শেখা নাকি শিখা : কোনটি শুদ্ধ ও কেন?

শেখা নাকি শিখা, এই দুইয়ের মধ্যে কোনটি সঠিক বানান সেটা নিয়ে অনেকেই দ্বিধায় পড়ে যান। এই সমস্যার মূল কারণ হচ্ছে মুখের ভাষাকে লেখার ভাষা হিসেবে ব্যবহার করা। আমরা সারাক্ষণ যে শব্দগুলো ব্যবহার করি সেগুলো ভুল হলেও ধীরে ধীরে তা আমাদের কাছে মনের অজান্তেই স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।

এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বানানের যাচ্ছেতাই প্রয়োগের কারণে মানুষ এগুলোকে শুদ্ধ ও স্বাভাবিক বলে মনে করছে এবং নির্বিচারে তার প্রয়োগ করছে। ফলে দিনদিন এগুলোতে অভ্যস্ত হয়ে ভুল প্রয়োগ করছে।

এই যে, গেছি, বলসি, খাইসি প্রভৃতি বানানগুলোর কথা-ই ধরুন না। অনেকে রীতিমতো এগুলোকে একরকম প্রচলিত বানান বানিয়ে ফেলেছে। এই শব্দ দুটির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। চলুন শেখা নাকি শিখা—এদের মধ্যে কোনটি শুদ্ধ বা অশুদ্ধ তা জেনে নেওয়া যাক।

শেখা—শেখা হচ্ছে বিশেষ্য হিসেবে চলিত শব্দ। চলিত বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহারের প্রয়োজন হলে ‘শেখা’ শব্দটি ব্যবহার করতে হবে।
দৃষ্টান্ত :
১. আমার পক্ষে গিটার বাজানো শেখা সম্ভব না।
২. নীলাকে চমকে দিতেই রাফসানের বেহালা বাজানো শেখা।
৩. এতটুকু কাজ আমার তিনদিনেই শেখা হয়ে যাবে।
৪. তোমার পক্ষে মান্দারিন ভাষা শেখা কষ্টকর হবে।

তবে ক্রিয়াপদে রূপ পরিবর্তিত হয়ে শ-য়ে হ্রস্ব ই-কার ব্যবহৃত হতে পারে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে অপরিবর্তিত থাকে।
দৃষ্টান্ত :
১. প্রতিদিন দশটি করে শব্দ শেখা সহজ কাজ।
২. আমি প্রতিনিয়তই শিখছি।
৩. রাতুল কম্পিউটার চালানো শিখেছে।
৪. রাফসান গিটার বাজানো শেখে।
৫. আমি এখন তুহিনের কাছে ইংরেজি শিখি।
৬. নতুন কিছু শিখতে হলে ধৈর্যহারা হলে চলবে না।

শিখা—শিখা হচ্ছে বিশেষ্য হিসেবে সাধু শব্দ। সাধু বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে শেখা’র পরিবর্তে ‘শিখা’ বসে।
দৃষ্টান্ত :
১. শিখার অন্ত নাই।
২. তোমার গান শিখা হইবে না।

ক্রিয়াপদে রূপান্তরের সময় শ-য়ে হ্রস্ব ই-কার বজায় থাকে।
দৃষ্টান্ত :
১. তুমি অস্ত্রবিদ্যা শিখিবে ইহা তো মন্দ কথা নহে।
২. আমার পুত্রকে গণিত শিখানোর ভার তোমার উপরেই অর্পণ করিলাম।
৩. তুমিই তাহাকে সংস্কৃত শিখাইবে।

সুপ্রিয় পাঠক, শেখা নাকি শিখা, কোনটি কোথায় ব্যবহার করতে হবে সেটা বুঝতে পেরেছেন আশা করি

হত নাকি হতো : কোনটি সঠিক বানান?

