উপসর্গ কাকে বলে, কত প্রকার ও কী কী?

উপসর্গ হচ্ছে অব্যয়সূচক শব্দাংশ বা ধ্বনি যা অন্য শব্দের আগে যুক্ত হয়ে নতুন অর্থবোধক শব্দ গঠন করে। উপসর্গ নিজে স্বাধীন শব্দ বা পদ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে না—অন্য শব্দের সঙ্গে যুক্ত হয়। উপসর্গের অর্থবাচকতা নেই কিন্তু অর্থদ্যোতকতা আছে

১. বাংলা উপসর্গ : বাংলা ভাষার নিজস্ব (খাঁটি বাংলা) উপসর্গ মোট ২১ টি।

নামঅর্থদ্যোতনাউদাহরণ
নয়, মন্দতাঅকাজ, অমিল, অসীম
অঘাবোকাঅঘামার্কা, অঘারাম, অঘাচণ্ডী
অজনিতান্ত (মন্দ)অজমূর্খ, অজপুকুর, অজপাড়াগাঁ
অনামন্দতা, অভাব, অদ্ভুত অনাবৃষ্টি, অনাসৃষ্টি, অনামুখো
আড়বাঁকা, প্রায়আড়পাগলা, আড়চোখা, আড়মোড়া
আননয়, বিক্ষিপ্ত আনকোরা, আনচান, আনমনা
আবঅস্পষ্টতাআবছায়া, আবডাল,
ইতিএ বা এর, পুরাতন ইতিকর্তব্য, ইতিকথা, ইতিহাস
উনকমউনপাঁজুরে, উনপঞ্চাশ
কুমন্দতাকুনজর, কুমতলব, কুখ্যাত, কুদৃষ্টি
নিনেই, নেতিবাচক নিখুঁত, নিখাদ
পাতিক্ষুদ্রপাতিলেবু, পাতিহাঁস, পাতিনেতা
ভরপূর্ণভরপেট, ভরদুপুর
রামবড়ো, উৎকৃষ্ট রামছাগল, রামদা
সাউৎকৃষ্টসাজোয়া
হাঅভাবহাঘরে, হাপিত্যেশ, হাভাতে
অভাব, বাজে, নিকৃষ্ট আধোয়া, আগাছা, আকাল
কদ্নিকৃষ্ট কদাচার, কদাকার, কদর্য
বিনেই, নিন্দনীয় বিপথ, বিকল, বিফল
সঙ্গে, অতিশয়সরব, সঠিক, সজোর, সপরিবার
সুভালো, উৎকৃষ্ট সুখবর, সুদিন, সুপাঠ্য

২. সংস্কৃত উপসর্গ : সংস্কৃত থেকে বাংলায় এসেছে এমন উপসর্গ মোট ২০ টি।

নামঅর্থদ্যোতনাউদাহরণ
প্রপ্রকৃষ্ট, সম্যক, আধিক্য, খ্যাতিপ্রচলন, প্রদান, প্রভাব, প্রতাপ, প্রগাঢ় , প্রস্থান
পরাবিপরীত, আতিশয্য পরাভব, পরাজয়, পরাশক্তি, পরাভূত
অপবিপরীত, অপকর্ষ, দূরীকরণ অপচয়, অপমান, অপকার, অপসারণ
সম্সন্নিবেশ, সম্যক, অভিমুখী, আতিশয্য সংগঠন, সংকলন, সঞ্চয়, সমাদর, সমর্থন
নিআধিক্য, পুরোপুরি, নিচে নিপীড়ন, নিদারুণ, নিশ্চুপ, নিস্তব্ধ, নিবিষ্ট, নিপাত, নিক্ষেপ
অবনিম্নমুখিতা, মন্দ, সম্যকঅবরোধ, অবতরণ, অবগাহন, অবনতি, অবজ্ঞা, অবক্ষয়
অনুপরে, নিরন্তরতা, অভিমুখী, সাদৃশ্য অনুতাপ, অনুশোচনা, অনুগামী, অনুসরণ, অনুকূল, অনুলিপি
নিঃঅভাব, বিশেষভাবে, বহির্মুখিতা নিরক্ষর, নিরপরাধ, নিরহংকার, নিষ্পন্ন
দুঃমন্দ, অভাব, কঠিন, আধিক্য দুঃসাহস, দুর্দান্ত, দুর্দমনীয়, দুর্নীতি, দুস্তর, দুষ্কর্ম
বিসম্যক, বিপরীত, ভিন্ন, অভাব বিফল, বিকর্ষণ, বিবর্ণ, বিশৃঙ্খল, বিকার, বিজ্ঞান
অধিপ্রধান, মধ্যে অধিপতি, অধিনায়ক, অধিকার, অধিষ্ঠিত
সুভালো, সহজ, আতিশয্য সুগন্ধ, সুগঠিত, সুমতি, সুনাম, সুতীব্র
উৎওপরের দিক, অপকর্ষ, আতিশয্য উল্লিখিত, উন্নতি, উদ্‌বোধন
পরিচতুর্দিক, সম্পূর্ণ পরিভ্রমণ, পরিক্রমা, পরিতৃপ্ত, পরিত্যক্ত
প্রতিবিপরীত, সাদৃশ্য, পৌনঃপুনিকতা প্রতিপক্ষ, প্রতিরক্ষা, প্রতিদিন, প্রতিচ্ছবি, প্রতিদান
উপনিকট, অপ্রধান, সম্যক উপকূল, উপকণ্ঠ, উপভাষা, উপভোগ, উপাচার্য, উপবন
পর্যন্ত, ঈষৎ আকণ্ঠ, আমরণ, আনত, আরক্ত
অভিসম্যক, গমনঅভিব্যক্তি, অভিযান, অভিসার
অপিব্যাকরণের সূত্রঅপিনিহিতি
অতিআতিশয্য, অতিক্রম অতিশয়, অতিমানব, অতিপ্রাকৃত

