে যে নতুন শব্দ তৈরি হয় তাকে সমাসবদ্ধ পদ বা সমস্তপদ বলে।
সমাসের জন্যে ব্যবহৃত প্রত্যেকটি পদকে সমস্যমান পদ বলা হয়। সবগুলো সমস্যমান পদকে একসঙ্গে ব্যাসবাক্য বা বিগ্রহবাক্য বলে।  সমাসযুক্ত পদের প্রথমটিকে বলে পূর্বপদ এবং পরের প্রধান পদটিকে পরপদ বা উত্তরপদ বলে।

এবার একটি সমাস লক্ষ করা যাক। মহান যে নবি = মহানবি। এখানে মহান পূর্বপদ, নবি পরপদ ও মহানবি সমস্তপদ। এখানে মহান, যে ও নবি প্রত্যেকটি সমস্যমান পদ। সমাস প্রধানত ৬ প্রকার—দ্বন্দ্ব, কর্মধারয়, তৎপুরুষ, বহুব্রীহি, দ্বিগু ও অব্যয়ীভাব।

দ্বন্দ্ব সমাস

যে সমাসে প্রত্যেকটি সমস্যমান পদের অর্থ সমস্তপদে বজায় থাকে তাকে দ্বন্দ্ব সমাস বলে। অর্থাৎ, পূর্বপদ ও পরপদ উভয়ের অর্থই সমস্তপদে বজায় থাকে। দ্বন্দ্ব সমাস উভয়পদপ্রধান। দ্বন্দ্ব সমাসে দুটি পদকে যুক্ত করতে ও, এবং, আর ইত্যাদি ব্যবহৃত হয়।
দৃষ্টান্ত :
১. আসল ও নকল = আসল-নকল।
২. ভাই ও বোন = ভাই-বোন।
৩. মা ও বাবা = মা-বাবা।
৪. উঁচু ও নিচু = উঁচু-নিচু।
৫. এখানে ও সেখানে = এখানে-সেখানে।
৬. কাঁচা ও পাকা = কাঁচা-পাকা।
৭. ছোটো ও বড়ো = ছোটো-বড়ো।
৮. পড়া ও শোনা = পড়াশোনা।
৯. ওঠা ও বসা = ওঠাবসা।
১০. খাতা ও পত্র = খাতাপত্র।

   ক. অলুক দ্বন্দ্ব : যে দ্বন্দ্ব সমাসে সমস্যমান পদের বিভক্তি লোপ পায় না তাকে অলুক দ্বন্দ্ব সমাস বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. সাপে ও নেউলে = সাপে-নেউলে।
২. পথে ও ঘাটে = পথেঘাটে।
৩. চোখে ও মুখে = চোখে-মুখে।

   খ. বহুপদী দ্বন্দ্ব : তিনটি বা তার বেশি পদ মিলে দ্বন্দ্ব সমাস হলে তাকে বহুপদী দ্বন্দ্ব সমাস বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. সাহেব, বিবি ও গোলাম = সাহেব-বিবি-গোলাম।

কর্মধারয় সমাস

বিশেষণ বা বিশেষণভাবাপন্ন পদের সঙ্গে বিশেষ্য বা বিশেষ্যভাবাপন্ন পদের মিলনে যে সমাস হয় তাকে কর্মধারয় সমাস বলে। কর্মধারয় সমাসে পরপদের অর্থ সমস্তপদে বজায় থাকে। কর্মধারয় সমাস পরপদপ্রধান।
দৃষ্টান্ত :
১. মহান যে রাজা = মহারাজ।
২. খাস যে জমি = খাসজমি।
৩. যিনি লাট তিনি সাহেব = লাটসাহেব।
৪. কু (মন্দ) যে নজর = কুনজর।
৫. সৎ যে কর্ম = সৎকর্ম।
৬. ভাজা যে বেগুন = বেগুনভাজা।
৭. যিনি পণ্ডিত তিনিই মশাই = পণ্ডিতমশাই।

   ক. মধ্যপদলোপী কর্মধারয় : যে কর্মধারয় সমাসের মধ্যপদ সমস্তপদে লোপ পায় তাকে মধ্যপদলোপী কর্মধারয় সমাস বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. সিংহ চিহ্নিত আসন = সিংহাসন।
২. দুধ মেশানো ভাত = দুধভাত।
৩. মোটর চালিত গাড়ি = মোটরগাড়ি।

