শ্যাম রাখি না কুল রাখি কথাটির উৎপত্তি

শ্যাম রাখি না কুল রাখি একটি বহুল প্রচলিত বাগ্‌ধারা। চলুন জেনে নিই এর পেছনের ইতিহাস। শ্যাম হচ্ছে শ্রীকৃষ্ণের আরেক নাম। রাধা-কৃষ্ণের প্রণয়ের কাহিনি শোনেননি এমন মানুষ বোধ হয় খুঁজে পাওয়া যাবে না। প্রেমের ইতিহাসে তাঁরা যে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন তা চিরদিন বেঁচে থাকার যোগ্য।

প্রথমদিকে কৃষ্ণ রাধার জন্যে কাতর থাকতেন। রাধার চিন্তায় হয়ে উঠতেন অধীর, ছন্নছাড়া। কিন্তু প্রথমে তিনি রাধার থেকে উপেক্ষা ছাড়া আর কিছুই পাননি। কিছুদিন পরেই ঘটনা পালটে যায়। যে রাধা তাঁকে উপেক্ষা করেছিলেন সেই রাধা-ই তাঁর জন্যে অধীর হওয়া শুরু করেছেন।

কিন্তু উপেক্ষা সহ্য করতে করতে কৃষ্ণের তৃষ্ণার মাত্রা কিছুটা কমে যায়। কিন্তু তখন অবস্থা এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, রাধা কৃষ্ণকে ছাড়া বাঁচবেনই না।
কিন্তু রাধা ও কৃষ্ণের সামাজিক যে মামি-ভাগ্নের সম্পর্ক, সেখানে মিলন হওয়া ছিল প্রায় অসম্ভব।

রাধার ছিল কুল (জাত) যাওয়ার ভয়, কারণ সে ছিল অন্যের স্ত্রী। তিনি যদি কৃষ্ণকে পেতে চান তাহলে তাঁর জাত বা কুল যাবে। আবার কৃষ্ণকে তিনি হারাতে চান না, কারণ তখন কৃষ্ণকে ছাড়া তাঁর বেঁচে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছিল।

রাধা না পারছিলেন কৃষ্ণের কাছে নিজেকে সঁপে দিতে, কারণ কৃষ্ণ তাঁকে ঠিক আগের মতো ভালোবাসেন না। আবার সেটা সম্ভব হলেও লোকলজ্জা, জাত যাওয়ার চিন্তা। তিনি কোনটাকে বেছে নেবেন! কারণ তাঁর কাছে কোনোটাকেই ছেড়ে দেওয়া সম্ভব ছিল না।

এই দোটানা অবস্থা থেকেই শ্যাম রাখি না কুল রাখি কথাটির উৎপত্তি। কেউ যখন দুটো বিকল্পের মধ্যে একটাকে বাদ দিয়ে আরেকটাকে গ্রহণ করতে পারেন না তখন সাধারণত শ্যাম রাখি না কুল রাখি কথাটি ব্যবহার করা হয়।

ভূতের মুখে রামনাম কথাটির উৎপত্তি

ভূতের মুখে রামনাম কথাটি আমরা প্রায়ই ব্যবহার করে থাকি। সাধারণত অসম্ভব বা অবিশ্বাস্য ঘটনা/ব্যাপার বোঝাতে আমরা ভূতের মুখে রামনাম কথাটি ব্যবহার করি। অবশ্য এই কথাটির পেছনে রয়েছে এক বিরাট পৌরাণিক কাহিনি।

বাংলায় দেবযোনি নামে একটা শব্দ আছে। যাদের জন্ম দেবতা থেকে কিন্তু ক্ষমতা ও অন্যান্য দিক দিয়ে দেবতার মতো নয়, তাদেরকে মূলত দেবযোনি নামে অভিহিত করা হয়। দেবযোনিরা দশ প্রকারের হতে পারে—অপ্সরা, পিশাচ, ভূত, গন্ধর্ব, বিদ্যাধর, কিন্নর, যক্ষ, রাক্ষস, গুহ্যক ও সিদ্ধ।

এই ভূতের চেহারা খুবই ভয়ংকর রকমের। যে-কোনো সাহসী মানুষকেও মুহূর্তেই ভীত করে দিতে সক্ষম এরা।
এরা দেখতে খুবই রোগাপটকা ধরনের। দেখলে মনে হয় যে গায়ে হাড় ছাড়া অন্যকিছু অবশিষ্ট নেই।

তাদের হাতে থাকে অস্বাভাবিক লম্বা নখ, বড়ো বড়ো রক্তাক্ত চোখ, লম্বা হাত-পা, বিশ্রী রকমের কণ্ঠস্বর, অনেক লম্বা ধরনের কান ও দাঁত। ঠোঁট দেখলে মনে হয় যে ঝুলে আছে। এদের আরেকটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে যে, এরা উলঙ্গ থাকতে পছন্দ করে।