৩. ফারসি উপসর্গ : বাংলায় বহুল ব্যবহৃত ফারসি উপসর্গগুলো হলো :

নামঅর্থদ্যোতনাউদাহরণ
কারকাজকারবার, কারখানা, কারসাজি
খোশআনন্দদায়কখোশগল্প, খোশমেজাজ
দরকম, নিম্নস্থদরকাঁচা, দরদালান, দরপাট্টা
নানয়নারাজ, নাচার, নাবালক, নাহক
নিমঅর্ধ বা প্রায় নিমরাজি, নিমখুন
ফিপ্রত্যেকফি-বছর, ফি-হপ্তা
সহ বা সঙ্গে বকলম, বমাল
বদমন্দ, উগ্রবদমেজাজ, বদনাম, বদনসিব, বদমায়েশ, বদভ্যাস
বেনেই, খারাপ, ভিন্ন বেআক্কেল, বেহুঁশ, বেশরম, বেতার, বেকার

৪. আরবি উপসর্গ : বাংলায় বহুল ব্যবহৃত আরবি উপসর্গগুলো হলো :

নামঅর্থদ্যোতনাউদাহরণ
আমসর্বসাধারণআমজনতা, আমদরবার, আমরাস্তা
খাসব্যক্তিগতখাসকামরা, খাসমহল, খাসদখল
লানা, নেই লাপাত্তা, লাখেরাজ, লাওয়ারিশ
গরনেই, ভুল গরমিল, গররাজি, গরহাজির

৫. ইংরেজি উপসর্গ : বাংলায় বহুল ব্যবহৃত ইংরেজি উপসর্গগুলো হলো :

নামঅর্থদ্যোতনাউদাহরণ
ফুলপুরোফুলপ্যান্ট, ফুলমোজা
হাফঅর্ধেকহাফটিকিট, হাফপ্যান্ট
হেডপ্রধান হেডমাস্টার, হেডপণ্ডিত
সাবঅধীন, অপ্রধান সাব-রেজিস্ট্রার, সাব-অর্ডিনেট, সাব-অফিস, সাব-জোনাল

৬. উর্দু ও হিন্দি উপসর্গ : বাংলায় ব্যবহৃত হিন্দি ও উর্দু উপসর্গ ১ টি।

নামঅর্থদ্যোতনাউদাহরণ
হরপ্রত্যেক, বিভিন্ন হররোজ, হরকিসিম, হরহামেশা

ল্লিখিত উদ্‌বোধন দুটি বহুল ব্যবহৃত উপসর্গযুক্ত শব্দ যা আমরা ভুুল করি।

দূ ও দু-এর ব্যবহার

দ-য়ে দীর্ঘ ঊ-কারযুক্ত শব্দের বানান ভুল না করলেও দ-য়ে হ্রস্ব উ-কারযুক্ত শব্দের বানান আমরা প্রায়ই ভুল করি। চলুন জেনে নিই এই ভুল থেকে বাঁচার একটি সহজ উপায়।

দূ—দূরত্ব বোঝায় এমন সকল শব্দে দ বর্ণের সাথে দীর্ঘ ঊ-কার যুক্ত হবে। যেমন—দূর, দূরত্ব, দূরবর্তী, দূরবীক্ষণ, দূরপাল্লা, দূরদৃষ্টি, দূরদর্শী। ব্যতিক্রম—দুরবিন।

