হ্রস্ব ই/অন্তঃস্থ য়-এর ব্যবহার

আমরা অনেকেই হ্রস্ব ই ও অন্তঃস্থ য়-এর ব্যবহার নিয়ে দ্বিধায় পড়ে যাই। মূলত উচ্চারণের ভুল থেকে ভুল বানানের সৃষ্টি হয়। লেখাটি তাদের জন্য।

উত্তম পুরুষের ক্ষেত্রে সবসময় ক্রিয়ায় হ্রস্ব ই ব্যবহৃত হয়।
আমি, আমরা উত্তম পুরুষের অন্তর্ভুক্ত।
দৃষ্টান্ত :
১. এখন আমি যাই।
২. আমরা সন্ন্যাসীরা আমিষ খাই না।

নাম পুরুষের ক্ষেত্রে সবসময় ক্রিয়ায় অন্তঃস্থ য় ব্যবহৃত হয়।
আমি, আমরা, তুমি, তোমরা বাদে বাকি সব হচ্ছে নাম পুরুষের অন্তর্ভুক্ত।
দৃষ্টান্ত :
১. স্নিগ্ধা বিদ্যালয়ে যায়।
২. সে ধীর পায়ে যায়।

তবে শরীরের কোনো অঙ্গ (বাহ্যিক অথবা মানবীয়) দ্বারা কোনো কাজ সম্পাদিত হলে ক্রিয়ায় অন্তঃস্থ য় বসে।
দৃষ্টান্ত :
১. আমার জিহ্বা স্বাদ পায় না।
২. একসময় ঢুলতে ঢুলতে আমাদের দেহ যেন শয্যায় যেতে চায়।
৩. তার মন আর ঘরে রয় না

কিন্তু উত্তম পুরুষের কোনো অঙ্গের (বাহ্যিক বা মানবীয়) সাথে ‘য়ে’, এ-কার (ে) যোগ হলে ক্রিয়ায় হ্রস্ব ই বসবে।
দৃষ্টান্ত :
১. আমি আর আগের মতো চোখে দেখতে পাই না।
২. আমার পায়ে আর আগের মতো বল পাই না।
৩. আমি মনে মনে এটাই চাই।

তবে কিছু ক্ষেত্রে ‘য়ে’, ‘এ-কার’ যোগ হলেও ক্রিয়ায় অন্তঃস্থ য় বসতে পারে।
দৃষ্টান্ত :
১. আমার আর তাকে মনে চায় না।

সুুপ্রিয় পাঠক,কখন কোথায় হ্রস্ব ই ও অন্তঃস্থ য় ব্যবহার করতে হবে সেটা নিয়ে আর সমস্যা নেই আশা করি।

উঠা/ওঠা, উঠে/ওঠে

উঠা/ওঠা, উঠে/ওঠে ইত্যাদি শব্দগুলো আমরা প্রায়ই ব্যবহৃত হতে দেখি কিন্তু এগুলোর যথাযথ ব্যবহার ও পার্থক্য সম্পর্কে জানি না।
চলুন উপরিউক্ত শব্দগুলোর পার্থক্য ও ব্যবহার জেনে নিই।

উঠা—উঠা হচ্ছে সাধু শব্দ। সাধু বাক্যে উঠা ব্যবহৃত হবে।
দৃষ্টান্ত :
১. তাহার পক্ষে সূর্যোদয়ের পূর্বে  নিদ্রা হইতে উঠা সম্ভব নহে।
২. আমার দ্বারা আর উন্নতির স্বর্ণ শিখরে আরোহণ করা হইল না।

ওঠা—ওঠা হচ্ছে চলিত শব্দ। চলিত বাক্যে ওঠা ব্যবহৃত হবে।
দৃষ্টান্ত :
১. তোমার আর জাতে ওঠার দরকার নেই।
২. হিমালয়ের চূড়ায় ওঠা বেশ কষ্টকর হবে

উঠে—উঠে হচ্ছে অসমাপিকা ক্রিয়া। যার অর্থ—ওঠার পর।
দৃষ্টান্ত :
১. ঘুম থেকে উঠে আমি দৌড়াতে যাই।
২. গাছে উঠে তার ভয়ভয় করতে লাগল।

উঠে হচ্ছে চলিত অসমাপিকা ক্রিয়া।

ওঠে—ওঠে হচ্ছে সমাপিকা ক্রিয়া অর্থাৎ যে ক্রিয়া পূর্ণ অর্থ প্রকাশ করে, বাক্যে আকাঙ্ক্ষার অভাব থাকে না।
দৃষ্টান্ত :
১. সূর্য পূর্ব দিকে ওঠে
২. সে কখন ঘুম থেকে ওঠে তা আমি জানি না
ওঠে চলিত সমাপিকা ক্রিয়া।  

