সুখ ও শান্তি : মিল ও অমিলের তুলনামূলক পর্যালোচনা

সুখশান্তি : এই দুটি অনেকটা কাছাকাছি হলেও একটিকে অন্যটির জায়গায় বসানো চলে না। সুখ ও শান্তির মধ্যে কিছু সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে।
যদিও সুখ ও শান্তি একে অপরের সঙ্গে জড়িত  তবুও উভয়ই বাহ্যিক ঘটনা থেকে স্বতন্ত্র।

সুখ

সুখ শব্দটি কয়েকটি বিষয়কে কেন্দ্র করে যেমন— জীবনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব থাকা, ভালোলাগা ও খারাপ না লাগা। সুখের কোনো নির্দিষ্ট অর্থ নেই, কারণ এটি জীবনের মানের সঙ্গে সম্পর্কিত।

অনেক মানুষ সুখকে একটি অস্থায়ী সন্তুষ্টি হিসেবে বিবেচনা করে। সুখ দীর্ঘ সময় ধরে ক্রোধ ও উত্তেজনা হিসেবে স্থান ধরে রাখতে পারে না এবং এ কারণেই এটি অস্থায়ী হিসেবে বিবেচিত হয়। আপনার জীবনে যখন আকর্ষণীয় কিছু ঘটে তখনই আপনি সুখ অনুভব করতে পারেন।

সুখ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর নির্ভর করে যেমন—অর্জন, উচ্চাকাঙ্ক্ষা, পুরস্কার প্রভৃতি। একইভাবে, বেশ কয়েকটি বাহ্যিক ঘটনা দ্বারা সুখকে নষ্ট করা যেতে পারে। পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষদের কাছে সর্বোত্তম জিনিস নেই, তবে তারা যা কিছু আছে তার সেরা ব্যবহার করেন।

এটি (সুখ) চূড়ান্ত গন্তব্য নয়, কারণ জীবনের বেশিরভাগ ঘটনা স্বল্প সময়ের জন্য আমাদেরকে আনন্দিত করে। যেমন— পদোন্নতি হওয়া, বিয়ে করা, বিশাল আয় করা প্রভৃতি জিনিসগুলো স্বল্পমেয়াদি সুখ দেয় যা সময়ের সাথে ম্লান হয়ে যেতে পারে। আপনার যখন সমস্ত চাহিদা সন্তুষ্ট হয়, আপনি তখন নিখুঁত সুখ পাবেন।

সুখ আপনাকে অভ্যন্তরীণ প্রশান্তি নাও দিতে পারে। আপনি যদি অভ্যন্তরীণ শান্তি খুঁজে পান তবে আপনার সুখ স্থায়ী হতে পারে।

শান্তি

শান্তি হলো আপনার ভেতরে থাকা নিস্তব্ধতা যা সমস্ত আকাঙ্ক্ষা ত্যাগ করে অর্জন করা যায়। জীবনে আপনার ইচ্ছে ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণ করে আপনি সুখী হতে পারেন। তবে আপনি জীবনের সমস্ত আকাঙ্ক্ষা ছেড়ে জীবনে শান্তি অর্জন করতে পারেন।

একটি ভুল ধারণা রয়েছে যে, শান্তি জীবনকে নিস্তেজ করে তোলে। সত্যটি হলো—শান্তি নিস্তেজতার অবস্থা নয়, শান্ত হওয়া। এটি আপনাকে আরও সুখী, সচেতন ও জীবিত করে তোলে। অন্তর্নিহিত শান্তি আবিষ্কার করা লোকেরা তাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করতে পারে।

অভ্যন্তরীণ প্রশান্তিযুক্ত লোকেরা প্রতিটি পরিস্থিতিকে উড়িয়ে দেয় না—আবার বিশ্লেষণও করে না। শান্তি নষ্ট করে এমন অনেক কিছুই রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ—অতীতের ঘটনাগুলো সম্পর্কে চিন্তাভাবনা, লোকেরা কে কী বলেছিল বা কী করেছে ইত্যাদি অর্থহীন চিন্তাভাবনা হওয়ায় এগুলো সময় ও শক্তি অপচয় করে।

মানুষের মন অনেক কিছু ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ঘরের মতো। আপনি যদি ঘরটি পছন্দ না করেন, আপনি যা করতে পারেন তা হলো আপনার ইচ্ছেমতো জিনিসগুলো সাজানো। একইভাবে, যদি আপনার মন চিন্তা, উদ্‌বেগ, ভয় ও অন্তহীন চিন্তাভাবনায় আবদ্ধ হয়। উত্তেজনা ও মানসিক চাপের এই অবস্থাটি জীবনকে নেতিবাচক উপায়ে প্রভাবিত করতে পারে।