দু—দু বা দুঃ হচ্ছে উপসর্গ। দু বা দুঃ দ্বারা মন্দ ও কষ্টসাধ্য বিষয় নির্দেশ করে। যেমন—দুর্দান্ত, দুর্দিন, দুর্বিপাক, দুর্বোধ্য, দুর্বল, দুর্দমনীয়, দুর্যোগ, দুর্নীতি, দুর্ঘটনা, দুঃখ, দুর্বিষহ, দুর্বিনীত, দুঃসাধ্য, দুঃসহ, দুঃস্বপ্ন, দুরবস্থা, দুরাত্মা, দুঃসময়, দুরারোগ্য, দুরাশা, দুরাচার, দুর্ধর্ষ, দুর্গন্ধ, দুর্গম, দুর্দশা, দুর্নাম, দুর্ব্যবহার, দুর্ভিক্ষ, দুর্ভোগ, দুশ্চিন্তা, দুস্থ, দুষ্প্রাপ্য।

ম-ফলার উচ্চারণ

১. পদের প্রথমে ম-ফলা থাকলে সে বর্ণের উচ্চারণে কিছুটা ঝোঁক পড়ে এবং সামান্য নাসিক্যস্বর হয়। যেমন—
শ্মশান (শঁশান্), স্মরণ (শঁরোন্)।

কখনো কখনো ম-ফলা অনুচ্চারিত থাকতেও পারে। যেমন—স্মৃতি (সৃঁতি)।

২. পদের মধ্যে বা শেষে ম-ফলা যুক্ত হলে উচ্চারণে সে বর্ণের দ্বিত্ব হয় এবং সামান্য নাসিক্যস্বর হয়। যেমন—আত্মীয় (আত্‌তিঁয়ো), পদ্ম (পদ্‌দোঁ), বিস্ময় (বিশ্‌শঁয়), ভস্ম (ভশ্‌শোঁ), রশ্মি (রোশ্‌শিঁ)।

৩. গ, ঙ, ট, ণ, ন বা ল বর্ণের সঙ্গে ম-ফলা যুক্ত হলে ম-এর উচ্চারণ বজায় থাকে। যুক্ত ব্যঞ্জনের প্রথম বর্ণের স্বর লুপ্ত হয়। যেমন—বাগ্মী (বাগ্‌মি), মৃন্ময় (মৃন্‌ময়), জন্ম (জন্‌মো), গুল্ম (গুল্‌মো), যুগ্ম (জুগ্‌মো)।

ঋ, ঐ, ও-ধ্বনির উচ্চারণ

ঋ ধ্বনির উচ্চারণ : স্বাধীনভাবে ব্যবহৃত হলেও ঋ ধ্বনির উচ্চারণ রি বা রী-এর মতো হয়। ঋ ধ্বনি ব্যঞ্জনধ্বনির সাথে যুক্ত হয়ে ব্যবহৃত হলে তা র-ফলা+ই-কার (্রি)-এর মতো হয়। যেমন—ঋতু, ঋণ, মাতৃ, ভ্রাতৃপ্রেমী, বৃষ্টি, দৃষ্টি।

ঐ ধ্বনির উচ্চারণ : ঐ ধ্বনিটি একটি যৌগিক স্বরধ্বনি। ও+ই কিংবা অ+ই ধ্বনি মিলিত হয়ে ঐ ধ্বনি গঠন করে।
যেমন—ক্+অ+ই= কই, ব্+অ+ই+ধ= বৈধ। এরকম—বৈদগ্ধ, বৈশাখ, বৈঠক, ঐকমত্য।

ও ধ্বনির উচ্চারণ : বাংলা একাক্ষর শব্দের ও-কার দীর্ঘ হয়। যেমন—গোরু, জোর, ভোর, রোগ, বোন, কোন।
অন্যত্র সাধারণত হ্রস্ব স্বর হয়। যেমন—সোনা, কারো। ও-এর উচ্চারণ ইংরেজি বোট (boat), গোট (goat) শব্দের (oa)-এর মতো।

পুরুষ কাকে বলে, কত প্রকার ও কী কী?