হত নাকি হতো, এই দুটির মধ্যে কোনটি সঠিক বানান সেটা নিয়ে অনেকেই ঝামেলায় পড়ে যান।
অবশ্য একসময় এই দুটির পরিবর্তে একটি বানানই প্রচলিত ছিল। তবে উচ্চারণত পার্থক্য থাকার কারণে বাংলা একাডেমি দুটির বানানকে পৃথক করেছে। চলুন জেনে নিই কোনটি কোথায় লিখতে হবে।

হত—হত শব্দের উচ্চারণ ‘হতো’।
হত শব্দের অর্থ হচ্ছে নিহত, লুপ্ত, বাধাপ্রাপ্ত, অশুভ, মন্দ।
নিহত, লুপ্ত, বাধাপ্রাপ্ত, অশুভ, মন্দ অর্থে হত শব্দটি ব্যবহৃত হবে।
দৃষ্টান্ত :
১. সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহত (হত+আহত) ১০০ জন।
২. পরিবারের হতগৌরব ফিরিয়ে আনার জন্য তোমার সংগ্রাম করা উচিত।
৩. তার মতো হতভাগা কেউ নেই।
৪. তার কথা শুনে আমি হতবুদ্ধি হয়ে গেলাম।
৫. এরকম হতোদ্যম (হত+উদ্যম) হলে উন্নতি করা সম্ভব নয়।

হতো—হতো শব্দের উচ্চারণ ‘হোতো’।
হতো হচ্ছে হওয়ার অতীত নির্দেশক।
হওয়ার অতীত নির্দেশক হিসেবে হতো শব্দটি ব্যবহৃত হবে।
দৃষ্টান্ত :
১. যদি তুমি সেদিন আসতে তাহলে খুব মজা হতো।
২. প্রাচীনকালে এদেশে অনেক ধান হতো।
৩. আগে তার সঙ্গে আমার প্রায়ই কথা হতো।
৪. তুমি সাহায্য না করলে এত বড়ো কাজ আমার দ্বারা সম্ভব হতো না।
৫. সময়তো পরিশ্রম করলে সে এতদিনে কোটিপতি হতো।

সুপ্রিয় পাঠক, হত নাকি হতো, কোনটি কোথায় লিখবেন সেটা বুঝতে পেরেছেন আশা করি।

খোঁজা নাকি খুঁজা : কোনটি সঠিক ও কেন?

খোঁজা নাকি খুঁজা, এই দুইয়ের মধ্যে কোনটি সঠিক বানান সেটা নিয়ে অনেকেই দ্বিধায় পড়ে যান। এই সমস্যার মূল কারণ হচ্ছে মুখের ভাষাকে লেখার ভাষা হিসেবে ব্যবহার করা। আমরা সারাক্ষণ যে শব্দগুলো ব্যবহার করি সেগুলো ভুল হলেও ধীরে ধীরে তা আমাদের কাছে মনের অজান্তেই স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।

এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বানানের যাচ্ছেতাই প্রয়োগের কারণে মানুষ এগুলোকে শুদ্ধ ও স্বাভাবিক বলে মনে করছে এবং নির্বিচারে তার প্রয়োগ করছে। ফলে দিনদিন এগুলোতে অভ্যস্ত হয়ে ভুল প্রয়োগ করছে।

এই যে, গেছি, বলসি, খাইসি প্রভৃতি বানানগুলোর কথা-ই ধরুন না। অনেকে রীতিমতো এগুলোকে একরকম প্রচলিত বানান বানিয়ে ফেলেছে। এই শব্দ দুটির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। চলুন খোঁজা নাকি খুঁজা, এদের মধ্যে কোনটি শুদ্ধ বা অশুদ্ধ তা জেনে নেওয়া যাক।

খোঁজা—খোঁজা হচ্ছে বিশেষ্য হিসেবে চলিত শব্দ। চলিত বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহারের প্রয়োজন হলে ‘খোঁজা’ শব্দটি ব্যবহার করতে হবে।
দৃষ্টান্ত :
১. খোঁজাখুঁজি করলে পেয়ে যাবে।
২. গোরুখোঁজা কি এতই সহজ কাজ!
৩. ডুমুরের ফুল খোঁজা হাস্যকর কাজ।