  খ. উপমান কর্মধারয় : যার সঙ্গে তুলনা করা হয় তাকে বলে উপমান এবং যাকে তুলনা করা হয় তাকে বলে উপমেয়। পূর্বপদে উপমান-বিশেষ্য ও পরপদে সাধারণ গুণবাচক বিশেষণ মিলে যে সমাস হয় তাকে উপমান কর্মধারয় সমাস বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. তুষারের ন্যায় শুভ্র = তুষারশুভ্র।
২. বজ্রের ন্যায় কঠোর = বজ্রকঠোর।
৩. যে বকের মতো ধার্মিক = বকধার্মিক।

  গ. উপমিত কর্মধারয় : পূর্বপদে উপমান বিশেষ্য ও পরপদে উপমিত বিশেষ্য মিলে যে সমাস হয় তাকে উপমিত কর্মধারয় সমাস বলে। উপমিত কর্মধারয় সমাসে দুটো পদই বিশেষ্য পদ কিন্তু উপমান কর্মধারয় সমাসে সাধারণত একটি বিশেষ্য পদ থাকে, পার্থক্য এখানেই।
দৃষ্টান্ত :
১. চাঁদের ন্যায় মুখ = চাঁদমুখ।
২. কর পল্লবের ন্যায় = করপল্লব।
৩. পুরুষ সিংহের ন্যায় = সিংহপুরুষ।

  ঘ. রূপক কর্মধারয় : পূর্বপদে উপমান-বিশেষ্য ও পরপদে উপমান-বিশেষ্যর মধ্যে অভেদ কল্পনা করে যে সমাস হয় তাকে রূপক কর্মধারয় সমাস বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. মন রূপ মাঝি = মনমাঝি।
২. জীবন রূপ যুদ্ধ = জীবনযুদ্ধ।
৩. বিষাদ রূপ সিন্ধু = বিষাদসিন্ধু।
৪. মোহ রূপ নিদ্রা = মোহনিদ্রা।

তৎপুরুষ সমাস

পূর্বপদের বিভক্তি সমস্তপদে লোপ পেয়ে যে সমাস হয় তাকে তৎপুরুষ সমাস বলে।
ক. দ্বিতীয়া তৎপুরুষ : পূর্বপদের দ্বিতীয়া বিভক্তি (কে, রে) লোপ পেয়ে যে সমাস হয় তাকে দ্বিতীয়া তৎপুরুষ সমাস বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. লোককে দেখানো = লোকদেখানো।
২. চাঁদকে দেখা = চাঁদ দেখা।

ব্যাপ্তি অর্থেও দ্বিতীয়া তৎপুরুষ সমাস হয়।
দৃষ্টান্ত : চিরকাল ব্যাপিয়া সুখী = চিরসুখী।

খ. তৃতীয়া তৎপুরুষ : পূর্বপদের তৃতীয়া বিভক্তি (দ্বারা, দিয়ে, কর্তৃক) লোপ পেয়ে যে সমাস হয় তাকে তৃতীয়া তৎপুরুষ সমাস বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. ঢেঁকি দিয়ে ছাঁটা = ঢেঁকিছাঁটা।
২. মধু দিয়ে মাখা = মধুমাখা।
৩. মন দিয়ে গড়া = মনগড়া।

গ. চতুর্থী তৎপুরুষ : পূর্বপদের চতুর্থী বিভক্তি (কে, রে), নিমিত্ত, জন্যে, উদ্দেশ্য ইত্যাদি লোপ পেয়ে যে সমাস হয় তাকে চতুর্থী তৎপুরুষ সমাস বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. শিশুদের জন্যে পার্ক = শিশুপার্ক।
২. এতিমদের জন্যে খানা = এতিমখানা।
৩. বিদ্যার নিমিত্ত আলয় = বিদ্যালয়।

ঘ. পঞ্চমী তৎপুরুষ : পূর্বপদের পঞ্চমী বিভক্তি (হতে, থেকে, চেয়ে, অপেক্ষা) লোপ পেয়ে যে সমাস হয় তাকে পঞ্চমী তৎপুরুষ সমাস বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. হাত থেকে ছাড়া = হাতছাড়া।
২. প্রাণের চেয়ে প্রিয় = প্রাণপ্রিয়।
৩. পথ হতে ভ্রষ্ট = পথভ্রষ্ট।