না/নি-এর ব্যবহার

লিখতে গিয়ে আমাদেরকে প্রায়ই নি, না শব্দ দুটি ব্যবহার করতে হয়। এগুলো একই অর্থ প্রকাশ করলেও প্রয়োগে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। চলুন এগুলোর প্রয়োগ জেনে নিই।

‘নি’ সবসময় শব্দের সাথে বসে।
দৃষ্টান্ত :
১. আমি সেখানে যাইনি।
২. রাতুল আমাকে কিছু বলেনি।

‘না’ শব্দের শেষে বসলে আলাদাভাবে বসে।
দৃষ্টান্ত :
১. সুদীপ্ত আজ বিদ্যালয়ে যাবে না।
২. আমি আজ অফিসে যাব না।

‘না’ শব্দের শুরুতে উপসর্গ হিসেবে বসলে একসাথে বসে।
দৃষ্টান্ত :
১. অমন নাহক কথা বলবে না।
২. নাবালকের কথায় কান দিও না।

সমাসবদ্ধ পদে ‘না’ থাকলে তা হাইফেনযোগে লেখা যায়।
দৃষ্টান্ত :
১. না-বলা কথা।
২. না-গোনা পাখি।

বিদেশি শব্দের বানান

বিদেশি শব্দে মূর্ধন্য ণ, মূর্ধন্য ষ, দীর্ঘ ঈ, দীর্ঘ ঈ-কার, দীর্ঘ ঊ, দীর্ঘ ঊ-কার, ঋ, ঋ-কার, ব-ফলা ব্যবহৃত হবে না।
দৃষ্টান্ত :
আরবি, ইংরেজি, দোকানি, কাহিনি, ফারসি, ফরাসি, ব্রিটিশ, স্টেশন, রেজিস্ট্রেশন, স্টোর, ইমান, ইগল,
ফার্নিচার, হর্ন, কর্নার, ইন্টার্ন, ইস্টার্ন, মাস্টার, হজ, জিন, শিকারি, শাদি,দুরবিন, গরিব, মিস্ত্রি, জিনিস, আলহাজ, জি, পোস্ট, আইনি, বেআইনি, ফরিয়াদি, আসামি, আমদানি।

বিদেশি শব্দে ক্ষেত্র অনুযায়ী অ্যা বা ্যা ব্যবহার করতে হবে। যেমন—অ্যাকাউন্ট, অ্যান্টিবায়োটিক, অ্যান্ড, অ্যাডমিন, ম্যানেজার, অ্যাসিড, ক্যাশ, ব্যাংক, ট্যাংক, অ্যাসোসিয়েশন, অ্যালামনাই, ফ্ল্যাট, ফ্ল্যাশ।

ইংরেজি শব্দকে বাংলায় লিখতে হলে যথাসম্ভব উচ্চারণ অনুযায়ী লিখতে হবে।

হল নাকি হলো : কোনটি সঠিক বানান এবং কেন?

হল নাকি হলো, কোনটি শুদ্ধ তা নিয়ে অনেকের কাছে যথেষ্ট দ্বিধা আছে। যদিও অনেকেই বহুদিন ধরে হল লিখে আসছি। দুটিকে অনেকটা একইরকম মনে হলেও প্রয়োগে কিছুটা ভিন্নতা আছে।

যদিও একসময় নিম্নোক্ত দুটি অর্থেই হল বানানটি ব্যবহৃত হতো। তবে উচ্চারণ ও অর্থের পার্থক্য থাকায় বাংলা একাডেমি দুটির বানানকে পৃথক করেছে।
আসুন জেনে নিই এদের প্রয়োগ।

হল—হল শব্দটির উচ্চারণ হচ্ছে ‘হল্’।
হল শব্দের অর্থ হচ্ছে—লাঙল, বৈঠক বা সভার জন্য নির্মিত বড়ো ঘর, আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবাস, সোনার প্রলেপ, সমাধান।
উল্লিখিত অর্থের সমার্থক শব্দ হিসেবে হল শব্দটি ব্যবহৃত হবে।
দৃষ্টান্ত :
১. করোনার কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল বন্ধ।
২. হলঘরে সভা আহ্বান করা হয়েছে।
৩. সিনেমা হলে নতুন সিনেমা চলছে।
৪. পরীক্ষার হলে কেউ কাউকে সাহায্য করে না।