তবে মাঝে মাঝে এদেরকে অদ্ভুত কাপড় পরিহিত অবস্থায়ও দেখা যায়। পুরাণমতে এদের সংখ্যা প্রায় ১১ কোটি। এই ভূতেরা দেবতা-অসুরদের সঙ্গেও যুদ্ধ করত। যুদ্ধে এদের প্রধান হাতিয়ার ছিল ত্রিশূল ও তির-ধনুক।

অনেক পুরাণে দেখা যায় যে, শিব বা রুদ্রই ছিল এদের সর্দার বা দলনেতা। আবার কোথাও কোথাও শিবের শিষ্য নন্দীবীরভদ্রকে এদের সর্দার হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। এছাড়া অনেক পুরাণে বিনায়কস্কন্দকে এদের সর্দার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

কথিত আছে যে, অন্ধক নামের এক দৈত্য একদিন বিনায়ককে আক্রমণ করেন। কিন্তু তার কাছে হেরে যান ভূতের সর্দার বিনায়ক। প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে বিনায়ক তাকে আক্রমণ করার ফন্দি আঁটতে থাকেন। এক পর্যায়ে তিনি নন্দীর সঙ্গে পরামর্শ করে একত্রে কাজ করতে শুরু করেন।

একসময় তারা শক্তি সঞ্চার করে অন্ধককে আক্রমণ করেন। অন্ধক ছিলেন একা। অসহায় হয়ে তিনি শিবের কাছে গিয়ে সাহায্য প্রার্থনা করলেন। একদিন শিব অন্ধককে কয়েকজন ভূত উপহার দেন। শেষে অন্ধকও শিবের শিষ্য হিসেবে স্থান লাভ করেন। এরপর তার নাম হয় ভৃঙ্গী।

তবে আরেক পুরাণ অনুযায়ী অন্ধক শিবের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। যুদ্ধে অন্ধক হেরে যান এবং শিবের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন, তখন তার নাম হয় ভৃঙ্গী।

যদিও এই ভূতেরা শিব বা শিবের শিষ্য নন্দী ও ভৃঙ্গীর অনুগামী, কিন্তু এরা রামের নাম শুনতে পারে না। কথিত আছে যে, রামের নাম শোনামাত্রই ভূতেরা পালিয়ে যায়। যারা রামের নাম শুনতেই পারে না, তারা রামের নাম জপবে কী করে! এটা একেবারেই অসম্ভব ঘটনা।
নিষেধ/নিষিদ্ধ | শিক্ষা

সাতনরি হার

গান, গল্প বা উপন্যাসে আমরা প্রায়ই সাতনরি হার কথাটি পেয়ে থাকি। কিন্তু এর অর্থ আসলে কী?
চলুন জেনে নিই সাতনরি হার কথার অর্থ।

সাতনরি শব্দে সাত মানে ৭ সংখ্যক, আর নরি অর্থ প্যাঁচ।
সাতনরি’র অর্থ করলে দাঁড়ায় সাতপ্যাঁচবিশিষ্ট। 
সুতরাং সাতনরি হার মানে হচ্ছে গলায় পরিধানের সাতপ্যাঁচবিশিষ্ট হার বা অলংকারবিশেষ।

লাগে টাকা দেবে গৌরীসেন

কথায় কথায় আমরা অনেকেই ‘গৌরীসেনের টাকা’ কথাটি উল্লেখ করে থাকি। এই কথাটির অবশ্য একটি ইতিহাসও আছে। চলুন জেনে নিই এই কথাটির উৎপত্তি।

সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতকে ভারতের হুগলি অঞ্চলে গৌরীসেন নামে একজন ধনী ব্যবসায়ী বসবাস করতেন। তিনি জাতিধর্ম নির্বিশেষে দায়গ্রস্ত ব্যক্তিকে চাওয়ামাত্র অর্থ দান করতেন।
সেখান থেকেই ‘লাগে টাকা দেবে গৌরীসেন’ কথাটির উৎপত্তি যার অর্থ চাওয়ামাত্রই যে টাকা পাওয়া যায়।

শাহবাগ নামটির উৎপত্তি

ঢাকা শহরের একটি সুপরিচিত ও জনবহুল এলাকা হচ্ছে শাহবাগ। শাহবাগের নাম শোনেনি এমন মানুষ বাংলাদেশে খুব কমই আছে। চলুন জেনে নিই শাহবাগ নামটির উৎপত্তির ইতিহাস। শাহবাগ শব্দটি দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। প্রথমটি ‘শাহ’ অন্যটি ‘বাগ’।
ফারসি ‘শাহ’ শব্দের অর্থ হচ্ছে রাজা বা বাদশাহ আর বাগ শব্দের অর্থ হচ্ছে বাগান বা বাগিচা। শাহবাগ শব্দের অর্থ হচ্ছে রাজার বাগান বা রাজকীয় বাগান। মোগল আমলে ঢাকা বাংলার প্রাদেশিক রাজধানী হওয়ার পর এই এলাকায় মোগলরা একটি দৃষ্টিনন্দন বাগান গড়ে তোলে। মূলত সেখান থেকেই শাহবাগ নামটির উৎপত্তি। কিন্তু কালের বিবর্তনে সে বাগান হারিয়ে গিয়েছে, তার ছিটেফোঁটাও আজ খুঁজে পাওয়া যায় না।

মান্ধাতার আমল অর্থ কী এবং এর উৎপত্তি কীভাবে?