পক্ষ বা পুরুষের দ্বারা বক্তা, বক্তার সামনে উপস্থিত শ্রোতা ও যার কথা বলা হচ্ছে এমন অনুপস্থিত সত্তা নির্দেশ করা হয়। পুরুষের ওপর ক্রিয়ার রূপ নির্ভরশীল (দৃষ্টান্ত দেওয়া আছে)।
ব্যাকরণের ক্ষেত্রে পক্ষ বা পুরুষ তিন প্রকার :

উত্তম পুরুষ

উত্তম পুরুষ বক্তা বা তার সমগোত্রীয়কে নির্দেশ করে। যেমন—আমি, আমরা, আমাকে আমাদের ইত্যাদি।
ক্রিয়ার প্রয়োগ :
১. আমি তোমাকে কথাটা জানাব।
২. আমরা কাজটা করব।
৩. আমরাই তাকে সাহায্য করেছি।

মধ্যম পুরুষ

যাকে উদ্দেশ্য করে কথা বলা হয় তাকে মধ্যম পুরুষ বা শ্রোতাপক্ষ বলে।
শ্রোতাপক্ষ আবার তিন ধরনের :
ক. সাধারণ শ্রোতাপক্ষ : তুমি, তোমরা, তোমার, তোমাদের।
ক্রিয়ার প্রয়োগ :
১. তুমি আবার কবে আসবে?
২. তোমরা আজকে দিনটা থেকে যাও।
৩. আমি তোমাদেরকে পরে খবর দেবো

খ. মানী শ্রোতাপক্ষ : আপনি, আপনারা, আপনার, আপনাদের।
ক্রিয়ার প্রয়োগ :
১. আপনি কি একবার আসতে পারবেন?
২. আপনারা আমাকে একটু সময় দিন।
৩. আপনাদের পরামর্শ মেনেই আমি কাজ করব।

গ. অন্তরঙ্গ শ্রোতাপক্ষ : তুই, তোরা, তোর, তোদের।
ক্রিয়ার প্রয়োগ :
১. তুই একবার আমার সঙ্গে দেখা করিস।
২. তোরা আজ বাড়ি ফিরে যা।
৩. তোর যা দরকার হয় আমার কাছ থেকে চেয়ে নিস।
৪. তোদের বাড়িতে কি পুকুর আছে?

প্রথম/নাম পুরুষ

যার সম্পর্কে কিছু বলা হয় সে-ই  প্রথম/নাম পুরুষ বা অন্যপক্ষ। অন্যপক্ষ আবার দুই ধরনের :
ক. সাধারণ অন্যপক্ষ : সে, তারা, তার, তাদের, এ, এরা, এর, এদের, ও, ওরা, ওর, ওদের।
ক্রিয়ার প্রয়োগ :
১. সে আমাকে খবর দিয়েছিল।
২. তারা আজ ভারতে যাবে।
৩. তার কথা আর বোলো না।
৪. তাদের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে।
৫. এ আমাকে কিছুই করতে পারবে না।
৬. এরা খুব অসহায়।
৭. এর থেকে আমি কিছু আশা করি না।
৮. এদের সঙ্গে থেকে লাভ নেই।
৯. ও খুব ভালো ছেলে।
১০. ওরা আমাকে যথেষ্ট সম্মান করে।
১১. ওর সব খবর আমি জানি।
১২. ওদের দুঃখ দেখে চোখে জল আসে।

খ. মানী অন্যপক্ষ : তিনি, তাঁরা, তাঁর, তাঁদের, এঁ, এঁরা, এঁর, এঁদের, ওঁ, ওঁরা, ওঁর, ওঁদের।
ক্রিয়ার প্রয়োগ :
১. তিনি আমাকে খুব স্নেহ করেন।
২. তাঁরা আমাকে সাহায্য করেছিলেন।
৩. তাঁর কথা আমি শিরোধার্য মানি।
৪. তাঁদের স্নেহ আমাকে মুগ্ধ করে।
৫. এঁ তো যে সে ব্যক্তি নয়।
৬. এঁরা অনেক সম্মাননীয় মানুষ।
৭. এঁর কথা আমি কোনোদিন ভুলব না।
৮. এঁদের নামে মিছে বলাও পাপ।
৯. ওঁ আমাকে অনেক ভালোবাসতেন।
১০. ওঁরা আমাকে খুব যত্ন করেন।
১১. ওঁর কথা আমি না শুনে পারি না।
১২. ওঁদের জ্ঞান কম নয়।

এ ধ্বনির উচ্চারণ

এ ধ্বনির উচ্চারণ দুই ধরনের হয়ে থাকে—১. সংবৃত ২. বিবৃত/স্বাভাবিক।

এ ধ্বনির সংবৃত উচ্চারণ :
১. পদের শেষে সংবৃত হয়। যেমন—মাঠে, ঘাটে, বলে, চলে।

২. তৎসম শব্দের প্রথমে ব্যঞ্জনধ্বনির সাথে যুক্ত ধ্বনির উচ্চারণ সংবৃত হয়। যেমন—দেশ, প্রেম, শেষ।