ঙ. ষষ্ঠী তৎপুরুষ : পূর্বপদের ষষ্ঠী বিভক্তি (র, এর) লোপ পেয়ে যে সমাস হয় তাকে ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. বিশ্বের কবি = বিশ্বকবি।
২. আমের গাছ = আমগাছ।
৩. রাষ্ট্রের পতি = রাষ্ট্রপতি।
৪. হাতের ঘড়ি = হাতঘড়ি।

ষষ্ঠী বিভক্তি লোপ না পেলে তাকে অলুক ষষ্ঠী তৎপুরুষ সমাস বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. মনের মানুষ = মনের মানুষ।
২. কলের গান = কলের গান।

চ. সপ্তমী তৎপুরুষ : পূর্বপদের সপ্তমী বিভক্তি (এ, য়, তে) লোপ পেয়ে যে সমাস হয় তাকে সপ্তমী তৎপুরুষ সমাস বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. বস্তায় বন্দি = বস্তাবন্দি।
২. অকালে পক্ব = অকালপক্ব।
৩. ঝুড়িতে ভরতি = ঝুড়িভরতি।

ছ. নঞ্ তৎপুরুষ : না-বাচক শব্দ (না, নেই, নাই, নয়, অ, অনা, অনা, গর প্রভৃতি) পূর্বে যুক্ত হয়ে যে সমাস হয় তাকে নঞ্ তৎপুরুষ সমাস বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. ন আচার = অনাচার।
২. ন কাতর = অকাতর।
৩. অন আদর = অনাদর।

জ. উপপদ তৎপুরুষ : পূর্বপদের সঙ্গে কৃৎপ্রত্যয় যুক্ত হয়ে যে সমাস গঠন করে তাকে উপপদ তৎপুরুষ সমাস বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. পঙ্কে জন্মে যা = পঙ্কজ।
২. পা চাটে যে = পা-চাটা।
৩. পকেট মারে যে = পকেটমার।

ঝ. অলুক তৎপুরুষ : যে তৎপুরুষ সমাসে পূর্বপদের বিভক্তি লোপ পায় না তাকে অলুক তৎপুরুষ সমাস বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. গায়ে পড়া = গায়েপড়া।
২. ঘিয়ে ভাজা = ঘিয়ে ভাজা।
৩. গোরুর গাড়ি = গোরুর গাড়ি।

বহুব্রীহি সমাস

যে সমাসে সমস্যমান পদের অর্থ সম্পূর্ণ না বুঝিয়ে ভিন্ন অর্থ প্রকাশ করে তাকে বহুব্রীহি সমাস বলে।

ক. ব্যতিহার বহুব্রীহি : যে সমাসের পরপদে পূর্বপদের বিশেষ্য বা ক্রিয়ার দ্বিরুক্তি প্রকাশ পায় তাকে ব্যতিহার বহুব্রীহি সমাস বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. হাতে হাতে যে লড়াই = হাতাহাতি।
২. লাঠিতে লাঠিতে যে যুদ্ধ = লাঠালাঠি।
৩. গলায় গলায় যে ভাব = গলাগলি।

খ. সমানাধিকরণ বহুব্রীহি : পূর্বপদের বিশেষণ ও পরপদের বিশেষ্য পদ মিলে যে সমাস হয় তাকে সমানাধিকরণ বহুব্রীহি সমাস বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. বদ নসিব যার = বদনসিব।
২. নীল কণ্ঠ যার = নীলকন্ঠ।
৩. হত হয়েছে শ্রী যার = হতশ্রী।

গ. ব্যাধিকরণ বহুব্রীহি : বহুব্রীহি সমাসের পূর্বপদ ও পরপদ কোনোটাই বিশেষণ না হলে তাকে ব্যাধিকরণ বহুব্রীহি সমাস বলে।
দুষ্টান্ত :
১. আশীতে বিষ যার = আশীবিষ।
২. ধামা ধরা স্বভাব যার = ধামাধরা।
৩. কথা সর্বস্ব যার = কথাসর্বস্ব।

ঘ. নঞ্ বহুব্রীহি : বিশেষ্য পূর্বপদের আগে না-বোধক অব্যয় যুক্ত হয়ে যে সমাস হয় তাকে নঞ্ বহুব্রীহি সমাস বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. নেই চেতনা যার = অচেতন।
২. নয় জানা যা = অজানা।
৩. নেই ভুল যাতে = নির্ভুল।