তবে ক্রিয়াপদে রূপ পরিবর্তিত হয়ে খ-য়ে হ্রস্ব উ-কার ব্যবহৃত হতে পারে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে অপরিবর্তিত থাকে।
দৃষ্টান্ত :
১. হারিয়ে গেলেও কেউ তাকে খোঁজেনি।
২. আমি আর তাকে খুঁজতে যাচ্ছি না।
৩. জিনিসটা খুঁজে পেলে আমাকে দিয়ে যেয়ো।
৪. আমি আজও তাকে খুঁজি।

খুঁজা—খুঁজা হচ্ছে বিশেষ্য হিসেবে সাধু শব্দ। সাধু বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে খোঁঁজা’র পরিবর্তে ‘খুঁজা’ বসে।
দৃষ্টান্ত :
১. মানুষ খুঁজা সহজ কার্য নহে।
২. খুঁজাখুঁজি করিয়া তাহাকে বাহির করা হইল।

ক্রিয়াপদে রূপান্তরের সময় খ-য়ে হ্রস্ব উ-কার বজায় থাকে।
দৃষ্টান্ত :
১. তাহাকে খুঁজিয়া খুঁজিয়া মরিতেছি।।
২. রমেন তাহাকে খুঁজিতেছে।
৩. রাফিনকে তিনদিন ধরিয়া খুঁজিতেছি।

সুপ্রিয় পাঠক, খোঁজা নাকি খুঁজা, কোনটি কোথায় ব্যবহার করতে হবে সেটা বুঝতে পেরেছেন আশা করি।

বাধা নাকি বাঁধা : কোনটি সঠিক বানান ও কেন?

বাধা নাকি বাঁধা, এই দুইয়ের মধ্যে কোনটি সঠিক বানান সেটা নিয়ে আমরা অনেকেই দ্বিধায় পড়ে যাই। চলুন আজীবন মনে রাখার মতো একটি সহজ উপায় জেনে নিই।

বাধা—বাধা শব্দের অর্থ হচ্ছে প্রতিবন্ধকতা, অন্তরায়, বিঘ্ন, নিষেধ, উপদ্রব, সংগঠিত হওয়া, সায় না পাওয়া, কষ্ট বোধ হওয়া, আটক হওয়া, বুঝতে অসুবিধা হওয়া, জড়িয়ে যাওয়া, খণ্ডন করা। √বাধ্+অ+আ = বাধা।
উপরিউক্ত অর্থে বাধা শব্দটি ব্যবহৃত হবে।
দৃষ্টান্ত :
১. ভালো কাজের পদে পদে বাধা থাকে।
২. অশিক্ষা দেশের উন্নতির পথে বড়ো বাধা।
৩. সে আমার কোনো বাধা মানেনি।
৪. বিবেকের বাধা পেয়ে আমি ফের তার কাছে যাইনি।
৪. আমার গলায় মাছের কাঁটা বেধেছে।
৫. বয়সের ভারে তার কথা বেধে যাচ্ছে।
৬. তার বাধা বাধা কথা আমার বুঝতে কষ্ট হয়।
৭. সে এক মহা ঝামেলা বাধিয়েছে।

বাঁধা—বাঁধা শব্দের অর্থ হচ্ছে আবদ্ধ করা, তৈরি করা, রচনা করা, একত্র করা, সংহত হওয়া, সাহস সঞ্চয় করা, পাকা করা হয়েছে এমন, ঋণের জামিনরূপে গচ্ছিত সম্পত্তি। বাঁধা শব্দের উৎপত্তি সংস্কৃত বন্ধক থেকে।
শুধু উপরিউক্ত অর্থে বাঁধা শব্দটি ব্যবহৃত হবে।
দৃষ্টান্ত :
১. নদীর তীরে নৌকা বাঁধা।
২. ঘর বাঁধা একদিনের কাজ নয়।
৩. গুরুপদ গুপ্ত একখানা গান বেঁধেছেন।
৪. খুচরা ব্যাবসাদাররা জোটবেঁধে দাম বাড়াচ্ছে।
৫. আশায় বুক বেঁধে মানুষ বেঁচে থাকে।
৬. গ্রামের বাঁধানো ঘাটে সবাই গোসল করতে আসে।
৭. ঋণ পরিশোধ না করলে বাঁধা বিক্রি করে টাকা উসুল করো।