৩. একাক্ষর সর্বনাম পদের সংবৃত হয়। যেমন— যে, সে, কে।

৪. কিংবা আ-কারবিহীন যুক্তধ্বনি পরে থাকলে সংবৃত হয়। যেমন—দেহ, কেহ, কেষ্ট।

৫. হ্রস্ব ই-কার বা হ্রস্ব উ-কার পরে থাকলে সংবৃত হয়। যেমন—বেশি, বেণু, বেলুন।

এ ধ্বনির বিবৃত উচ্চারণ :
ধ্বনির বিবৃত উচ্চারণ ইংরেজি  হ্যাট (hat), ব্যাট (bat),  ক্যাট (cat)-এর  (a)-এর মতো। যেমন—দেখ (দ্যাখ), একা (অ্যাকা)।

এ ধ্বনির বিবৃত উচ্চারণ শব্দের আদিতেই পাওয়া যায়।
১. দুই অক্ষরবিশিষ্ট সর্বনাম বা অব্যয় পদে। যেমন—এত, হেন, কেন। ব্যতিক্রম—যেথা, সেথা, হেথা।

২. অনুস্বার ও চন্দ্রবিন্দুযুক্ত ধ্বনির আগের এ ধ্বনি বিবৃত হয়। যেমন—স্যাঁতসেঁতে, গেঁজেল।

৩. খাঁটি বাংলা শব্দে। যেমন—তেলাপোকা।

৪. এক, এগারো, তেরো ইত্যাদি সংখ্যাবাচক শব্দ বা এগুলো যুক্ত আছে এমন শব্দে। যেমন—একদিন, একতলা, একঘেয়ে, তেরোনদী।

৫. ক্রিয়াপদের বর্তমান কালের অনুজ্ঞায়, তুচ্ছার্থে ও সাধারণ মধ্যম পুরুষের রূপে। যেমন—দেখ (দ্যাখ), দেখো (দ্যাখো), খেল (খ্যাল), খেলো (খ্যালো)।

স্ত ও স্থ-এর ব্যবহার

অধিকাংশ সময়ই আমরা স্তস্থ যুক্তবর্ণের প্রয়োগ নিয়ে দ্বিধায় পড়ে যাই। এমনকি ভুল এড়ানোর জন্য আমরা বিকল্প শব্দ ব্যবহার করতেও বাধ্য হই। চলুন জেনে নিই স্তস্থ-এর ব্যবহার মনে রাখার একটি সহজ কৌশল।

স্ত—স্ত সেসব শব্দেই বসে যেসব শব্দে স্ত না থাকলে অবশিষ্ট অংশ অর্থবোধক হয় না বা অবশিষ্ট অংশের অর্থের ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে। যেমন—
অভাবগ্রস্ত, ক্ষতিগ্রস্ত, অভ্যস্ত, ন্যস্ত, আশ্বস্ত, বিধ্বস্ত, বিপর্যস্ত, প্রশস্ত, বিশ্বস্ত, সুবিন্যস্ত, পরাস্ত, সন্ত্রস্ত, স্বস্তি, সমস্ত।

স্থ—যেসব শব্দের স্থ বাদ দিলেও বাকি অংশ অর্থবোধক হয়, সেসব শব্দে সাধারণত স্থ বসে। যেমন—
অন্তঃস্থ, মুখস্থ, কণ্ঠস্থ, গৃহস্থ, দ্বারস্থ, নিকটস্থ, পদস্থ, পরিবারস্থ, অভ্যন্তরস্থ, অপ্রকৃতিস্থ, ভূ-গর্ভস্থ, মনস্থ, গৃহস্থ, সভাস্থ, ঢাকাস্থ।

যতি বা বিরামচিহ্ন ও এর ব্যবহারকৌশল

যতি বা বিরামচিহ্ন লেখার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। যতি বা বিরামচিহ্ন প্রয়োগ করতে সামান্য ভুল করলে বদলে যেতে পারে বাক্যের সম্পূর্ণ অর্থ। চলুন জেনে নেওয়া যাক যতি বা বিরামচিহ্ন কীভাবে ব্যবহার করা উচিত।