হলো—হলো শব্দটির উচ্চারণ হচ্ছে ‘হোলো’।
হলো শব্দের অর্থ—হয়েছে এমন।
হয়েছে এমন অর্থে হলো শব্দটি ব্যবহৃত হবে।
দৃষ্টান্ত :
১. স্বপ্ন আমার সত্যি হলো।
২. অবশেষে কাজটা শেষ হলো।
৩. দেশে কী যে শুরু হলো!
৪. রোহিঙ্গাদের সকল সাহায্য বন্ধ হলো।

সুপ্রিয় পাঠক, হল নাকি হলো লিখবেন সেটা বুঝতে আর সমস্যা নেই আশা করি।

শেখা নাকি শিখা : কোনটি শুদ্ধ ও কেন?

শেখা নাকি শিখা, এই দুইয়ের মধ্যে কোনটি সঠিক বানান সেটা নিয়ে অনেকেই দ্বিধায় পড়ে যান। এই সমস্যার মূল কারণ হচ্ছে মুখের ভাষাকে লেখার ভাষা হিসেবে ব্যবহার করা। আমরা সারাক্ষণ যে শব্দগুলো ব্যবহার করি সেগুলো ভুল হলেও ধীরে ধীরে তা আমাদের কাছে মনের অজান্তেই স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।

এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বানানের যাচ্ছেতাই প্রয়োগের কারণে মানুষ এগুলোকে শুদ্ধ ও স্বাভাবিক বলে মনে করছে এবং নির্বিচারে তার প্রয়োগ করছে। ফলে দিনদিন এগুলোতে অভ্যস্ত হয়ে ভুল প্রয়োগ করছে।

এই যে, গেছি, বলসি, খাইসি প্রভৃতি বানানগুলোর কথা-ই ধরুন না। অনেকে রীতিমতো এগুলোকে একরকম প্রচলিত বানান বানিয়ে ফেলেছে। এই শব্দ দুটির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। চলুন শেখা নাকি শিখা—এদের মধ্যে কোনটি শুদ্ধ বা অশুদ্ধ তা জেনে নেওয়া যাক।

শেখা—শেখা হচ্ছে বিশেষ্য হিসেবে চলিত শব্দ। চলিত বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহারের প্রয়োজন হলে ‘শেখা’ শব্দটি ব্যবহার করতে হবে।
দৃষ্টান্ত :
১. আমার পক্ষে গিটার বাজানো শেখা সম্ভব না।
২. নীলাকে চমকে দিতেই রাফসানের বেহালা বাজানো শেখা।
৩. এতটুকু কাজ আমার তিনদিনেই শেখা হয়ে যাবে।
৪. তোমার পক্ষে মান্দারিন ভাষা শেখা কষ্টকর হবে।

তবে ক্রিয়াপদে রূপ পরিবর্তিত হয়ে শ-য়ে হ্রস্ব ই-কার ব্যবহৃত হতে পারে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে অপরিবর্তিত থাকে।
দৃষ্টান্ত :
১. প্রতিদিন দশটি করে শব্দ শেখা সহজ কাজ।
২. আমি প্রতিনিয়তই শিখছি।
৩. রাতুল কম্পিউটার চালানো শিখেছে।
৪. রাফসান গিটার বাজানো শেখে।
৫. আমি এখন তুহিনের কাছে ইংরেজি শিখি।
৬. নতুন কিছু শিখতে হলে ধৈর্যহারা হলে চলবে না।

শিখা—শিখা হচ্ছে বিশেষ্য হিসেবে সাধু শব্দ। সাধু বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে শেখা’র পরিবর্তে ‘শিখা’ বসে।
দৃষ্টান্ত :
১. শিখার অন্ত নাই।
২. তোমার গান শিখা হইবে না।

ক্রিয়াপদে রূপান্তরের সময় শ-য়ে হ্রস্ব ই-কার বজায় থাকে।
দৃষ্টান্ত :
১. তুমি অস্ত্রবিদ্যা শিখিবে ইহা তো মন্দ কথা নহে।
২. আমার পুত্রকে গণিত শিখানোর ভার তোমার উপরেই অর্পণ করিলাম।
৩. তুমিই তাহাকে সংস্কৃত শিখাইবে।

সুপ্রিয় পাঠক, শেখা নাকি শিখা, কোনটি কোথায় ব্যবহার করতে হবে সেটা বুঝতে পেরেছেন আশা করি