সুখ ও শান্তির তুলনামূলক মিল-অমিল

সুখ ও শান্তি একে অপরের সঙ্গে সংযুক্ত এবং একে অপরের থেকে পৃথক করা কঠিন। তবে, এমন কিছু পরিস্থিতি রয়েছে যখন আপনি সুখ ও শান্তি আলাদা করে বুঝতে পারবেন। সুখ ও শান্তির অনুভূতি আলাদা। সুখ ও শান্তির মধ্যে প্রধান পার্থক্য হলো—সুখ শর্তাধীন, যদিও শান্তি নিঃশর্ত।

আপনি যখন শান্তি ও সুখের তুলনা করেন, আপনি যা দেখতে পাবেন তা হলো—শান্তি হলো সুখের চেয়ে শক্তিশালী অনুভূতি। সুখ একটি অনুভূতি যা সন্তুষ্টি থেকে পরিতৃপ্তিতে আনন্দিত করতে পারে। শান্তি চূড়ান্ত অনুভূতি যা সংজ্ঞায়িত করা যায় না।

মূর্তি ও ভাস্কর্য : দুটির ব্যাবহারিক পার্থক্য ও মিল

গত কয়েকদিনে আমাদের দেশের সবচেয়ে আলোচিত ও সমালোচিত বিষয় হচ্ছে মূর্তি ও ভাস্কর্য। অনেকের মতে মূর্তি ও ভাস্কর্যের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই; আবার অনেকের মতে মূর্তি ও ভাস্কর্য দুটি আলাদা জিনিস।

আমি ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে মূর্তি ও ভাস্কর্যের পার্থক্য নিরূপণ করছি না বা ধর্মীয় দিক দিয়ে তা বৈধ না অবৈধ তাও যাচাই করছি না। আমি শুধু বাংলায় শব্দ দুটির প্রয়োগ ও অর্থগত পার্থক্য দেখানোর চেষ্টা করছি।

মূর্তি—মূর্তি শব্দের উৎপত্তি সংস্কৃত থেকে। √মূর্ছ্+তি = মূর্তি। মূর্তি শব্দের কতগুলো অর্থ আছে—দেহ, আকৃতি, রূপ, প্রতিমা। এদের মধ্যে বহুল ব্যবহৃত অর্থ হচ্ছে প্রতিমা। মূর্তি হচ্ছে দেব-দেবী বা অন্য পূজ্য কোনোকিছুর প্রাণহীন অবয়ব। অর্থাৎ মূর্তি সাধারণত পুজোর উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়।

স্থায়িত্বের দিক দিয়ে মূর্তি স্থায়ী ও অস্থায়ী উভয়ই হতে পারে। মাটির তৈরি মূর্তিগুলো সাধারণত অস্থায়ী হয়। অধিকাংশ মূর্তিই মাটি দিয়ে তৈরি করা হয়, তবে সোনা, ব্রোঞ্জ, মোম প্রভৃতির তৈরি মূর্তিও দেখা যায়। মূর্তি ধর্মীয় প্রার্থনার কাজে ব্যবহৃত হয়।

ভাস্কর্য—ভাস্কর্য শব্দটির উৎপত্তিও সংস্কৃত থেকে। ভাস্+ √কৃ+য = ভাস্কর্য। ভাস্কর্য হচ্ছে পাথর, কাঠ বা ধাতু প্রভৃতি খোদাই করে নির্মিত শিল্পকর্ম। কোনো বিখ্যাত ব্যক্তি বা বস্তুর অবয়ব জনসমক্ষে প্রদশর্নের জন্যে ভাস্কর্য তৈরি করা হয়।

প্রচুর জনসমাগম হয় এমন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়। ভাস্কর্য দীর্ঘস্থায়ী হয়ে থাকে। সাধারণত ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে সবার সামনে উপস্থাপনই ভাস্কর্যের উদ্দেশ্য। এখানে ধর্মীয় কোনো উদ্দেশ্য থাকে না বললেই চলে।

মূর্তি ও ভাস্কর্য আকৃতিগত দিক দিয়ে অনেকটা কাছাকাছি হলেও তাদের প্রধান পার্থক্য নির্মাণের উদ্দেশ্যে।

হোটেল, মোটেল ও রেস্টুরেন্টের পার্থক্য

হোটেল, মোটেল ও রেস্টুরেন্ট ইত্যাদি শব্দগুলো আমাদের কারো কাছেই অপরিচিত নয়। তবে প্রায়ই অনেকে জিজ্ঞেস করেন যে আসলে হোটেল, মোটেল ও রেস্টুরেন্টের মধ্যে কোনো পার্থক্য আছে কি না, আর থাকলেও তা কতটুকু। চলুন বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।