কমা—সাধারণত পূর্ণ বাক্যের শেষে কমা বসে। এছাড়া বিভিন্ন জায়গায় কমা বসতে পারে যেমন:—একাধিক শব্দের মাঝে, সম্বোধনের পরে, প্রত্যক্ষ উক্তিতে, তারিখের ক্ষেত্রে বার বা মাসের পরে ও বাক্যের যে-কোনো স্থানে বিরতির প্রয়োজনেও কমা ব্যবহার করা যাবে। কমার ক্ষেত্রে বিরতিকাল ‘১ বলতে যে সময় লাগে’ তার সমান।

দৃষ্টান্ত :
১. যদি বই পড়ো, তাহলে ভালো ফলাফল করবে।
২. বাজার থেকে চাল, ডাল, আলু, পেঁয়াজ নিয়ে এসো।
৩. আসিফ বলল, “আমি আজ অফিসে যাব না।”
৪. রবিবার, ২৩শে মে, ২০২০ খ্রিষ্টাব্দ।
৫. ৪০, গ্রিনরোড, ধানমন্ডি/ধানমণ্ডি, ঢাকা—১২০৫।

দাঁড়ি—বাক্যের শেষে দাঁড়ি বসে। দাঁড়ির ক্ষেত্রে বিরতিকাল ১ সেকেন্ড।
দৃষ্টান্ত :
১. তার মতো সুখী আর কেউ নেই।
২. হাতে কাজ করায় অগৌরব নেই।

সেমিকোলন—একটি বাক্যের সাথে সম্পর্কযুক্ত বাক্য লিখতে সেমিকোলন ব্যবহৃত হবে।
সেমিকোলনের ক্ষেত্রে বিরতিকাল ‘১ বলার দ্বিগুণ সময়’।
দৃষ্টান্ত :
১. সততার মধ্যেই জীবনের সার্থকতা নিহিত; আর তাতে রয়েছে অনাবিল সুখ।
২. কাজ করে যাও; একদিন সফলতা পাবেই।

কোলন—অসম্পূর্ণ শব্দ বা বাক্যের পরে আরেকটি বাক্য যুক্ত করতে হলে কোলন ব্যবহৃত হবে। কোলনের বিকল্প হিসেবে ড্যাশ চিহ্নও লেখা যেতে পারে। কোলনের ক্ষেত্রে বিরতিকাল ১ সেকেন্ড।
দৃষ্টান্ত :
১. রিহানসহ তিন বন্ধু সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল : তারা একত্রে ব্যাবসা শুরু করবে।
২. নাম : রাইসা নাসের।

ড্যাশ চিহ্ন—দুটি বা তার অধিক বাক্যের সংযোগ ঘটাতে ড্যাশ চিহ্ন ব্যবহৃত হয়। এছাড়া বিস্তৃতি বা দৃষ্টান্ত প্রয়োগ করতেও ড্যাশ চিহ্ন ব্যবহৃত হয়।
ড্যাশ চিহ্নের ক্ষেত্রে বিরতিকাল ১ সেকেন্ড।
দৃষ্টান্ত :
১. কাজ করলে সম্মান কমে না—সম্মান বাড়ে।
২. আমি চুপিচুপি বেরিয়ে গেলাম—সে আমাকে হাতের ইশারায় ডাকল।

কোলন ড্যাশ—উদাহরণের ক্ষেত্রে অনেকগুলো আলাদা উদাহরণ (শব্দ) এক বাক্যে বসলে কোলন ড্যাশ ব্যবহৃত হয়। তবে বর্তমানে কোলন ড্যাশের ব্যবহার খুুবই কম। কোলন ড্যাশের ক্ষেত্রে বিরতিকাল ১ সেকেন্ড।
দৃষ্টান্ত :
১. বাংলাদেশের মানুষের মৌলিক অধিকার পাঁচটি:—অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা।
২. পদ পাঁচ প্রকার :—বিশেষ্য, বিশেষণ, সর্বনাম, অব্যয় ও ক্রিয়া।

হাইফেন—সমাসবদ্ধ পদের বিভিন্ন অংশকে আলাদাভাবে দেখানোর জন্য হাইফেন ব্যবহৃত হয়। হাইফেনের ক্ষেত্রে বিরতির প্রয়োজন নেই।
দৃষ্টান্ত :
১. আমার মা-বাবা অনেক পরিশ্রমী।
২. তাদের মধ্যে দা-কুমড়া সম্পর্ক।

ইলেক চিহ্ন—কোনো বর্ণের বিলোপের জন্য ইলেক চিহ্ন  ব্যবহৃত হয়। ইলেক চিহ্নের ক্ষেত্রে বিরতির প্রয়োজন নেই।
দৃষ্টান্ত :
১. রিজভান প্রবাচ’র প্রতিষ্ঠাতা।
২. রহিম’র নতুন বাড়িটা বেশ সুন্দর।