মনে রাখার কৌশল : বাঁধা (বন্ধন অর্থে) বানানে চন্দ্রবিন্দু আছে। মনে রাখবেন যে, বাঁধতে দড়ি লাগে, আর চন্দ্রবিন্দুটা সেই দড়ি। এটা মনে রাখলে অন্যটা আপনিতেই মনে থাকবে।

বাধা নাকি বাঁধা, কোনটি কোথায় লিখবেন সেটা বুঝতে পেরেছেন আশা করি।

সমাসবদ্ধ শব্দ লেখার নিয়ম : কখন একসঙ্গে কখন ফাঁকা?

সমাসবদ্ধ শব্দ লেখার সময় আমরা প্রায়ই দ্বিধান্বিত হয়ে যাই যে শব্দের মাঝে ফাঁকা হবে কি না। চলুন জেনে নেওয়া যাক সমাসবদ্ধ শব্দ লেখার যথাযথ নিয়ম।

সমাসবদ্ধ শব্দ যথাসম্ভব একসাথে লিখতে হবে।
দৃষ্টান্ত :
১. উগান্ডার স্বাস্থ্যমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন।
২. ডাক্তার জাফরুল্লাহ চৌধুরী এখন করোনামুক্ত
৩. ভাষাসৈনিকদের প্রতি সকলে বিনম্র শ্রদ্ধা জানায়।
৪. ভ্রমরকালো চোখ তার।
৫. তোমার চাঁদমুখ দেখে দিশা হারাই।
৬. তাঁর কাছেই আমার বাংলা শেখার হাতেখড়ি
৭. তাঁর মতো মহাপুরুষ দ্বিতীয়টি নেই।
৮. সে আজ অনেকদিন ধরে বাড়িছাড়া
৯. ওই আয়তলোচনে হারাতে চাই।
১০. মনমাঝি তোর বইঠা নে রে, আমি আর বাইতে পারলাম না।

তবে প্রয়োজনে সমাসবদ্ধ শব্দকে হাইফেনযোগে লেখা যায়।
দৃষ্টান্ত :
১. আমার মা-বাবা আমাকে অনেক স্নেহ করেন।
২. তাদের মধ্যে দা-কুমড়া সম্পর্ক।
৩. এমন ভুল কম-বেশি সবাই করে।
৪. সে করোনা-আক্রান্ত
৫. আমাদের বানান-বাতায়ন কি আপনার ভালো লাগে?

সমাসবদ্ধ শব্দে বিশেষণ পদ থাকলে সাধারণত আলাদা লিখতে হয়।
দৃষ্টান্ত :
১. লাল গোলাপ সবাই পছন্দ করে।
২. শুভ সকাল
৩. নীল আকাশ আমার অনেক প্রিয়।
৪. তার মতো ভালো মানুষ খুব কম দেখা যায়।
৫. আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে আমরা শহিদ মিনারে ফুল দিতে যাই।

তবে কিছু ক্ষেত্রে সমাসবদ্ধ শব্দে বিশেষণ পদ থাকলেও তা একসাথে বসতে পারে। যেমন—তোমার জন্য শুভকামনা রইল। মূলত অর্থবিভ্রান্তির আশঙ্কা থাকলে বা উচ্চারণ শ্রুতিকটু হলে বিশেষণ পদ থাকলেও তা একসাথে বসতে পারে।