ঙ. মধ্যপদলোপী বহুব্রীহি : ব্যাসবাক্যের ব্যাখ্যামূলক মধ্যপদ লুপ্ত হয়ে যে বহুব্রীহি সমাস গঠিত হয় তাকে মধ্যপদলোপী বহুব্রীহি সমাস বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. ক্ষুরের মতো ধার এমন = ক্ষুরধার।
২. বিড়ালের মতো চোখ যার = বিড়ালচোখী।
৩. গায়ে হলুদ দেওয়া হয় যে অনুষ্ঠানে = গায়েহলুদ।

চ. অলুক বহুব্রীহি : যে বহুব্রীহি সমাসের পূর্বপদ বা পরপদের বিভক্তি লোপ পায় না তাকে অলুক বহুব্রীহি সমাস বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. মাথায় পাগড়ি যার = মাথায়পাগড়ি।
২. চশমা নাকে এমন যার = চশমা-নাকে।

ছ. প্রত্যয়ান্ত বহুব্রীহি : যে বহুব্রীহি সমাসের সমস্তপদে আ, এ, ও ইত্যাদি প্রত্যয় যুক্ত হয় তাকে প্রত্যয়ান্ত বহুব্রীহি সমাস বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. ঘরের দিকে মুখ যার = ঘরমুখো।
২. দুই তলা যার = দোতলা।
৩. দুই দিকে টান যার = দোটানা।

জ. সংখ্যাবাচক বহুব্রীহি : যে বহুব্রীহি সমাসের পূর্বপদে সংখ্যাবাচক শব্দ যুক্ত হয় তাকে সংখ্যাবাচক বহুব্রীহি সমাস বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. চৌ (চার) চাল যে ঘরের = চৌচালা।
২. দশ হাত দৈর্ঘ্য যার = দশহাতি।
৩. তে (তিন) পায়া যার = তেপায়া।

ঝ. নিপাতনে সিদ্ধ বহুব্রীহি : যে বহুব্রীহি সমাস নিয়ম মেনে গঠিত হয় না তাকে নিপাতনে সিদ্ধ বহুব্রীহি সমাস বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. পণ্ডিত হয়েও যে মূর্খ = পণ্ডিতমূর্খ।
২. জীবিত থেকেও যে মৃত = জীবন্মৃত।

দ্বিগু সমাস

সমাহার, সমষ্টি বা মিলন অর্থে সংখ্যাবাচক শব্দের সঙ্গে বিশেষ্য পদ যুক্ত হয়ে যে সমাস গঠন করে তাকে দ্বিগু সমাস বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. চৌ (চার) রাস্তার সমাহার = চৌরাস্তা।
২. সাত সমুদ্রের সমাহার = সাতসমুদ্র।
৩. শত অব্দের সমাহার = শতাব্দী।

অব্যয়ীভাব সমাস

যে সমাসের সমস্তপদের আগে অব্যয় যুক্ত হয় তাকে অব্যয়ীভাব সমাস বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. কূলের সমীপে = উপকূল।
২. দিন দিন = প্রতিদিন।
৩. আমিষের অভাব = নিরামিষ।
৪. পা হতে মাথা পর্যন্ত = আপাদমস্তক।
৫. গ্রহের সদৃশ = উপগ্রহ।
৬. বেলাকে অতিক্রান্ত = উদ্‌বেল।
৭. ঈষৎ রক্ত = আরক্ত।

উপরিউক্ত ৬ প্রকারের সমাস ছাড়াও আরও ২টি অপ্রধান  সমাসের দেখা মেলে।
ক. প্রাদি সমাস : প্র, প্রতি, অনু ইত্যাদি অব্যয়ের সঙ্গে কৃৎপ্রত্যয়সাধিত বিশেষ্যর যে সমাস হয় তাকে প্রাদি সমাস বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. পরি (চারিদিক) যে ভ্রমণ = পরিভ্রমণ।
২. প্র (প্রকৃষ্ট) যে বচন = প্রবচন।

খ. নিত্য সমাস : যে সমাসের সমস্যমান পদগুলো সবসময় সমাসবদ্ধ থাকে তাকে নিত্য সমাস বলে।
দৃষ্টান্ত :
১. অন্য দেশ = দেশান্তর।
২. তুমি, আমি ও সে = আমরা।
৩. কাল তুুল্য সাপ = কালসাপ।

যা-ই হোক, কিছু কিছু সময় একই শব্দ একাধিক সমাসের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। মোটকথা, প্রশ্নে যে-কোনো একটি সঠিক উত্তর দেওয়া থাকবে। তাছাড়া লিখিত প্রশ্নে সমাস কাকে বলে জিজ্ঞেস করলে প্রথম অনুচ্ছেদটুকু যথেষ্ট। আর, ‘সমাস কাকে বলে, কত প্রকার ও কী কী’ প্রশ্ন হলে সংজ্ঞার্থ দিয়ে সঙ্গে প্রতিটির সামান্য বিস্তারিতসহ উদাহরণ লিখলে যথেষ্ট।



বাঙলা নাকি বাংলা : কোনটি শুদ্ধ ও কেন?