জোড়-উদ্ধৃতি চিহ্ন—প্রত্যক্ষ উক্তি বোঝাতে জোড়-উদ্ধৃতি চিহ্ন ব্যবহৃত হয়। জোড়-উদ্ধৃতি চিহ্নের বিরতিকাল ‘১ বলতে যে সময় লাগে’ তার সমতুল্য।
দৃষ্টান্ত :
১. রাজা বললেন, “খাসনবিশের গর্দান নাও।”
২. সাজিদ বলল, “আমি আজ অসুস্থ।”

বন্ধনী চিহ্ন—প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় বন্ধনীর মধ্যে প্রথমটি ও দ্বিতীয়টি বাংলায় ব্যবহৃত হয়। সাধারণত এক বা একাধিক শব্দের ব্যাখ্যা প্রদানে প্রথম বন্ধনী ব্যবহৃত হয়।
বাক্যের অর্থ অস্পষ্ট থাকলে তৃতীয় বন্ধনী ব্যবহার করা যায়।
দৃষ্টান্ত :
১. ড. আনিসুজ্জামান (শিক্ষাবিদ) ইন্তেকাল করেছেন।
২. দুর্ঘটনার সময় আমি ছিলাম না [ঘটনাস্থলে]।

বিস্ময়সূচক চিহ্ন—সুগভীর আবেগ বা অনুভূতি প্রকাশের ক্ষেত্রে বিস্ময়সূচক চিহ্ন ব্যবহৃত হয়।
বিস্ময়সূচক চিহ্নের ক্ষেত্রে বিরতিকাল ১ সেকেন্ড।
যেমন—
১. কী অপরূপ দৃশ্য!
২. সে এক আজব দৃশ্য!

প্রশ্নবোধক চিহ্ন—কোনোকিছু জিজ্ঞেস করার ক্ষেত্রে বাক্যের শেষে প্রশ্নবোধক চিহ্ন ব্যবহৃত হয়।
প্রশ্নবোধক চিহ্নের ক্ষেত্রে বিরতিকাল ১ সেকেন্ড।
দৃষ্টান্ত :
১. তুমি কখন এলে?
২. তুমি কি আজ বাজারে যাবে?

এছাড়া আরও কিছু যতিচিহ্ন বর্তমানে ব্যবহৃত হতে দেখা যায়।
ত্রিবিন্দু—কোনো বাক্য অসমাপ্ত রাখতে ত্রিবিন্দু ব্যবহৃত হয়।
যেমন—
১. মুহূর্তেই ট্রাকটি পাগলটাকে চাপা দিয়ে গেল, তারপর…
২. নিতাই অচেনা পথের দিকে মিলিয়ে যেতে লাগল…

বিকল্প চিহ্ন—দুটির মধ্যে তুলনা বা দুটির মধ্যে একটি গ্রহণযোগ্য হলে বিকল্প চিহ্ন বসে।
দৃষ্টান্ত :
১. আমি ২/৩ মাস ঢাকার বাইরে থাকব।
২. রহিম/করিম যে-কোনো একজন এলেই হবে।

এক উদ্ধৃতি চিহ্ন—বাক্যের কোনো অংশের প্রতি বিশেষ মনোযোগ আকর্ষণের প্রয়োজন হলে এক উদ্ধৃতি চিহ্ন ব্যবহার করা যায়।
দৃষ্টান্ত :
১. বাংলাদেশে ‘করোনাভাইরাসে’ মৃতের সংখ্যা ২৬০০ ছাড়িয়েছে।
২. আমাদেরকে ‘পড়াশোনার’ বিষয়ে সচেতন থাকা উচিত।

ডট চিহ্ন—কোনোকিছুকে সংক্ষেপ করতে ডট চিহ্ন ব্যবহার করতে হবে।
দৃষ্টান্ত :
১. মো. আসলাম উদ্দীন।
২. ডা. মৃণাল কান্তি।

ধাতুদ্যোতক চিহ্ন—ধাতুকে চিহ্নিত করার জন্য এটা ব্যবহার করা হয়।
দৃষ্টান্ত :
১. বি+আ+ √কৃ+অন = ব্যাকরণ
২. √ভূ+ইন = ভাবী।

সমান চিহ্ন—দুটি বিষয়বস্তু সমতুল্য হলে তাদের মাঝে সমান চিহ্ন বসে।
দৃষ্টান্ত :
. জায়া ও পতি = দম্পতি।
২. মন রূপ মাঝি = মনমাঝি।