মান্ধাতার আমল কথাটি আমরা কমবেশি সবাই শুনেছি। অতি প্রাচীন বোঝাতে আমরা সাধারণত মান্ধাতার আমল কথাটি ব্যবহার করে থাকি। কিন্তু মান্ধাতার আমল কথাটি কীভাবে এলো? এর পেছনে রয়েছে একটি পৌরাণিক কাহিনি। মান্ধাতা ছিলেন সূর্য বংশের এক রাজা।

রামচন্দ্রও পরে একই বংশে জন্মেছিলেন। সেই হিসাবে বলা যায় মান্ধাতা রামচন্দ্রের পূর্বপুরুষ ছিলেন। মান্ধাতার বাবা ছিলেন সূর্য বংশের রাজা যুবনাশ্ব। তাঁর কোনো পুত্রসন্তান ছিল না। পুত্রসন্তান লাভের আশায় তিনি জঙ্গলে ঋষির আশ্রমে গিয়ে তপস্যা শুরু করেন। যুবনাশ্বের তপস্যায় মুগ্ধ হয়ে ঋষিরা তাঁর জন্য যজ্ঞ করতে রাজি হলেন।

যজ্ঞ শেষ হওয়ায় পর ঋষিরা এক কলসি মন্ত্রপূত জল রেখে দিলেন যা খেলে যুবনাশ্বের রানির পুত্রসন্তান হবে। কিন্তু একথা যুবনাশ্ব জানতেন না। রাতে পিপাসা পেলে তিনি কলসির জল খেয়ে ফেলেন। সকালে উঠে ঋষিরা কলসিতে অল্প জল পেয়ে যুবনাশ্বকে জিজ্ঞাসা করলেন। যুবনাশ্ব উত্তর দিলেন যে জল তিনিই পান করেছেন।

ঋষিরা বললেন জল যেহেতু যুবনাশ্ব পান করেছে সেহেতু পুত্রসন্তান যুবনাশ্বের গর্ভেই হবে। এর প্রায় ১০০ বছর পর যুবনাশ্বের পেটের বাম দিক বিদীর্ণ করে মান্ধাতা ভূমিষ্ঠ হন। কিন্তু কোনো নারীর গর্ভে জন্ম না হওয়ায় মান্ধাতা কার দুধ খেয়ে বড়ো হবেন তা নিয়ে সমস্যা দেখা দেয়। সেই সমস্যা সমাধানে এগিয়ে এলেন দেবরাজ ইন্দ্র।

ইন্দ্র তাঁর হাতের আঙুল মান্ধাতার মুখের ভেতরে দিয়ে বললেন “মাম ধাস্যতি”, যার অর্থ আমাকে পান করো। সেখান থেকে তাঁর নাম হয় মামধাতা বা মান্ধাতা। কথিত আছে যে ইন্দ্রের সেই আঙুলটি ছিল অমৃতক্ষরা। অমৃতগুণে মান্ধাতা খুব অল্প সময়েই বড়ো হয়ে যান। অল্পদিনেই মান্ধাতা পড়াশোনা ও অস্ত্রবিদ্যায় পারদর্শী হয়ে ওঠেন।

বাবা যুবনাশ্বের মৃত্যুর পর মান্ধাতা রাজা হন। যুদ্ধে তিনি পুরো পৃথিবী জয় করেন। এরপর তিনি ভাবলেন পুরো পৃথিবীই তিনি জয় করে ফেলেছেন তাহলে স্বর্গ জয় করা কেন বাদ রাখবেন। তারপর তিনি স্বর্গ জয়ের লক্ষ্যে বের হলেন। কিন্তু দেবরাজ ইন্দ্র জানালেন তিনি (মান্ধাতা) এখনও পুরো পৃথিবী জয় করতে পারেননি, কারণ লবণাসুর এখনও মান্ধাতার অধীনতা মেনে নেয়নি।

মান্ধাতা চললেন লবণাসুরকে বধ করতে। মান্ধাতা লবণাসুরের সাথে এ যুদ্ধেই নিহত হয়েছিলেন। মান্ধাতা রাজত্ব করতেন পুরাণে বর্ণিত চার যুগের প্রথম যুগে অর্থাৎ সত্যযুগে। বছরের হিসেবে সত্যযুগ প্রায় ৩৫ লক্ষ বছর আগের সময়।

তবে প্রচলিত অর্থে মান্ধাতার আমল বলতে কোনো নির্দিষ্ট সময় বিবেচনা করা হয় না, সাধারণত অনেক প্রাচীন বোঝাতে মান্ধাতার আমল কথাটি ব্যবহৃত হয় এবং সেটা এই কাহিনির পরিপ্রেক্ষিতে।