হোটেল

আমরা বাঙালিরা অনেকে হোটেল বলতে ‘মায়ের দোয়া ভাতের হোটেল’—এমন কিছু দেখে অভ্যস্ত। তবে বাস্তবে পার্থক্যটা অনেক। যদিও সব হোটেলের বৈশিষ্ট্য এক নয় তবুও প্রায় সব হোটেলেরই সাধারণ কিছু বৈশিষ্ট্য আছে।

হোটেলে প্রধানত থাকার সুবিধা থাকে। এছাড়া অবস্থানরত ব্যক্তিদের জন্যে খাবারের ব্যবস্থাও থাকে। অনেক হোটেলে, বিশেষ করে আধুনিক হোটেলগুলোতে পার্টি, সভা, সেমিনার, বিনোদন ও সুইমিংপুল প্রভৃতির ব্যবস্থা থাকে। বেশিরভাগ হোটেলই বহুতল হয়ে থাকে।

হোটেলে প্রায় ৫০টা থেকে ২০০টা পর্যন্ত কক্ষ থাকে। হোটেলে প্রতিটি কক্ষ-সংলগ্ন বারান্দা থাকে এবং তা দিয়ে মানুষ যাতায়াত করে। হোটেলে কর্মচারীর সংখ্যা মোটেল ও রেস্টুরেন্টের কর্মচারীর সংখ্যার তুলনায় অনেক বেশি থাকে। বিভিন্ন প্রকারের কর্মচারী থাকে আধুনিক হোটেলগুলোতে। হোটেলে গাড়ি রাখার ব্যবস্থা খুব সীমিত থাকে।

মোটেল

হোটেলের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে মোটেলের বৈশিষ্ট্যের কিছুটা মিল থাকলেও বেশকিছু পার্থক্য রয়েছে। মোটেলে খুব অল্প সংখ্যক কক্ষ থাকে। মূলত পর্যটন এলাকাগুলোতে মোটেলের সংখ্যা বেশি। মোটেল সাধারণত দুইতলাবিশিষ্ট হয়ে থাকে।

মোটেলে আবাসন-সুবিধা থাকে এবং অবস্থানরতদের খাবারের ব্যবস্থাও থাকে। মোটেলের সামনে গাড়ি রাখার জন্যে বড়ো প্রশস্ত জায়গা থাকে। মোটেলে অবস্থানের খরচ হোটেলে অবস্থানের খরচের তুলনায় কম।

মোটেলে সাধারণত একটি লম্বা বারান্দা থাকে যা দিয়ে অবস্থানকারীরা সরাসরি কক্ষে প্রবেশ করতে পারে। মোটেলের কর্মচারীর সংখ্যা হোটেলের কর্মচারীর সংখ্যার চেয়ে অনেক কম কারণ মোটেলের কক্ষের সংখ্যাও অনেক কম হয়ে থাকে।

রেস্টুরেন্ট

রেস্টুরেন্টের বৈশিষ্ট্য হোটেল ও মোটেলের বৈশিষ্ট্যের তুলনায় আলাদা। রেস্টুরেন্টে সাধারণত বিভিন্ন ধরনের খাবার সরবরাহ করা হয়ে থাকে। এখানে থাকার কোনো ব্যবস্থা থাকে না। রান্নাঘর ছাড়া একটি বা দুটি বড়ো কক্ষ থাকে যা চেয়ার-টেবিলে প্রায় ভরা থাকে।

রেস্টুরেন্টে কর্মচারীর সংখ্যা কম হয়ে থাকে তবে আধুনিক রেস্টুরেন্টগুলোতে কর্মচারীর সংখ্যা একটু বেশি। বাবুর্চি, ওয়েটার (সরবরাহকারী) ছাড়া সাধারণত একজন ম্যানেজার বা ব্যবস্থাপক থাকে। রেস্টুরেন্টে খাওয়া শেষ হলে চলে যেতে হয় তবে অনেক রেস্টুরেন্টে খাওয়ার আগে বা পরেও কিছুক্ষণ সময় কাটানোর সুযোগ থাকে।

রেস্টুরেন্টে সাধারণত গাড়ি রাখার ব্যবস্থা থাকে না। এখানে বাহ্যিক বিনোদনেরও ব্যবস্থা থাকে না। বর্তমানে অনেক রেস্টুরেন্ট বাড়িতে খাবার পাঠানোর সেবাও দিয়ে থাকে।
সুপ্রিয় পাঠক, আশা করি হোটেল, মোটেল ও রেস্টুরেন্টের মধ্যে কী কী পার্থক্য আছে তা বুঝতে পেরেছেন।