উৎপত্তি-নির্দেশক চিহ্ন : কোনো শব্দের উৎপত্তি-নির্দেশক চিহ্ন হিসেবে এই দুটি চিহ্ন ব্যবহৃত হয়।
১. পূর্ববর্তী শব্দ থেকে উৎপন্ন : হস্ত>হাত।
২. পরবর্তী শব্দ থেকে উৎপন্ন : রানি<রাজ্ঞী।

চিহ্নের নামসংকেত
কমা,
দাঁড়ি
সেমিকোলন;
ড্যাশ
কোলন:
কোলনড্যাশ:—
বিস্ময়সূচক চিহ্ন !
প্রশ্নবোধক চিহ্ন ?
জোড়-উদ্ধৃতি চিহ্ন “ ”
এক উদ্ধৃতি চিহ্ন ‘ ’
ইলেক চিহ্ন
বন্ধনী(), {}, []
হাইফেন
ত্রিবিন্দু
বিকল্প চিহ্ন /
ডট চিহ্ন .
সমান=
ধাতুদ্যোতক চিহ্ন
উৎপত্তি-নির্দেশক চিহ্ন >, <
যতিচিহ্নসমূহ

যতি বা বিরামচিহ্ন প্রয়োগে একটু সচেতন হলেই অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ভুল এড়ানো সম্ভব। তাই, ভুল কমাতে আমাদের সচেতনতা একান্ত জরুরি।

যেমনই/যেমনি, তেমনই/তেমনি, এমনই/এমনি

যেমনই—যেমনই শব্দের অর্থ হচ্ছে যেরকমই, যেরূপই।
উপরিউক্ত অর্থে যেমনই লিখতে হবে। যেমন—
১. দেখতে যেমনই হোক, সে তো আমার সন্তান।
২. যেমনই বাবা, তেমনই ছেলে।

যেমনি—যেমনি শব্দের অর্থ হচ্ছে যেইমাত্র, যে মুহূর্তে।
উপরিউক্ত অর্থে যেমনি লিখতে হবে। যেমন—
১. যেমনি পুলিশ এলো, চোরটা দৌড়ে পালিয়ে গেল।
২. যেমনি বজ্রপাত হলো, তেমনি সে আমাকে জড়িয়ে ধরল।

তেমনই—তেমনই শব্দের অর্থ হচ্ছে সেরকমই, উপযুক্ত।
উপরিউক্ত অর্থে তেমনই লিখতে হবে। যেমন—
১. সাহেদ তেমনই লোক, যে করোনার সনদ নিয়ে জালিয়াতি করতেও দ্বিধাবোধ করে না।
২. তেমনই একজন ছেলেকে দেখেছিলাম, যার চোখ নীল রঙের।
৩. রহিম তেমনই লোক, যে একাই অনেক কাজ সামলাতে পারে।

তেমনি—তেমনি শব্দের অর্থ হচ্ছে তৎক্ষণাৎ, সঙ্গে সঙ্গে।
উপরিউক্ত অর্থে তেমনি শব্দটি ব্যবহৃত হবে। যেমন—
১. যেমনি সে এলো, তেমনি সে চলে গেল।
২. আমার কথা শুনে সে তেমনি রেগে উঠল।

এমনই—এমনই শব্দের অর্থ হচ্ছে এরূপই, এরকমই।
উপর্যুক্ত অর্থে এমনই ব্যবহৃত হবে। যেমন—
১. এমনই এক আঁধার রাতে সে এসেছিল।
২. আমরা এমনই একজন কর্মঠ মানুষকে খুঁজছি।

এমনি—এমনি শব্দের অর্থ হচ্ছে উদ্দেশ্য ব্যতীত, বিনা প্রয়োজনে, অকারণে।
উপর্যুক্ত অর্থে এমনি শব্দটি ব্যবহৃত হয়। যেমন—
১. সে আমার কাছে এমনি আসেনি।
২. কোনোকিছু এমনি ঘটে না।

সাতনরি হার

গান, গল্প বা উপন্যাসে আমরা প্রায়ই সাতনরি হার কথাটি পেয়ে থাকি। কিন্তু এর অর্থ আসলে কী?
চলুন জেনে নিই সাতনরি হার কথার অর্থ।

সাতনরি শব্দে সাত মানে ৭ সংখ্যক, আর নরি অর্থ প্যাঁচ।
সাতনরি’র অর্থ করলে দাঁড়ায় সাতপ্যাঁচবিশিষ্ট। 
সুতরাং সাতনরি হার মানে হচ্ছে গলায় পরিধানের সাতপ্যাঁচবিশিষ্ট হার বা অলংকারবিশেষ।