বাঙলা নাকি বাংলা, কোনটি সঠিক সেটা নিয়ে মাঝে মাঝে অনেকেই প্রশ্ন করেন। অনেকের ধারণা বাঙলা বানানটি ভুল, আবার অনেকের মতে বাঙলা অপ্রচলিত হলেও শুদ্ধ বানান। আর যদি বাঙলা ভুল বানান হয়েও থাকে তাহলে তার কারণ কী। বানানটি ভুল না শুদ্ধ সেটা বিচার করার আগে শব্দটির উৎপত্তি জানা দরকার। চলুন বাঙলা নাকি বাংলা, কোনটি ভুল বা কোনটি শুদ্ধ তার পর্যালোচনা করা যাক।

শব্দটির মূল এসেছে সংস্কৃত বঙ্গ থেকে। প্রাচীনকালে বঙ্গ বলতে কেবল পূর্ববঙ্গকে বোঝাত—এখনকার মতো সমগ্র বাংলাকে বোঝাত না। বঙ্গ শব্দের সঙ্গে অধিবাসী অর্থে আল প্রত্যয় যুক্ত হয়ে বঙ্গ+আল = বঙ্গাল শব্দটি তখন পূর্ববঙ্গের অধিবাসীদের বোঝাতে ব্যবহৃত হতো।

পশ্চিমবঙ্গকে তখন ভিন্ন নামে ডাকা হতো। পশ্চিমবঙ্গে ঙ+গ = ঙ্গ যুক্তবর্ণের গ-কে অনেক জায়গায় উচ্চারণ করা হয় না; ফলে বঙ্গাল বানানটি হয়ে গেল বঙাল, যার প্রচলিত উচ্চারণ ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে বাঙাল

এর অনেক পরে বাংলা তুর্কিদের দ্বারা বিজিত হয়। তুর্কিরা বাংলার শাসনকার্যে ফারসি ভাষা ব্যবহার করত। ফারসিতে বঙ্গাল শব্দটি বঙ্গালহ বা বঙ্গালা রূপ ধারণ করে। বাঙালি জনসাধারণের মধ্যে তুর্কিদের দেওয়া এই নাম স্বীকৃত হলো। ধীরে ধীরে দেশবাসীর মুখে তার উচ্চারণ হয়ে ওঠে বাঙ্গালা

বাঙ্গালাকে সাধু শব্দ বলা যেতে পারে। মৌখিক ভাষায় আদ্যাক্ষরে বল বা ঝোঁকের ফলে দ্বিতীয় অক্ষর দুর্বল হয়ে আ-কার হারাল। ফলে বানান গিয়ে দাঁড়ায়—বাঙ্গলা বা বাঙ্গ্‌লা। পশ্চিমবঙ্গে ঙ্গ যুক্তবর্ণের লোপ পাওয়ায় বাঙ্‌লা রূপের উদ্ভব। ঙ্ এবং ং-এর উচ্চারণে পার্থক্য না থাকায় বাংলা লেখা হয়।

অনুস্বার (ং) হচ্ছে ঙ বর্ণের হস্‌চিহ্নযুক্ত রূপ। বাংলা বানানটিতেই শব্দটির যথাযথ উচ্চারণ প্রকাশ পায়। বর্তমানে ঙ বর্ণের সঙ্গে হস্‌চিহ্ন যুক্ত করার পরিবর্তেবেশি ব্যবহৃত হয়। তাছাড়া বর্তমানে অধিকাংশ বানানে সেটা দেখা যায়।

বাঙাল ও বাঙালি শব্দের বানানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখার জন্যে ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় একসময় বাঙলা বা বাঙ্‌লা লেখার কথা বলেছিলেন, এবং তা কোথাও কোথাও ব্যবহৃত হতো।

আবার অনেকে বলেন যে, বাংলা বানানে অনুস্বার তাহলে বাঙালি বানানে ঙ কেন। অনুস্বারের সঙ্গে কার বা স্বর যুক্ত হলে পরিবর্তিত হয়ে ঙ রূপ লাভ করে।

ব্যাকরণ | শিক্ষা